আগস্ট ট্রাজেডিঃ ১৯৭৫-২০০৪ একই সুতোয় গাঁথা


সৈয়দ মেহেদী হাসান : নোবেল পুরস্কার বিজয়ী উইলি ব্রানডিট বলেছিলেন, বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে। জাতির পিতাকে হত্যার পর যখন বিশ্বব্যাপী শোকের ছায়া নেমে এসেছিল তখন আর্ন্তজাতিক মূল্যায়নে এই কথা বলেন জার্মানির আলোচিত এই নেতা।

 

শুধু বিশ্বাসঘাতক নয়, আমাদের রক্ত অন্তর্ঘাতমুখীও। যদিও কখনো কখনো পাল্টা আঘাত করতে সক্ষম হয়েছি। তবে সে দৃষ্টান্ত খুব বেশি নয়। পাল্টা আঘাতের চেয়ে অন্তর্মুখী অপঘাত বেশি হয়েছে। যে কারণে বাঙালী ও বাঙালীর স্বভাব পরস্পরায় অদ্ভুত সিনড্রোম কাজ করে। এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত। কারণ জাতীয় জীবনে আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধিত জাতি। এমন খেসারত বৈশ্বিক সামগ্রিক ইতিহাসে আছে বলে মনে হয় না। কারণ যে কাজ বাঙালীর শত্রুরা করবার সাহস পায়নি, সেই নারকীয় উল্লাস করল বাংলায় জন্ম নেয়া মানুষেরাই। এমনকি তার উনত্রিশ বছর পর আবারও একবার পুরানো উল্লাসে মেতে উঠতে চেয়েছিল অবিশ্বাসী বাঙালীরা (!!)

বস্তুত পথের দীর্ঘতার চেয়ে অধিক গন্তব্য পেয়ে যাওয়ায় হয়তো বাঙালীত্বের রক্তের ভিতর ‘মীর জাফর’এর জিন বিলোপ করতে পারেনি। নয়তো জাতীয় জীবনে ১৫ ই আগস্ট ও ২১ আগস্টের ট্রাজেডির কোন কার্য-কারণ নেই। এই দিনগুলো বাঙালীর কলঙ্কের দিন ও কান্নার দিন। হয়তো পৃথিবীতে যতদিন পর্যন্ত একজন বাংলাদেশী বাঙালী থাকবে ততদিন পর্যন্ত এই অপরাধী বোধের কান্না ও অনুশোচনা থাকবে। দেশে কখনো কখনো লোমহর্ষক হত্যাকান্ডও সংঘঠিত হয়েছে।

 

যেমন কর্ণেল তাহের বা কর্ণেল মঞ্জুর হত্যাকান্ড। এগুলো যতটা রাজনৈতিক বা ক্ষমতা দখলের কামড়া-কামড়ির কারণে ঘটেছে বস্তুত ১৫ই আগস্ট ও ২১ আগস্ট ঘটনা দু’টো ঠিক তার বিপরীত। ১৫ই আগস্ট এবং ২১ আগস্ট যে নারকীয় হত্যার উল্লাস চলেছে সেটা বাঙালীর পরিচয়ের বিবেচনায়। একটি স্বাধীন জাতিকে পরিচয়হীন ও থুবড়ে ফেলার জন্য ঘটনা দুটি ঘটানো হয়েছে। এর সাথে স্বাধীনতাবিরোধী মানুষগুলো যেমন সরাসরি জড়িত তেমনি রয়েছে আন্তর্জাতিক ফেনমেনাও।

 

অর্থাৎ ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, ১৯৭৫ সালে ১৫ ই আগস্টে জাতির জনকের বুকে বাঙালীর ছোঁড়া বুলেট আর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা জাতিস্বত্ত্বার প্রশ্নের সেক্যুয়াল ট্রাজেডি। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল আর ৬৮ হাজার গ্রামের যে মানচিত্রের বাংলাদেশ তার মাটি দিয়ে তাঁর রক্ত-মাংস-শরীর গড়া। আবার বাংলাদেশের মানচিত্রতো তার বুক, হৃদয়। সুতরাং সেখানে ঘাতক কাটা থাকবে তা ধারণার অতীত। এক রাতে বঙ্গবন্ধু, খন্দকার মোশতাক ও পরিকল্পনা পরিষদ প্রধান ড. নুরুল ইসলাম নাশতা খাচ্ছিল।

 

