আবুল হাসেমের তিন অধ্যায়

  • 60
    Shares

চারপাশে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের মানুষ। তাদের আচরণ বা দৈহিক পার্থক্যও বিস্তর। কিন্তু সাবাই চায় একটু ভালোভাবে বাঁচতে-দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে। কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধতায় সবাই কি পারে সমানভাবে সুখি ও নির্ভাবনার জীবন অতিবাহিত করতে? এত কোটি মানুষের মাঝে পাশের মানুষটিকে কেউ কি দেখি মানুষের চোখে? এমন অনেক জীবনের ইতিহাস রয়ে গেছে না দেখার অন্তরালে। চলতে চলতে জীবন থেকে নেওয়া সেই পাঁচালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন গল্পকার ও সাংবাদিক বিধান সরকার। আজ পড়ুন-অষ্টম পর্ব।

বয়সের ধর্মের সাথে হয়তোবা সময়ের প্রয়োজন। ছুরি, রামদা আর ইটপাটকেল দিনমান। এসবতো হিম্মতেরি দেয় জানান। অর্ধযুগ আগেও ফুঁসে উঠতে দেখেছিনু এই বলে- সদর রোডের পুরানো বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসিলেই জবাব আসবে আমি কে? সময়ের ব্যবধান বলি, আর অধ্যায়ের পরিবর্তন বলি, তিনি বলী হয়েছেন আপন খেয়ালে বৈকি! সুযোগ ছিল, তাও বেহাত হয়েছে আপনা কারণে। এজন্য নিত্য অভাব জড়িয়ে তার চলমান জীবনে।

 

অবশ্য পেছনে আছে এক বঞ্চনার বেদনা। যে বেদনা তাকে এই জীবনে থিতু হতে দেয়নি। আসুন তার কাছ থেকেই শুনি, আপনা কাহিনী।

নাম আমার আবুল হাসেম। বাবার নাম আব্দুর রব আকন, মায়ের নাম হালিমা বেগম। গ্রাম কোদালপুর, গোসাইরহাট থানা বর্তমানে জেলা শরিয়তপুর। গেরস্ত পরিবার, বাবার এখনো সম্পত্তি আছে এক একর। মা মারা গেলেন তখন আমি ছোট। আমার আরেক ভাই ছিল বড়, আবুল কাশেম। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অসুস্থ হয়ে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা ফের নিকাহ করেন চাচীকে। সৎ মা ঘরে। তিনি কি আর খোঁজ খবর রাখেন? ওই যে অবহেলায় বেড়ে ওঠা তারপর একদিন বিড়ি শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাই। স্বাধনীতা যুদ্ধের সময় যখন ডামুডিয়া বাজার পোড়ায় পাকিস্তানী মিলিটারীরা, তখন নিজ গ্রাম কোদালপুরে চলে আসি।

 

বিড়ি শ্রমিক রাত বারোটা অবধি কাজ করতাম। কোদালপুর বাজার পোড়ালে চলে আসি বাড়িতে। একদিন মধ্যরাতে পানির পিপাসা জাগলে সৎ মায়ের কাছে পানি চেয়েছিলাম। জবাবে তিনি বলেছিলেন, এত রাতে পানির কি দরকার? ভাবলাম, নিজের মা হলে এমন করে বলতেন না। ওই কষ্টে পরদিন ভোরে পাড়ি জমাই ঢাকাতে। বাংলাবাজার বিড়ি শ্রমিক অফিসে কাজ নেই। সেখান থেকে বাউফলের কালাইয়া সোনার বাংলা বিড়ির মালিক শ্রমিক খোঁজতে গেলে তার সাথে চলে আসি। এর পরের অধ্যায় বরিশালে।

ফুটপাতে থাকতাম। অনেকটা টোকাইর মত। তখন কেউ চিনতো না। ওই কষ্টের দিনগুলোর কথায় কান্না পায়। একদিন রয়েল মাইকেল মালিক অনিল বাবুর সহায়তায় মাইক অপারেটরের কাজ পাই। মাইক নিয়ে দূর দূরান্তে চলে যেতাম। ভাগা ছিল শতকরা বিশ টাকা। রেকর্ড বাজাতাম, পরে টেপ রেকর্ডার আসে। ওসময় আব্বাস উদ্দিন, নিনা হামিদ, আব্দুল আলীমের গানের বেশ চাহিদা ছিল।

 

