অপূর্ব গৌতম-এর বাছাই করা কবিতা


বাকরুদ্ধ আমরা দু’জন

এক ঝুড়ি বেদনা নিয়ে কাল বিকেলে

আমার দরজায় কয়েকটা টোকা দিল মালবিকা

চেচিয়ে আসছি বলার আগেই

আরও কয়েকটা টোকা পড়লো

মনে হলো আগের চেয়ে এবারের শব্দটা একটু বেশিই

কানটা এখনও অনেকটাই ভালো

কিন্তু চোখের ঝাপসাটা বাড়ছেই দিন দিন

দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই

ডান হাতটা কিছুটা কেটে যায় ছিটকানির কোণায়

ওপারের কন্ঠে আগেই বুঝেছি

আমারই মালবিকা ঠায় দাঁড়িয়ে

দরজা খুললাম কিন্তু সে ঘরে ঢোকে না

হাতের ব্যাগটা বাম হাতের মুঠোয়

দখিনের খোলা মাঠে তার নিবিড় দৃষ্টি

বুঝতে আর মোটেই বাকি রইলনা-দোকনী চাল দেয়নি

খোলা দরজার এপাশে ওপাশে বাকরুদ্ধ আমরা দু’জন

বাংলা ডিকশনারিটা খুব ভালো করে পরিস্কার করলাম

কতইবা আর পরিস্কার হবে-বিষয়তো পুরোনো

দু’হাতে তুলে দু’বার কপালে ঠেকালাম

মালবিকার হাতে দিয়ে বললাম

পুরোনো বইয়ের দোকানে বিক্রি করে

চাল ডাল আনো, আজতো এভাবে চলি

বিকেলের নরম রোদ্দুরে তুমি আমাকে

বইয়ের দোকানে নিও

আমার কবিতাগুলো ঠিক ঠিক ওদের খুব পছন্দ হবে

দেদারছে আয় করুকনা ওরা, আমাকে দু’পয়সা দিলেই হবে …

 

তর্জনীর গর্জন

জন্মের সময় তাঁর হাত দু’টো কেমন ছিলো ?

বাবা দ্যাখেনি, মা দ্যাখেনি

কেমন ছিলো তার দু’টো হাত?

দু’পাশ বেয়ে ঠিক সোজা কোমড় অবধি

নাকি ঘুমের ছলে দু’হাতে জড়িয়ে বুক?

আমি নিশ্চিত, দ্যাখেনি, কেউ দ্যাখেনি।

 

তার জন্মে ডাক্তার, নার্স, ডাক্তারী যন্ত্রপাতি-কিছুই লাগেনি

কুপির আলোয় পৃথিবী দেখায় বাড়ির পাশের বুড়িমা

 

শৈশব-কৈশোর-দুরন্ত যৌবন এবং তেজোদ্দীপ্ত সময়ে

দু’হাতের দশটি আঙুল প্রিয় বাংলাকে জড়িয়েছে বুকের গহীনে

তর্জনী উঁচিয়ে গর্জন : বাংলা ছাড়ো

উর্ধে তুলে হাত, আঙুল নাড়িয়ে-

‘তোমরা আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’

এক তর্জনীর সাথে কোটি তর্জনীর যুক্ত ফল : স্বাধীন বাংলাদেশ

 

সুযোগ সন্ধানীরা মূলত: ওঁৎ পেতে ছিল

একটি শুভ সকালে-

মীর জাফরের তর্জনী ট্রিগার চাপে

লুটিয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধু, রক্তে লাল বাংলাদেশ

 

আজ,

রক্তের সাগরে ভেসে ভেসে চলি অজানায় …

 

সাপগুলো সব এপারের বাসিন্দা

সাপগুলো সব এপারের বাসিন্দা

ওপারটা কেমন, দেখা হয়নি কোনদিন

ইচ্ছে পূরণে আজ দলবেধে ওপার যাত্রা

নানান বয়সের দশ বারোজন হবে

সবুজ পাতা-ডাল মারিয়ে ইট-পাথরের রাস্তার দেখা

এসে গেছি। ওপারে নিশ্চয়ই আমাদেরই স্বজাত হবে

আনন্দের যাত্রায় মিনিটেই পিসে দেয় যন্ত্রদানব

সামনের চাকা, পেছনের চাকা নিশ্চিত করে মৃত্যু শতভাগ

যেমন করে লাশের সারি সাজায় আমাদের পুলিশ জনতা

পিসে যাওয়া দেহে প্রতিদিন যন্ত্রদানবের উল্লাস

ধীরে ধীরে দেহ ধুলিময়, মিয়ে যায় আমার শ্বাস প্রশ্বাসে …

 