হঠাৎ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘গত রাতে আমি অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছি। খন্দকার মোশতাক জানতে চাইলেন, কী স্বপ্ন?’’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম আল্লাহপাক আমাকে কোরবানির নির্দেশ দিলেন। তারপর ঘুম ভেঙ্গে গেল। এখন আমি কোরবানি দিতে প্রস্তুত। কোরবানি দিতে হয় সবচেয়ে প্রিয়জনকে। এই মুহুর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয়জন হল খন্দকার মোশতাক। ভাবছি তাকেই কোরবানি দিব।’

এই কথোপকথনকে শুধু রসাত্মক ভেবে ক্ষান্ত দেয়া ঠিক হবে না। এখানে সচ্ছতই বিদ্যমান বাঙালী বা তার মানুষদের জন্য কত দৃঢ় ভালবাসা ছিল জাতির জনকের। এখানে একটি কথা বলে নেয়া উত্তম যে ১৫ই আগস্ট এর ঘটনার বর্ণনা বা ২১ আগস্ট এর ঘটনার বয়ান দেয়া এই প্রবন্ধের লক্ষ্য নয়। আমরা এগোব বারবার একই কেন্দ্রে বিষাক্ত আঘাতের পুনরাবৃত্তি কেন? জাতির জনকের কাছে বাঙালীর বিরুদ্ধে কোন অনুযোগ দেয়াটাও ছিল তার চোখে অন্যায়ের সমান। তিনি সন্তানের স্নেহে দেশের প্রত্যেক মানুষকে ভালবাসতেন। আগলে রাখতেন। একটি ঘটনা প্রণিধানযোগ্য-RAW agents received information of a meeting between Major Rashid, Major Farooq and Lt. Col Usmani at Zia-ur-Rahman’s residence. The decision, among other things, had centered on the coup. During the three hour meeting one of the participants had doodled on a scrap of paper, which had been carelessly thrown into the waste basket. The scrap had been collected from the rubbish pile by a clerk and passed on to the RAW operative. The information finally reached New Delhi. Kao, Convinced that a coup was in the offing, flew into Dacca, under cover of a pan exporter. After his arrival at Dacca, he was driven to rendezvous arranged beforehand Mujib is reported to have the exercise highly dramatic and just could not understand why KAO could not have come to see him officially. The Kao- Mujib meeting lasted one hour. Kao was unable to convince Mujib that a coup was brewing and that his life was threatened, in spite of being given the names of those suspected to have been involved.

 

অথচ উত্তরে শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘যাদের কথা আপনি বলেছেন তারা আমার সন্তানসম।’ বাঙালী জাতির সঙ্গে শেখ মুজিবের প্রচন্ড ভালবাসা চিরতরে যেদিন অবসান ঘটল সেই ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট শুক্রবার ধলপহর ৫টা ৩৯ মিনিটেও তিনি আক্ষেপে বলছিলেন, ‘তোমরা কি চাও? তোমরা কি আমাকে খুন করতে চাও? ভুলে যাও। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তা করতে পারেনি। তোমরা কি মনে করো, তা করতে পারবে? আমি বাঙালি জাতিকে ভালবাসি। বাঙালি আমাকে ভালবাসে। বাঙালি আমাকে মারতে পারে না।’

 

এরপর তো সমস্তই ইতিহাস। তবে এই যে হত্যাকান্ড তার পিছনে লক্ষ্যছিল পুরানো ‘বন্ধু’র হাতে দেশকে ফিরিয়ে দেয়া। যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তবে স্ব-পরিবারে জাতির জনককে হত্যার নেপথ্যে বাঙালী পরিচয় দেয়ার সবচেয়ে বৃহৎ বটবৃক্ষটি উৎপাটনের সর্বত্রই বাঙালী জাতি ধ্বংস করা। স্বাধীনতা বিরোধীরা সর্বত্রই সক্রিয় ছিল। চূড়ান্ত বিজয়ের পর তারা মারণ কামড় দেয়ার জন্য অপেক্ষা করে। বেছে নেয় দেশ পুনর্গঠনের সময়। কারণ স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ যেমন অভিশাপ দিয়ে গেছে তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষুধা, সন্ত্রাসবাদ হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

 

