আমাদের সংস্কৃতি


কাজল দাস।। অনেকদিন থেকেই একটা বিষয় আমার মগজে গজ-গজ করছে; তা হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি মনস্কতা কি ছিলো-আছে-থাকবে? আজকাল ডিজিটালাইজেশনের ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার যে অবস্থা তাতে সংস্কৃতি মনস্কতা শব্দটা উচ্চারণ করাটাই কষ্টকর, কণ্ঠ শুকিয়ে আসে। কিন্তু সত্যিই আমাদের সংস্কৃতি মনস্কতা কমে যাচ্ছে কিনা সে প্রশ্নটা যদি আমাকে করেন তবে আমি স্পষ্ট করে বলবো- আমি জানি না। এ নিয়ে আজকাল যতই ভাবছি ততই গুলিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি এ লেখাটা পড়ার পরে আপনিও খানিকটা গুলিয়ে যেতে পারেন।

দেখুন, সংস্কৃতি কথাটার মধ্যে সংস্কারের একটা বিষয় আছে। যেমন ধরুন, আপনার পূর্বপুরুষের থেকে পাওয়া পুরনো বাড়িটার দেয়ালের প্লাটার খসে পড়ছে সেগুলো সাড়ানো হয়েছে, পোঁকা বাসা বেঁধেছিলো সেগুলো ফেলে পুরো বাড়িটার ভেতর ও বাহিরের অংশগুলো ঠিকঠাক ভাবে মজবুত এবং পরিস্কার করা হলো। সংস্কৃতির যে মূলস্তম্ভ সেটাও এমনি- নিরন্তর চর্চার মাধ্যমে সভ্যতার মনস্তাত্বিক ও সামাজিক উন্নয়ন। এখন আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন যে, আমি সংস্কৃতি মনস্ককিনা সেটা আপনি কি করে বুঝবেন? তাই তো! দেখুন একটি জাতির সংস্কৃতি মনস্কতা; সে নাচ-গান করে কিনা, মঞ্চে কেউ উঠলে সে হাততালি দেয় কিনা, নাটক থিয়েটার করে কিনা বা কবিতা বোঝে কিনা; এসব দেখে ঠিক করা যায় না!

বরংচ তার আচরণ, ব্যবহার, বিদ্যা, বুদ্ধি, শিক্ষা এরকম বিষয় দিয়ে বিচার করতে হয়। ধরুন, রিক্সা থেকে নেমেই ভাড়া নিয়ে রিক্সাওয়ালার সাথে আপনার তুমুল লেগেগেলো- তখন আপনার মুখের ও শরীরের ভাষা কি? বা ধরুন বাজার করতে গেলেন তখন সবজি বা মাছওয়ালার সাথে দাম নিয়ে লেগে গেলো- তখন আপনার আচরনটা কেমন? বা দেখুনতো আপনার দেশের একজন রাজনীতিজীবি মঞ্চে বা মিডিয়ার সামনে তার বিরোধী দলের বা মতের মানুষ সম্পর্কে কি ভাষায় আর কিভাবে কথা বলছেন? বা খেয়াল করুনতো, যথন একটা মানুষকে সবাই মিলে রাস্তায় ফেলে পেটাচ্ছে চোর আখ্যা দিয়ে তখন তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে আপনি কি করছেন- আপনি কি লোকটাকে মারতে যাচ্ছেন নাকি বাঁচাতে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা আজকাল যে অসভ্যতার মহোৎসব দেখছি সেখানেও সবাই মিলে একজন ব্যাক্তিকে আক্রমন করছে। সেই মানুষটিকে আক্রমন করে বিশ্রি ভাষায় নোংড়ামো করলেই আমি ফেমাস হয়ে যাবো- সেখানে কতটা নোংড়া ভাষা নিয়ে আপনিও গড্ডালিকায় গা ভাসালেন? এ সবকিছুই স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে দেয় আপনাদের সংস্কৃতি মনস্কতার লক্ষন!

যদিও এভাবে আপনারা আপনাদের সংস্কৃতিকে দেখেননি কখনো; তবুও বলছি যদি এভাবে আজ থেকেই-এখন থেকেই এভাবে দেখতে শুরু করেন তাহলে নিজেদের আর খুব বেশী সংস্কৃতি মনস্ক বলে ভাবতেই পারবেন না। যদি আরেকটু উচুতে উঠে নিজের দিকে তাকান তবে দেখবেন, আপনাদের জীবনাচারে অসভ্যতা, অভদ্রতা, হিংস্রতা কিভাবে বেড়ে গেছ! আপনি হয়ত বলবেন এর অনেক কারন আছে, আর জনসংখ্যার বিস্ফোরনও সেগুলোর মধ্যে একটি। স্বাভাবিক ভাবেই জনসংখ্যা বাড়লে প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়; তখন চাকরি না পেয়ে বা ছোট-মাঝারি ব্যবসায় হতাশা নেমে আসে। দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেনীর অসমর্থতা থাকলেও চারদিকের শপিংমলের আলোঝলকানি, বৈভব তার লোভকে বাড়িয়ে দিয়ে যায়, যা সে পূরন করতে পারছে না। ওখানেই হতাশা বেড়ে জীবনের প্রতি একটা আস্বাদহীনতা চলে আসে। সে কারনেও সংস্কৃতি মনস্কতা অনেকটা কমে আসে।

