উৎসব তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়!


দিনের ব্যবধানে সাতক্ষীরা শহরে জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে রিকসা, মটর ভ্যান ও ইজিবাইক। ভ্যানের প্যাডেল আর চাকার সাথে প্রতিনিয়ত ঘূর্ণায়মান তাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। ভ্যানের চাকার প্রতিটা ঘূর্ণিতে তাদের আয়। একটি ভ্যানের উপর তাদের সকল নির্ভারশীলতা ঝুকে থাকে। খাওয়া, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়ালেখা সংসারের খরচ এবং ঈদ আনন্দ সব কিছু দিনের আয়কে ঘীরে।

ঈদকে সামনে রেখে দিন রাত শহরের বিভিন্ন প্রান্তে যাত্রী নিয়ে ছুটে চলেছেন তারা। এ ঈদে পরিবারের সদস্যদের নতুন পোশাক দিতে হবে। ঈদের দিন ভাল খাবার খেতে হবে। বাড়ীতে আত্নীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিরা বেড়াতে আসবে। তাদেরকে আপ্যায়ণ করতে হবে। এ সব কারনেই দিন রাত পরিশ্রম করছেন তারা।

ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি তখন রাত সাড়ে ১২ টা। কথা হয় এক বৃদ্ধ ভ্যানচালক আবু মুসার সাথে। শহরের নিউমার্কেট সংলগ্ন রোডে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। নানা ধরনের কথার মধ্য দিয়ে জানা গেল তার গ্রামের বাড়ী আশাশুনি উপজেলায়। সাতক্ষীরা শহরে ২০১০ সাল থেকে। বিধ্বংসী আইলা তার বাড়ীঘর জলস্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সেই থেকে সাতক্ষীরা শহরে তার বসবাস।

ভ্যানচালক মুসা বলেন, ঈদের আর কয়টাদিন বাকি। নাতি-নাতনিদের নতুন পোশাক দিতে হবে। পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কিনবো। অনেক টাকার দরকার। তাই সারা রাত শহরে ভ্যান চালাচ্ছি। রাতের মানুষগুলোর অনেক পরিবর্তন। নেই তাড়াহুড়া। নেই তেমন ব্যস্ততাও। কেউ গালাগালি বা মন্দ কথা বলেনা। যে যেখানে যেতে চাচ্ছে নিয়ে যাচ্ছি। খুশি হয়ে সবাই বেশি বেশি ভাড়া দিচ্ছে। রাতের শহরটাই দিনের বিপরীত। রাতের বেলায় কারও কাছে ভাড়া চাওয়া লাগে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবাই বিবেচনা করে বেশি দেয়।

রাতে শহরে কোন ছিনতাইের কবলে পড়ছে কি সে বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, শহরের গলিতে পুলিশের টহল। কোন ছিনতাইকারির সাথে দেখা হয় না।

এত রাতে কারা ভ্যানে উঠেন জানতে চাইলে চলেন, ঈদের সময় তো মানুষ ঢাকা থেকে ফিরছে। ঢাকার গাড়ীগুলো অনেক রাতে আসে। তাদের নিয়ে যায়। আবার শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী তাদেরকে বাসায় পৌঁছে দিই। এমন কর্ম ব্যস্ত অনেক মানুষ-ই ঘরে ফেরে আমার ভ্যানে উঠে।

শহরে রাত কয়টা পর্যন্ত থাকবে জানতে চাইলে বলেন, সেহরি পর্যন্ত শহরে ভ্যান নিয়ে থাকবেন তিনি। আর কয়টি দিন পরই ঈদ, এই ঈদের দিনে তিনি ভ্যান চালাবেন কি সে বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ইচ্ছা না থাকলেও অনিচ্ছাকৃত ভাবে ঈদের দিনটিতে ভ্যান চালাতে হয়। কারন ঈদের দিন অনেক আয় হয়। বকশিস দেয় অনেকে। তাই ঈদের দিনটিতেও ভ্যান নিয়ে বের হতে হয় অন্য দিনের মত।

কোনো স্বচ্ছ পারিবারিক জীবন নেই এ সব রাতের বৃদ্ধ ভ্যান চালকদের। স্বপ্নহীন এই মানুষদের কাছে তাই কোনো উন্নত জীবনের ভাবনা ধরা দেয় না। উৎসব তাদের রাতের ঘুম কেঁড়ে নেয়। অমানবিক পরিশ্রমের মধ্য কেটে যায় একটি বিশেষ দিন, যেটিও ভিন্ন কিছু দেখায় না। অন্য দিনের মতই ভ্যানের চাকায় চাকায় স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে।

নিত্য নিষ্ঠুরতার মাঝেই তাদের সবার বসবাস। আবু মুসা দিনে ভ্যান চালালেও দিন শেষে পরিবারে সবার মুখে হাঁসি ফোটাতে রাতের শহরের সঙ্গী হন।


বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।