দ্য ডেইলি স্টার-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ থেকে অনেকগুলো অঙ্গসংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৭৪-৭৫ এ তা প্রকট আকার ধারণ করে জাতির জনককে বেকায়দায় ফেলে। অঙ্গসংগঠনের নেতারা একক দলটিকে পৃথক মতাদর্শে নিয়ে যেতে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। যে কারণে আওয়ামী লীগেই অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ওদিকে যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে পরিস্থিতি সামাল দিতে একা জাতির জনককে হিমশিম খেতে হয়। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীতে শুরু হয় আত্মস্বার্থসিদ্ধি। বঙ্গবন্ধু বিতৃষ্ণ হয়ে লেঃ কর্ণেল এম.এ. হামিদকে বলেছিলেন, কর্ণেল সাহেব কি বলবো, আপনার আর্মির কথা। অফিসাররা শুধু আসে আর একে অন্যের বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করে অমুক এই করছে, সেই করছে। আমার প্রমোশন, আমার পোস্টিং। বলুন তো কি হবে এসব আর্মি দিয়ে? অফিসাররা এভাবে কামড়া-কামড়ি করলে ডিসিপ্লিন না রাখলে এই আর্মি দিয়ে আমি কি করবো? আমি এদের ঠেলাঠেলি সামলাবো, না দেশ চালাবো?

 

বঙ্গবন্ধু বিতৃষ্ণ হয়ে লেঃ কর্ণেল এম.এ. হামিদকে বলেছিলেন, ‘কর্ণেল সাহেব কি বলবো, আপনার আর্মির কথা। অফিসাররা শুধু আসে আর একে অন্যের বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করে। অমুক এই করছে, সেই করছে। আমার প্রমোশন, আমার পোস্টিং। বলুন তো কি হবে এসব আর্মি দিয়ে? অফিসাররা এভাবে কামড়া-কামড়ি করলে ডিসিপ্লিন না রাখলে; এই আর্মি দিয়ে আমি কি করবো? আমি এদের ঠেলাঠেলি সামলাবো, না দেশ চালাবো?’

 

‘বাঙালির স্বাধীনতার জন্য আমি কি-না করলাম। আইয়ুব খাঁ, ইয়াহিয়া খাঁর সাথে জীবনভর লড়াই করলাম। আমাকে কতবার জেলে দিল। বাঙালি সেনা পল্টনের জন্য লড়লাম। আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে। সবাই খাই খাই শুরু করেছে। কোথা থেকে আমি দেব, কেউ ভাবতে চায় না।’

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বলছে, যে কোন সমাজ দ্বন্দ্বময়। সমাজে দ্বন্দ্ব থাকবেই। এই তত্ত্বকে কিছু কিছু বিপথগামী বিষাক্ত বাঙালী ভুলভাবে প্রয়োগ করে জাতীয়ভাবে। যুদ্বিদ্ধস্ত বাংলাদেশের বয়স চার বছর হলেও অর্থনৈতিকভাবে, প্রশাসনিকভাবে, সামাজিকভাবে সমতা না আসার পিছনে জাতির জনককে দায়ী করেন এবং সেই রিউমার ছড়িয়ে দেন মাঠ পর্যায়ে। ফলে দ্বন্দ্ববাদপ্রিয় মানুষ ও অন্তর্ঘাতমুখী বাঙালীর সাথে জাতির জনকের মধ্যে কৌশলে দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়। এটা করা সম্ভব হয়েছিল এ কারণে, তার বিশ্বস্তরা ক্ষমতার লোভে বাঙালীত্ব হাড়িয়েছিল। যার ফলে গোপনে পাকিস্তানীদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। এই দুটি কারণে বাঙালী বিরোধী শক্তি ও অপবাঙালী এক স্থানে চলে আসে। বিষয়টি অল্প হলেও খুব ভালভাবেই উপলব্ধিতে আসে জাতির জনকের। ফলে তিনিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বহুমুখী গণতন্ত্রের সুষম প্রতিষ্ঠার চেয়ে যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে সবার আগে দরকার জীবনমান উন্নত করা। জীবনমান উন্নতকরণে শাসন চর্চা একমুখী করা সময়োপযোগী। তার আশপাশে কামড়া-কামড়ি করা লক্ষ্যহীন দূষিতমানুষের হাত থেকে রেহাই পেতেই হয়তো প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বাকশাল’।

 

