১৩৮ তম জন্ম বার্ষিকী আজ

অনলপ্রভা কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী


ধর্মীয় কোন্দলে জর্জরিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতীয় উপমহাদেশকে পরিত্রাণ প্রদানের উদ্দেশ্যে যাদের কলম ও জবানীতে ছিল আত্মত্যাগের গান, তাদের মধ্যে সর্বাধিক অগ্রগণ্য এবং বর্তমান প্রজন্মের কাছে অপরিচিত সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। মুসলিম নবজাগরণ, হিন্দু মুসলমান ভার্তৃত্ববোধ স্থাপন, নারীশিক্ষা আন্দোলন, মাদ্রাসা শিক্ষায় ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞান সম্পৃক্তকরণ, মুসলমান সমাজে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন, কৃষক প্রজার দুর্দশা মোচন- এসবের জন্যই নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন এই প্রতিভাধর কবি।

১৮৮০ সালের আজকের দিনে, অর্থাৎ ১৩ জুলাই বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতা সৈয়দ আবদুল করিম ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। সে যুগের অন্যতম বিদূষী মহিলা নূরজাহান বেগম ছিলেন তার মা।

‘অনল প্রবাহ’ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। বইটি ১৮৯৯ সালে যখন প্রকাশিত হয়, তখন তার বয়স মাত্র ১৯ বছর। ১৯০৮ সালে কাব্যগ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ উঠলে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয় ‘অনল প্রবাহ’। তৎকালীন ইংরেজ শাসক ১৯১০ সালের মার্চে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে। সে বছর আদালত তাকে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে। সিরাজীই উপমহাদেশের প্রথম কবি যিনি স্বাধীনতার জন্য, জাতীয় জাগরণের জন্য কবিতা লিখে জেলের ঘানি টানেন। শুধু তাই নয়, তার কণ্ঠ রোধ করার জন্য তার বক্তৃতা ও সভাস্থলে ব্রিটিশ সরকার ৮২ বার ১৪৪ ধারা জারি করেছিলো।

বর্তমান নারী সংগঠনগুলো এবং নারী নেত্রীরাও হয়তো জানেন না, কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতা আর অবরোধের প্রাচীর ভেঙে নারী প্রগতি আজকের যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে এর মূলে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীর রয়েছে অবদান। আজ থেকে কত বছর আগে, সেই ১৯০৪ সালে তিনি বলেছেন, “পুরুষ সমাজের দেহ, আর মাতৃজাতি সেই দেহের আত্মা”

তিনি নির্ভীক কণ্ঠে বলেছেন, “যাহারা নারীকে পেছনে রাখিয়া অন্ধ অন্তঃপুরের বেষ্টনে বেষ্টিত রাখিয়া জাতীয় জাগরণের কল্যাণ কামনা করে, আমার বলিতে কুণ্ঠা নাই তাহারা মহামুর্খ!”

শিরাজী উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘দুনিয়ার বুকে আবার শুদ্ধ ও মুক্ত হইয়া দাঁড়াইতে নারীর উত্থান, শিক্ষা, সহানুভূতি ও সাহস চাই।’ এরপর তিনি পুরুষ সমাজের কাছে আবেদন করেছেন, ‘এ বঙ্গে যদি কেহ জাতীয় উত্থানকামী তেজোদীপ্ত মহাপ্রাণ পুরুষ থাকে, তবে সর্বাগ্রে মাতৃজাতির সুশিক্ষার বন্দোবস্তকরত অধঃপতনের খরস্রোত রুদ্ধ করিতে বদ্ধ পরিকর হও। নারী শক্তিকে জাগাইতে না পারিলে সন্তানের শক্তি, সন্তানের প্রাণ আসিবে কোথা হইতে ?’ ইসমাইল হোসেন সিরাজী শুধু বলেই থেমে থাকেননি। পথ প্রদর্শনের জন্য নিজের ছয় বছরের শিশুকন্যাকে ঢাকার ইডেন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে হোস্টেলে রেখে যান। বেগম রোকেয়া প্রায় তার সমবয়সী ছিলেন, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অনুজ; নারী জাগরণ ও বিদ্রোহের প্রসঙ্গে তাদের নাম আগে উঠে আসলেও প্রকৃতপক্ষে তারা ছিলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর উত্তরসূরি।

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে, কাব্যগ্রন্থ- অনলপ্রবাহ(১৯০০), উছ্বাস(১৯০৭), উদ্বোধন(১৯০৭), নব উদ্দীপনা(১৯০৭), মহাশিক্ষা; উপন্যাস- তারা-বাঈ(১৯০৮), নূরউদ্দিন(১৯২৩), ফিরোজা বেগম(১৯২৩), রায়নন্দিনী (১৯১৬), জাহানারা (১৯৩১); সঙ্গীত গ্রন্থ- সঙ্গীত সঞ্জীবণী(১৯১৬), প্রেমাঞ্জলি(১৯১৬); প্রবন্ধ- স্বজাতি প্রেম(১৯০৯), আদব কায়দা শিক্ষা(১৯১৪), স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা(১৯১৬), সুচিন্তা(১৯১৬), মহানগরী কর্ডোভা, তুর্কী নারী জীবন(১৯১৩); ভ্রমণ কাহিনী- তুরস্ক ভ্রমণ(১৯১০)।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]