আপনাকে অভিবাদন হে নগরসেবক


সৈয়দ মেহেদী হাসান : উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে জীবনের ঘানি টানার ফাঁকে ব্যাক্তি জীবনটাকে দুদন্ড সময় দেওয়ার ফুসরত থাকে কম। ফলে উৎসবপাগল বাংলাদেশের মানুষের যাপিত জীবনে বিভিন্ন পার্বণ হয়ে আসে শান্তির প্রতীক হয়ে। ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬৩ দিন পেটের খোরপোশ জোগাতে ব্যস্ত থেকে ক্লান্ত হলেও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা দুই দিন মায়ের কাছে ফেরার সুযোগ পান। ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহা। ত্যাগের মহিমায় নিজেদের শাণিত করার অনুশাসন থাকলেও মূলত স্বজনদের সাথে বসে একবেলা ভাত খাওয়া, সময় কাটানো, স্মৃতিচারণ করার মহানন্দের মহিমান্বিত এই সময় কেউ হাত ছাড়া করেন না। তাইতো প্রতি বছর নাড়ির টানে কোটি কোটি মানুষ জীবনের ঝুঁকি, ক্লান্তি, অর্থক্ষয় আর মৃত্যু উপেক্ষা করে বাড়ি ফিরতে ছোটে।

ঈদ এলে বিগত বছরগুলোতে বাড়ি ফেরা মানুষের সাথে সাথে কতগুলো দুর্ঘটনা ঘটলো, কতজন লাশ হলেন, কতটা পরিবারে কান্নার অভিশাপ চেপে বসলো সে-সবেরও হিসেব রাখতে হয়েছে গণমাধ্যমকর্মীদের। ফলে ঈদ আনন্দের উচ্ছলতার সাথে সাথে ভয় ও আতংক কাজ করতো মনে। তবে এবার একটু নির্ভার।

বিশেষ করে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তুমুল আলোচনা চলছে। আলোচনা ছড়িয়েছে গোটা দক্ষিণাঞ্চলে। বরিশাল নগরীতে একটি পজেটিভ পরিবর্তন এসছে একেবারে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে। আর সেই সিদ্ধান্ত এমন একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত যা দক্ষিণাঞ্চলে ফেরা কোটি মানুষের মনে অভয় সঞ্চার করেছে।

সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর উদ্যোগে ফ্রি বাস সার্ভিস। ‘এতে এমন কোন মোজেজা নেই’-বলে নিন্দুকেরা হাস্যরস করতে পারেন। করছেনও অনেকে। কারন বাস সার্ভিসে কত টাকা আর বাঁচলো যাত্রীদের। আগেওতো পকেট কাটেনি কেউ। নিন্দুকেরা বলছেন, আর কোন কাজ না পেয়ে মেয়র নিজেকে আলোচনায় আনছেন ফ্রি বাস দিয়ে (!)

বৃহস্পতিবার রাত থেকে এই বাস সার্ভিস চালু হওয়ার পর আমি বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোকের সাথে আলাপ করেছি। বিশেষ করে যাত্রী আর তিনচাকার মটরযান চালকদের সাথে। আলাপ করেছি সাবেক ও প্রাক্তন মেয়রদের অনুসারিদের সাথে। এতে ভিন্ন ভিন্ন কথা জেনেছি। প্রথমত যাদের কথা বলতে হয়, তারা তিনচাকার মটরযান চালক। এরা সমালোচনা করছেন। হুলুদ অটো, গ্যাস চালিত নীল অটো, সিএনজি ও আলফা চালক-শ্রমিক এবং মালিক সংগঠনের নেতারাও ‘তলে তলে’ বিষবাষ্প ছড়াচ্ছেন। হয়তো কেউ কেউ তাঁরা আপনার সদরেও নিয়মিত হাজিরা দেয়। এরা বলছেন, নগরীর বাইরের লোকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নগরীতে যারা থ্রি-হুইলার চালায় তাদের উপর নির্মমতা করা হয়েছে। এরা ঈদ এলে একটু-আধটু বেশি টাকা নেয় সেটাই সহ্য হলো না (!) আমাদের কি আর দরকার হবে না? এসব কথারপৃষ্ঠে যখন বলেছিলাম, টুকটাক কতটাকা বেশি নিতেন আপনারা? এই প্রশ্নের উত্তর জোটেনি।

তবে থ্রি-হুইলার চালক-মালিকদের এমন সমালোচনা শুধু মেয়রকে দিলেই চলবে না; বরংছ পকেট কাটার ক্ষুদ্রযান চালক-মালিকদের অভিশাপ নিতেও রাজি দক্ষিণাঞ্চলবাসী। কারন মেয়রের মৌলিক সিদ্ধান্তে নির্ভয় এসেছে, হয়রানি কমেছে, জিম্মিদশা থেকে পরিত্রাণ মিলেছে মায়ের কাছে ফিরে আসা জনতার।