কিন্তু মোশতাকসহ পরাজিত শক্তি জানতো মুজিব এর হাতে কর্তৃত্ব থাকলে তাদের স্বপ্নসিদ্ধি হবে না। ফলে চুড়ান্তভাবেই মুজিবকে হত্যার পথে এগোয়। এখানে স্মরণ করা উচিত, ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের কথা। যেখানে নবাব এর বিশ্বস্ত সেনাপতি শুধুমাত্র নিজের কারণে নবাব এর বিরুদ্ধে মাঠে নামে এবং ব্রিটিশ বেনিয়ার হাতে তুলে দেয় সাম্রাজ্য। মৃত্যু হয় একটি জাতিসত্ত্বার। তদ্রুপ স্বাধীনোত্তর দেশে মুজিব এর কণ্ঠরোধ করা সম্ভব হলেই কেবলমাত্র বাঙালী ও স্বাধীনতা বিরোধী সম্প্রদায়ের সাথে সখ্যতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। এর সুবাদে হয়তো কেউ কেউ ক্ষমতাবান হতে পারে, আর হত্যা ছাড়া মুজিব এর কণ্ঠরোধ অকল্পনীয়। এ সমস্ত সার্বিক হিংস্রতা ও পরাভব মানসিক টেনডন না ছিড়তে পারার কারণে রচিত হয় ১৯৭৫ সালের ভয়াবহ ও নৃশংস ১৫ই আগস্ট।

 

এর মাধ্যমে পন্ড হয়ে যাবার ধারণা ছিল স্বাধীনতার, জাতিস্বত্ত্বার প্রশ্নে আপোস চলে আসবে বলে ধরে নিয়েছিল ঘাতকরা। আবার উচ্চকিত কণ্ঠে ‘নারায়ে তাকবির’বলে জননীর শরীর থেকে ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিল স্বকীয়তার কাপড়। এ কাজে তৎকালীন সময়ে সফল হয়েছিল জাতিস্বত্ত্বা বিরোধীরা। কারণ জাতির জনককে হত্যার পরপরই মাথাচড়া দিয়ে ওঠে পাকিস্তানের দোসর ও ইসলামভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন। ইতিহাস বলছে, সামরিক বাহিনীর হাতে খুন হওয়া মুজিব পরিবারের বিরুদ্ধে অনেক কল্পকাহিনী নিয়ে মাঠে নামে তারা। দীর্ঘদিন বাহিনীর ভিতরে ঘাপ্টি মেরে থাকা এসব সৈন্যরা সেজে বসেন বাঙালীর ত্রাণকর্তা। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ শত্রু জামায়াতে ইসলামী এবং রাজাকারদের আদর-আপ্যায়ন করেই দেশে ফিরানো হল।

 

‘জয় বাংলা’ শ্লোগান যেমন বর্তমানে আওয়ামী লীগ এর নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে গেছে, তদ্রুপ উগ্রবাদী দলের সম্পত্তি হয়ে গেছে ইসলাম। ফলে বাংলাদেশে স্বাধীনতাপ্রত্যাশী মানুষকে দাঁড় করানো হল একটি ধর্মের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাকিস্তান বিরোধকে নামিয়ে দেয়া হল ভিন্ন ট্যানেলে। দখলী শাসনামলে তাই স্বাধীনতার স্ব-পক্ষের গণমানুষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচয় করানো হয় নাস্তিক ও ইসলাম বিরোধী বলে। এখানে ইসলামও ছিল মৌনভাবে। এ সমস্ত কৌশলে বেশ ক’দিন সেনা শাসকদের হাতেই চলল দেশ। উল্টোপথে চলা শুরু ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডর দিন থেকেই।

 

দ্য লাস্ট সিনড্রোম

উনত্রিশ বছর পর। ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট বিকেল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে চলছিল তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর এর বিক্ষোভ মিছিল পূর্ববর্তী সমাবেশ। সিলেটে বোমা হামলার প্রতিবাদ ও যশোরে পুলিশি নির্যাতনে ছাত্রলীগ কর্মী তুষার হত্যার প্রতিবাদে আহুত এ সমাবেশ ছিল বিএনপি ও জামায়াতের জঙ্গিবাদ তোষণকারীদের বিরুদ্ধে। তৎকালীন দুঃসময়ে জনসাধারণ চাইছিল একটি যোগ্য নির্দেশনা। রাষ্ট্রযন্ত্রে বসে স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে দেশকে তুলে দেয়ার যে টার্গেট ম্যাপ ছিল তা ফাঁস হয়েছিল জনতার সামনে। ফলে আওয়ামী লীগ ধরে এগোতে চায় দেশবাসী। সেই সূত্রে ২১ আগস্টের ঐ জনসভায় লাখ লাঘ মানুষের ঢল নামে। সেই জনসভায় সুক্ষ্ম ও সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা করে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলায় যদিও ২৪ জন নিহত হন, কিন্তু আহত ছিল কয়েকশ। তার চেয়ে ভয়ংকর কথা হল, নেতাকর্মী হত্যা করতে হামলা চালানো হয়নি, হয়েছিল শেখ হাসিনাকে খুন করতে।