নীড়ে ফেরার ছবি

মালবিকা,

দূষিত শহরের ময়লা আবর্জনার গন্ধে

ব্যাপক ক্ষতির বর্ণনায় তুমি ঠিক করলে

চলে যাবে, শহর থেকে কোন এক অজপাড়াগাঁয়

ছই ছাড়া নৌকায় লাল রঙের পাল তুলে

প্রাণ ভরে নি:শ্বাস নেবে, লাল শাপলার বিলে

সন্ধ্যায় পাখির নীড়ে ফেরার ছবি তুলে তাবৎ

বিশ্বকে জানাবে ভালবাসার টানে-ফিরে আসে সব

আমিও যাব খানিটা পড়ে

তোমার দেহের উষ্ণতা পেতে।

 

যদি দেখা পেতে চাও, চলে আসো রাজপথে

যদি দেখা পেতে চাও, চলে আসো রাজপথে

দাবী আদায়ের লাল পতাকা কাঁধে তোল

মুষ্টিবদ্ধ হাত উর্ধে তুলে বজ্র কন্ঠে তোল আওয়াজ

সংগ্রামী চেতনায় বিন্দু বিন্দু ঘাম আঙুলের টানে

ঝেড়ে ফেলো। ঝেড়ে ফেলো ঘাম। ঝেড়ে ফেলো ঘাম

 

যদি দেখা পেতে চাও, চলে আসো রাজপথে

পাশাপাশি এসো, পায়ে পায়ে চলো

কথা বলো, কথা বলো মিছিলে মিছিলে

আমি ছেড়ে যাবোনা কখনো তোমায়

আমি ছেড়ে যাবোনা ঐ লুটেরাদের

লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ বাহিনীর

ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের তীব্র ঝাঁজেও

আমি তুমুল যুদ্ধেও পাশে থেকে যুদ্ধ করব

ক্লান্তিকে দূর গাঁয় পাঠিয়ে, নিযুত সজীবতায়

আমি বিজয়ের হাসি তোমাকে নিয়েই হাসবো

 

চলে আসো, চলে আসো রাজপথে

যদি দেখা পেতে চাও, চলে আসো রাজপথে

 

আমি আছি রাজপথে

আমি আছি মিছিলে …

 

ধর্মজাল

অসহ্য গরমেও বিভেদ হয় নারী পুরুষ

ছোট্ট ছেলেটি চাইলেই উদাম শরীরে

ঘুরে বেড়াতে পারে এপাড়া ওপাড়া

বাড়ির বাগানের কোন এক কোণে

 

মা-বোন-বৌদির সামাজিক অবরোধ

আলো-বাতাসহীন বদ্ধ ঘরের জানালা দিয়ে

যতদূর চোখ যায়

মনোতৃপ্তিতে শীতল হয় হৃদয়

কষ্টে আমার রক্ত প্রবাহ বাড়ে

যাতনা বাড়ে দেহের প্রতিটি কলায়

ধর্মজাল : ধ্যানে ধ্যানে ঢুকে পড়ে

উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম কোণে

 

সোনালী অপেরার সেই যাত্রামঞ্চে

ঝুমুর ঝুমুর নাচের তালে

গেঞ্জি নাড়িয়ে আহা ! কি নৃত্য

দখিনা বাতাসের হালকা আমাজে

নির্ঘুম রাত পরম আনন্দে কাটিয়ে

ভোর রাতে ঠিক আম গাছের তলায়

বসার বেঞ্চিতে এক দীর্ঘ ঘুম

গ্রীস্মের সব শান্তি যেন শুধুই আমার

 

ঘাম ভেজা শরীরে, গরমে সিদ্ধ আমার মা

কেমন করে টেনে আনি বাইরে

লাল বইয়ের অদৃশ্য হুকুম, লাল চোখে সমাজ

গ্রীষ্মের সব তাপদাহ আমার মাকে জড়িয়ে রাখে

বিকেলের ঝড়ে ঘরে তুলে বাইরের সব

 

গ্রীষ্মের ছুটিতে আমি পাখা নেড়ে নেড়ে

মায়ের শরীরের ঘাম শুকাবো …

 