যাক্ এসব প্যাচাল বাদ দিয়ে আসুন এবার আমরা আসল কথায় ফিরি! সংস্কৃতি বলতে আমরা আসলে যা বুঝি- সাহিত্য, নাটক, থিয়েটার, সংগীত, শিল্প, সিনেমা; এসব নিয়ে। সেখানে আমাদের অবস্থাটা আসলে কি? ধরুন আজ থেকে পনেরো বছর আগের কথাতেই ফিরি- সে সময় এ শহরে নাটক হলে, থিয়েটার হলে, আবৃত্তি বা পাঠ হলে অনুষ্ঠানগুলোতে দাড়াবার জায়গা থাকতো না। চারুকলায় কোন চিত্র বা মৃৎ প্রদর্শনী হলে অশ্বিনী কুমার হলে লোকে টইটুম্বুর থাকতো। ব্রজমোহন বিদ্যালয় মাঠে উদীচীর বৈশাখী মেলা হোক বা কোন সংগঠনের ৩-৪ দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবখানেই লোকে লোকারন্য থাকতো; কোন রোদ বা বৃষ্টি কখনোই তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। এই ছিলো আমাদের সংস্কৃতি মনস্কতা।

যদিও উৎসবের নামে সংস্কৃতি ব্যবসায়ীদের চাঁদা তুলে রাতের কাঁচের বোতলের যোগান দেয়ার কালচার তখনো এতটা ছিলো না যতটা এখন আছে, তবে তখন ধর্মান্ধতার কালো অন্ধকার কিন্তু তখনো এতটা গ্রাস করতে পারেনি আমাদের সংস্কৃতি মনস্কতাকে। যাক সেসব অন্য আলোচনা, ও আরেকদিন হবে। আজ যা বলছিলাম, আচ্ছা ধরুন দেশের বা দেশের বাইরের কোন নামকরা শিল্পিকে এনে এখন কোন সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো; যেখানে লাল-নীল বাতি জ্বালিয়ে গান আর নাচ হলো। ধরুন, যেখানে আমাদের অশিক্ষিত রাজনীতিজীবিরাও আসবেন, কি বলেন লোক হবে না? আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, অবশ্যই হবে বরংচ অনেকগুন বেশী ভীড় হবে। মুহুর্তে মুহুর্তে ফেসবুকে ছবি আপলোড হবে অশিক্ষিত নেতার সাথে বা সেই নামকরা শিল্পীর সাথে। সেখানে ফুচকা-চটপটির দোকান বসবে, রীতিমত মেলা জমে যাবে!

আচ্ছা, তাতে কি প্রমান হয় আপনি সংস্কৃতি মনস্ক? না, হয় না; বরংছ আপনার সেই চিরচেনা হুজুগে বাঙ্গালীয়ানাটা প্রকট হয়। ওই বিরাট নামগুলোর সাথে আপনাকে মিশিয়ে কেবলই প্রচারনা হয়। ওটা সংস্কৃতি মনস্কতা নয়। যে সংস্কৃতি আমাদের শেকড়কে আকড়ে ধরে আছে তার প্রতি মনোযোগী হওয়াটা জরুরী। ওটাকে গিলে খাওয়া যায় না, ভেতরে ধারন করতে হয়- বুঝতে হয়। আর যেদিন থেকেই আপনি সংস্কৃতি নিয়ে এভাবে ভাবতে শুরু করবেন সেদিন থেকেই আমরা আপনাকে সংস্কৃতি মনস্ক হিসেবে চিনতে শুরু করবো।

আজকের এই সংস্কৃতি মনস্কতাহীনতার অসময়ে দাড়িয়ে আমরা প্রচন্ডভাবে আমাদের ভেতরের টানকে অনুভব করছি। কিন্তু নিজেদের ভুলগুলো কি বুঝতে পেরেছি? চারদিকে, ধর্মান্ধতা আর মৌলবাদের আগ্রাসনে যেমন আমদের সংস্কৃতি মনস্কতা দিনে দিনে কমে গেছে; তেমনি একদল অসংস্কৃতি ব্যবসায়ীদের সংস্কৃতির নামে দোকান খুলে ব্যাক্তিস্বার্থসিদ্ধি এবং চাঁদাতুলে নৈশ বোতলের সরবরাহও বেড়ে গেছে। এসব ধান্দাবাজী এবং সম্প্রতি প্রগতিশীল মানুষগুলোর মৌনতা আর মূল সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুতির কারনে আমাদের বাক স্বাধীনতার রুদ্ধতা এসব ভন্ডদের মুখোশ নুতন করে উন্মোচন করেছে। একজন সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ যদি মনখুলে কথাই না বলতে পারে, প্রতিবাদ না করতে পারে তবে সেটা কেমন সংস্কৃতি মনস্কতা?

সংস্কৃতি চর্চায় সমাজ পরিবর্তনের কথা যদি নাই বলা হয়?

সংস্কৃতি মনস্কতায় সেই বাকস্বাধীনতা যদি নাই থাকে?

যদি মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়! সে সংস্কৃতি মনস্কতা দিয়ে হবেটা কি?

তাহলে মোদ্দাকথা গিয়ে দাড়ালো, যে জিনিসটা আমাদের হয়ত একময় ছিলো বা ছিলোই না, বা আদতে নেইই তা আবার হবে কি করে? চিরকাল পরনিন্দা, পরচর্চা করা এ মানুষগুলোর সংস্কৃতি মনস্কতার বোধ জাগ্রত হোক সেটাই এখন একমাত্র কামনা হওয়া উচিৎ, তাই সেটাই হোক আপাতত নিরন্তর চেষ্টা।##


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]