 

গণমাধ্যম ও অধিকতর তদন্ত রিপোর্ট বলছে, হামলার সাথে সম্পৃক্ত ছিল রাষ্ট্রের একাধিক গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ নেতারা। আর বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ছিলেন পরিকল্পক। বেগম জিয়ার বিখ্যাত ‘হাওয়া ভবন’এ হয় হামলার পরিকল্পনা। এমনকি হামলাকারীদের পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দেন তারেক ও বাবর। জাতিকে বুঝানো হয়েছিল ভুল ব্যাখ্যা। সাজানো হয় জজ মিয়া নাটক। আলোচনার এই পর্যায়ে চিহ্নিত করতে পারেন ভিন্ন আখ্যান। সাবেক এ.এস.পি. মোঃ আবদুর রশীদ, এ.এস.পি. মুন্সি আতিকুর রহমান ও সিআইডিতে মামলার সুপারভিশন কর্মকর্তা পুলিশ সুপার মোঃ রুহুল আমিন।

 

আইন প্রয়োগের শীর্ষ পদে থাকা এরা নতুন গল্প ফাঁদে। লক্ষ্যণীয় যে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার পিছনে জড়িত ছিলেন বলে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে লেঃ কমান্ডার (অবঃ) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মোঃ আশরাফুল হুদা, আইজিপি শহিদুল হক, আইজিপি খোদাবক্স চৌধুরী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর মত লোকেরা। যদিও শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পান, কিন্তু বিএনপির ‘খেলা’ শেষ হয় না। জাতির জনককে হত্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টাসহ গ্রেনেড হামলা বিশে¬ষণ করলে বেশ কয়েকটি কারণ অনায়াসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উভয় ঘটনার মধ্যে জোরালো মিল রয়েছে। প্রথমত, ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যার পর বাংলাদেশে ইসলামি দলগুলো ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।

 

আর ২০০৪ সালে যখন শেখ হাসিনার উপর সর্বাত্মক হামলা হল তখনো ইসলামের ছদ্মবেশে সেই ইসলামিক দলগুলো সরকারী মদদে। দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধুকে হত্যায় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অফিসাররা নেতৃত্ব ও হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। তেমনি ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায়ও গোয়েন্দা সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের আ.ই.জি.পি ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা সরাসরি জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি মুজিব ও হাসিনাকে হত্যা করতে বেছে নিয়েছিল আগস্ট মাস।

 

সুতরাং একথা বলা যায় উভয় ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু এক এবং অভিন্ন সূত্র থেকে ঘটনাগুলো ঘটেছে। তাহলে কি হতে পারে সেই সূত্রপাত? মনে রাখা জরুরী বাংলাদেশকে এক কথায় প্রকাশ করা যেতে পারে চিবিপ্লবী কণ্ঠস্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে। ফলে বাংলাদেশকে যে বা যারা মেনে নেয়নি তারা দেশকে ধ্বংস করতে চাইলে প্রথমেই বেছে নিবে দেশটির মূল কণ্ঠস্বর চেপে ধরতে। সেজন্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রচনা করেছিল জাতির অভিশপ্ত রাত। তখন হত্যাকারীরা ৩২ নম্বরে যে গণহত্যা করেছিল তার মাধ্যমে আশান্বিত হয় নব্য স্বাধীন দেশকে আবার সমর্পণ করতে পারবে পাকিস্তানের হাতে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় গণহত্যার মিশন সফল হয়নি। তাই ২০০৪ সালে বাঙালীর ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা শেখ হাসিনাকে কার্যত শেখ মুজিবের বংশ পরস্পরাকে স্তব্ধ করে দিতে ২১ আগস্ট হামলা চালায়। রচিত হয় আগস্ট ট্রাজেডি। এই হত্যা ও হত্যাচেষ্টা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয় জাতিগতভাবে ঘৃণার। চিহ্নিত সেসব হত্যাকারী আজন্ম সক্রিয় থাকতে চেষ্টা চালাবে, তবু ভয়াবহ আগস্ট পেরিয়ে আসা বাংলাদেশকে সেই নীল মুখোশওয়ালাদের শাস্তির বিধান করতে হবে। এ প্রজন্ম এটাই চায়।

 

লেখকঃ সভাপতি নিউজ এডিটরস কাউন্সিল, বরিশাল


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]