বিগত ঈদের ‘টুকটাক’ অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়। আমার একজন স্বজন ঢাকা থেকে লঞ্চঘাটে নেমেছেন রাত তিনটা বাজে। ওইদিন অফিস থেকে আমি বাসায় ফিরেছিলাম দেড়টার দিকে। তখন পুলিশ লাইন্স থেকে হলুদ অটোতে নিয়মিত ১০ টাকার ভাড়া কুঁড়ি টাকা দিয়ে রুপাতলীতে পৌঁছেছি। আর রাত তিনটায় যখন লঞ্চঘাটে সেই স্বজনকে নিতে আসলাম অটোওয়ালা বললেন, মাথাকিস্তি ১২০ টাকা। মানে প্রতিজন ১২০টাকা করে। নিরুপায় আরসব মানুষেরা উঠছেন বাধ্য হয়ে। কারন জানতে চেয়ে কোন উত্তর আর এত কমদামে অটো না পেয়ে স্বজনসহ মোট ৬ জন যাত্রী নিয়ে রুপাতলীর উদ্দেশে ছাড়লো গাড়ি। যেতে যেতে কথা হলো ওই চালকের সাথে। তিনি জানালেন, সারা বছরতো আর রাখি না; ঈদ-কুরবানীতে যা একটু বাড়াই।

সারা বছর কিন্তু মানুষ এসব তিন চাকার মটোরযানে ফ্রি চলাচল করেন না যে ঈদের সময় এক সাথে দিব। তাহলে ঈদের সময় ভাড়া বাড়বে কেন? চালক জানালেন, এইসময় লোকের চাপ থাকে বেশি।

উৎপাদন সূত্র বলছে জোগান বেশি হলে পন্যের দাম কমে। কিন্তু এখানে দেখছি উল্টো। জোগান বা যাত্রী বেশি হওয়ার সাথে সাথে উৎপাদন সূত্র অকার্যকর করে দিচ্ছে চালকরা। ভাড়া কমিয়ে নেওয়ার বদলে দেওয়া হচ্ছে বাড়িয়ে। এটি জিম্মিদশা। চালকদের মুখে যা আসে সেই ভাড়ায় গেলে চলেন না গেছে নাই। ওই চালক রুপাতলীতে নেমে ভাড়া ১২০ টাকা নিয়ে বললো, আর ৩০ টাকা করে বখশিশ দিয়েন। মামা বাড়ির আবদারের মত এমন আবদার বিগত দিনে পূরণ করতে হয়েছে ঘরমুখো মানুষদের। ১০ টাকার ভাড়া যখন গিয়ে ১৫০ টাকায় দাড়ায় তখন কি তা টুকটাক ভাড়া বাড়ানো হয়?

চলতি ঈদে এমন জিম্মিদশা, হয়রানি, অর্থক্ষয় থেকে রক্ষা পেয়েছে মানুষ। ফলে অভিশাপ নিতে কারও আপত্তি নেই।

আবার মেয়র যখন রাতজেগে নগরী পাহাড়া দিচ্ছেন তখন কিন্তু বাধ্যগতভাবে প্রশাসনিক সকল লেভেল তড়িৎগতিতে কাজ করে। কারন খবরদারি করার লোক রাস্তায় আছে যে। ভাড়াবৃদ্ধি ও মানুষ জিম্মি করার ফুসরত পাচ্ছেন না চালকরা; কারণ কোনসময় মেয়রের গাড়ি এসে পৌঁছে যায়। দেখেছি শুধু প্রশাসন তদারকি নয় দলের নেতাকর্মীদের রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসিয়ে রেখেছেন নৈরাজ্য প্রতিরোধে।

ফ্রি-বাস সার্ভিস নিয়ে ওই যে বলেছিলাম কথা হয়েছে, সাবেক ও প্রাক্তন মেয়রের অনুসারীদের সাথে। তারাও বলেছেন, কাজটা ভালো হয়নি। এতে মেয়রের জনপ্রিয়তা কমবে। এও বলেছেন, তবে মানুষের মাঝে স্বস্তি ফেরাতে পেরেছেন। ওদিকে যারা লঞ্চথেকে নেমে ফ্রিবাসে নগরী পার হচ্ছেন তাদের অভিব্যাক্তি সঙ্গতকারণেই আহ্লাদে গদগদ হবে। কিন্তু যারা ফ্রিবাসের বাইরে একই সময়ে তিনচাকার গাড়িতে যাচ্ছেন তারা জানালেন, মেয়রের উদ্যোগ অভূতপূর্ব। অবিস্মরণীয়। মানুষের হার্টবিট তিনি বুঝতে পারেন।
হার্টবিট বোঝার ক্ষমতা চিকিৎসকদের থাকলেও নগরবাসীর হার্টবিট বোঝার এইযে দারুণ ক্ষমতা বংশপরম্পরার পরিচয়ের বাইরেও সাদিক আব্দুল্লাহকে জননেতায় পরিণত করছে।

পুনশ্চঃ সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ যখন নির্বাচিত হলেন; তখন শঙ্কা ছিল, আসলেই তিনি নগরবাসীর অভিভাবক হবেন নাকি নগরবাসীর শাসক হবেন?

সৌভাগ্য তিনি কিন্তু কোনটাই হননি। যাদুবাস্তবতার মত সাদিক আব্দুল্লাহ হয়ে উঠেছেন নগরবাসীর সেবক। তার ভালো কাজগুলোকে অভিবাদন জানানো উচিত; যেমন করে সমালোচনায় চায়ের টেবিল গরম করেন তার প্রত্যুত্তরে। কারন বরিশালবাসীর কল্যানে অভিভাবক বা শাসক; কোনটারই প্রয়োজন নেই। দরকার সেবক। আমরা তা পেয়েছি।

লেখক: সভাপতি, নিউজ এডিটরস কাউন্সিল, বরিশাল।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]