আইনের বাতিঘর, সংবিধান বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান আর নেই


ঢাকা : বাংলাদেশে সংবিধান ও আইন-আদালত বিষয়ক সাংবাদিকতার বাতিঘর মিজানুর রহমান খান (৫৪) আর নেই। সোমবার (১১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

বিশিষ্ট সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবিধান ও আইন সাংবাদিকতা পড়াতেন। আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে সুপ্রীম কোর্ট, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, প্রাঙ্গণ ও প্রথম আলো কার্যালয়ে জানাজার পর তাঁকে বনানীর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

মিজানুর রহমান খান মৃত্যুকালে মা, দুই ছেলে, এক মেয়ে, স্ত্রী, পাঁচ ভাই, তিন বোন, অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী, ভক্ত ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে বাবা আলী আকবর খান মারা যান। তিনি দৈনিক শিক্ষাডটকমের সম্পাদক ও শিক্ষা বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইরাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান খান এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার মসিউর রহমান খানের জ্যেষ্ঠ সহোদর। নয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

গত ২৭ নভেম্বর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন তিনি। ৫ ডিসেম্বর প্রথমে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ফুসফুসের অনেক ক্ষতি হয়। পরে ১০ ডিসেম্বর তাঁকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা করানো হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত শনিবার বিকেলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। আজ সন্ধ্যা ছয়টা পাঁচ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসক। মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুতে গভীর শোকাহত দৈনিক শিক্ষা পরিবার।

তাঁর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বেলা ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ কর্মস্থল দৈনিক প্রথম আলো অফিসে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে জানাজা শেষে বাদ যোহর তাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ অক্টোবর ঝালকাঠীর নলছিটিতে জন্মগ্রহণ করেন মিজানুর রহমান। ১৪ বছরের কম বয়সে এসএসসি পাস করার পরই বরিশাল ও খুলনার স্থানীয় ও ঢাকার জাতীয় পত্রিকার নলছিটি প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। মিজানুর রহমান খান বহুবছর ধরে দেশের প্রধান দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক। তার আগে গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠাকালীন উপসম্পাদক ছিলেন। তারও আগে দৈনিক যুগান্তরের উপ-সম্পাদক। তারও আগে ইংরেজি দৈনিক নিউনেশন ও দৈনিক মানবজমিনের বিশেষ প্রতিবেদক থাকার আগে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত দৈনিক মুক্তকন্ঠের কূ্টনৈতিক প্রতিবেদক ছিলেন। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে নতুন প্রজন্মের নতুন ধারার পত্রিকা দৈনিক বাংলাবাজারের প্রতিষ্ঠাকালীন রিপোর্টার ও পরে একই পত্রিকার যথাক্রমে প্রধান প্রতিবেদক ও বার্তা সম্পাদক পদে ছিলেন। তারও আগে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক খবর পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। একই সময়ে তিনি সাপ্তাহিক মতামত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। ভারতের প্রভাবশালী আনন্দবাজার পত্রিকা গ্রুপের প্রবাসী আনন্দবাজার পত্রিকার ঢাকাস্থ নিয়মিত প্রদায়ক এবং লন্ডনের ইস্টার্ন আই পত্রিকার প্রদায়ক ছিলেন।

সংবিধান ও আইন নিয়ে লেখালেখি করতেন সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বই সংবিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক, মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড ও ১৯৭১: আমেরিকার গোপন দলিল। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি সংবিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক বইটি লিখে সাড়া ফেলে দেন। বইটি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভর্সিটিসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের বৈশিষ্ট্য (২০০৩), তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: এক অশুভ চিহ্ন (২০০৯), ১৯৭১: আমেরিকান গোপন দলিল (২০০৬), মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যা (২০১৩) ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি প্রথম সংবিধানের জেনেসিস এবং ফিলোসফির ওপর একটি বিস্তৃত গবেষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও গবেষণা কাজ করেছিলেন। তাঁর প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ হয় ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে।

তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, ঝালকাঠী-২ আসনের এমপি এবং ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু, মৎস ও প্রাণী সম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক, উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, প্রথম আলো পরিবার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, মহাসচিব সাজ্জাদ আলম খান তপু, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি মুরসালীন নোমানী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন, সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল, দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান, ঢাকা সাব এডিটরস কাউন্সিলের সভাপতি জাকির হোসেন ইমন ও সাধারণ সম্পাদক মুক্তাদির অনিক, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মাশহুদুল হক ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইয়াছিন, বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠতা ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]