চলো যাই মাঝ দরিয়ায়

চাঁদপনা মুখে রক্তের লোহিত কণা

মেঘে মেঘে দোল দেয় সাদার ভেলা

কৃষ্ণচূড়ার আকাঙ্খা বাড়ে

স্পর্শের নিবিড় আলিঙ্গণে

আহা ! কেন নয় এমন জীবন

তোমার আমার জনম জনম

 

মায়াবী রঙে সূর্যের তীব্রতা

ছায়ায় ছায়ায় শীতলতা

উষ্ণতা পেতে অপেক্ষা অন্ধকার

মিলে যায় মিলে যাই তুমি আমি

নতুন সূর্য ডাকে রাতের শেষে

 

ডিঙি চালায়ে দূর গাঁয় পড়া

লাল শাপলায় দুপুরের আহার

কেন যে এমন জীবন

চলো যাই মাঝ দরিয়ায় …

 

দাসত্ব

আমি মোটেই সাহসী নই ভালবাসি বলতে

আমি মোটেই সাহসী নই

মালবিকা’র কোলে শুয়ে শুয়ে জোছনা স্রোত

রাতের বাতাসে লক্ষ তারা গুণতে

 

আমি মোটেই ভীতু নই

দাসত্বের বিরুদ্ধে কথা বলতে ..

 

ভিজে যায় হাত

দরজা খোলার আগে জানালা খোলা হয়

বিছানার কাছে বলে। কাল রাতে জল এসে

ভরে গেছে উঠোন, পেছনের বাগানবাড়ি

করকিনা, আমরা মাছ বললেও কেউ খাই না

তবে বুঝে নেই দূরের মাছটা নিশ্চয়ই

বোয়াল কোড়াল হবে।

ঘুমচোখে দৃষ্টিতে আসেনা সাদা সাদা

মাছের পোনা। পুনরায় শুয়ে থাকি শীতের চাঁদরে

হঠাৎ সোরগোল, উঠে দেখি দা-বটি-শাবলে

ক্লান্ত সবাই-বোয়ালটাকে ধরা চাই

আমি পেছনের বাগানে গিয়ে দেখি

সাদা সাদা মাছের খেলা

আলতো করে জল নেড়ে চলে যাওয়া

মাছের সাথে ঘাস-পাতার দোল

ছোঁয়ার আকাঙ্খায় ভিজে যায় হাত …

 

সেদ্ধ ভাত

ঠোঁটপালিশ নকপালিশ না কিনে

টাকাটা আমায় দে

এক টুকরো শীতবস্ত্রে জড়িয়ে আসি

সখিনার সোনামনি

 

রোদের তাপে হিজল বনে

শুকনো পাতার শব্দ শোননা

কুঁড়ানো পাতায় সেদ্ধ ভাতে

ক্ষুধা তাড়ায় মোর সখিনা

 

অ বি রা ম  ছু টে  চ লা

অবিরাম ছুটে চলা

 

 

শখ

আমি তোমার কাছে আর কিছুই চাই না

মোর এই আশাডা পুরণ কইরো

পাকিস্তানী একটা সৈন্যরে কান ধরে ওঠবস করিয়ে

দুই গালে ঠাস ঠাস দুইটা থাপ্পর মারুম

মালবিকা তার এই শখের কথা জানিয়েছিল

তার মনের জনেরে

শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা

আর প্রিয়জনের প্রত্যাশা পূরণ

দুটোকেই কঠিন দায়িত্ব মেনে

মানিক চলে যায় শত্রু নিধনে

 

মানুষের মন বুঝি শুধুই বেদনা সয়

সে ছিল সুন্দরের বিপরীত

তবুও ইচ্ছে করে টোল পরা

ঐ নরম গালে চুম্বন রেখা এঁকে

উষ্ণতায় জড়িয়ে রাখি কিছুটা সময়

 

কেউ তাকে আদর করে না

ভালোবাসে না কেউ, মানুষের মন বুঝি

শুধুই বেদনা সয়

একাকী জীবনে সুখের পরশ বোলাতে

কেউ না আসলেও রাতের আঁধারে

সিঁদেল চোরের মতো জবর চালায় মিনিট পাঁচেক

আহা ! কি শান্তি উগরে ফেলানো ঐ উষ্ণ কোঠরে

 

হবে না আমাকে দিয়ে এই কাজ কোন দিন

পরম মমতায় একটি ঠোঁট থেকে আবির

মাখানো রং নিয়ে লেপ্টে দেই তার নিজ ভালে

 

ভালো থেকো মেয়ে

আমার সুন্দরী


বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।