হিন্দি বলতে,লতা মুঙ্গেস্কর, মহম্মদ রফি, মেহেদি হাসানের গান বেশ বাজাতাম। এই তিন শিল্পীর লন্ডন প্রোগ্রাম যেখানে ‘ও দুনিয়াকে রাখোয়ালে’ এই গানটি গেয়ে রফির গলা থেকে রক্ত উঠেছিল। ওরপর মহম্মদ রফি বেশ কয়েক বছর গান বন্ধ রেখেছিলেন। মোট কথা তখনকার শিল্পীদের অনেক খবরই রাখতাম। মাইক অপারেটরের কাজ করতে গিয়েই সদর রোডের হান্নু মিয়ার সাথে পরিচয়। ওর পরের ঘটনা ভিন্ন।

তখন আলেকান্দার লোকজন সদর রোড থেকে চাঁদা নিতো। এতে বাদ সাধেন হান্নু মিয়া। অমনি একদিন আলেকান্দা, কাউনিয়া আর আমানতগঞ্জের এই তিন গ্রুপ মিলে সদর রোডের গ্রুপের সাথে মারামারি বাধায়। সেদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলেছিল মারামারি। ওদিনের বর্ণনায় আব্দুল হাসেম বলেন, তিন গ্রুপ মিলে আমাদের আক্রমণ করলে আমরা সবাই কাঠপট্টিতে ঢুকে পড়ি।

 

কাঠপট্টির নারীরা বেশ ভূমিকা রেখেছিল। এই নারীরা আমানতঞ্জের গ্রুপটিকে হটিয়ে দেয়। আর জয়নাল মিয়ার লোকজন বণিক বাড়ির দিয়ে কাউনিয়ার গ্রুপ ঠেকায় তখন বিকেল চারটা বাজে। তাদের তাড়িয়ে নাজিরের পুলে নিয়ে যায়। আর আমরা হান্নু মিয়ার গ্রুপের লোকজন আলেকান্দার গ্রুপকে কাকলির মোড়ের দিকে তাড়িয়ে নেই। ওসময় রামদা, আর হকিষ্টিকের আঘাতে প্রতিপক্ষের অনেকে যখম হয়েছিল।

 

আর আমরা- হান্নু, শাহআলম, জয়নাল, আয়নাল, নূরু, মজিদ, কাশেম, সুলতান, আমি মিলে পচিঁশ জনের মত ছিলাম যারা বুক চিতিয়ে মারামারি করেছি। আমাদের একটাই কথা ছিল আহত হলেও কোন রকমেই টু শব্দ করা যাবে না। এটাই ছিল বরিশাল নগরীতে মহল্লায় মহল্লায় মারামারির বড় ঘটনা। ওরপর টুকটাক হলেও তা পরবর্তীতে কমে আসে। আর আমিও নিজে চায়ের দোকান পেতে বসি। দাপট বা ক্ষমতা যখন ছিল তখনো কোন অবৈধ কামাইয়ের পানে মন সায় দেয়নি। অফার পেয়েছি যথেষ্ট। উপমায় টানেন সাথের অনেকেই মাস্তানী করে বাড়ি করেছেন। সত্যিই আমি তা করিনি।

বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। দুই পুত্র চার কন্যার জনক। চায়ের দোকান চালিয়েই মেয়েদের শিক্ষিত করে ভালোভাবে পাত্রস্থ করেছেন। তাই আর আক্ষেপ নেই। ছেলেরা শহরতলীর কাগাশুরাতে বাড়ি করেছেন। এখন পড়ন্ত বেলা, বয়স ছুঁয়েছে সত্তর। বুঝে গেছেন এখন আর খেটেও তেমন কিছু করতে পারবেন না। ফেলে আসা ডানপিটে অধ্যায়ের কথা তোলতে আক্ষেপ করে বলেন, ওসব তো সঙ্গদোষ আর যৌবনের ফল।

 

আমার যদি ভালো পরিচালক থাকতো অন্তত বড় ভাইটি বেঁচে থাকতো, তাহলে আমার জীবন ভিন্ন ভাবে বইতো। দেহাতের বাড়ির কথা জিজ্ঞাসিলে বলেন, বাড়ি ছাড়ার চল্লিশ বছর পর গিয়েছিলাম বটে, তবে সেখানে আমার রক্তের তো কেউ নাই। যেন হঠাৎ মৃত্যু হয়, এখন আলেমুলগায়েবের কাছে কামনা এটাই।


  • 60
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]