একজন প্রিয়া সাহার অসত্য নালিশ এবং আমাদের বাংলাদেশ

  • 36
    Shares

ভায়লেট হালদার : প্রিয়া সাহা নিজ দেশে মানুষের দ্বারা মানুষ নির্যাতনের বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম শক্তিমান প্রেসিডেন্টের কাছে অভিযোগ করেছেন। প্রিয়া সাহা আমেরিকায় আশ্রয় চেয়েছে। প্রশ্ন জাগে, প্রিয়া সাহারা কি মনে করে, তিনি নিজে সুরক্ষিত মানেই সকল নির্যাতিত সুরক্ষিত?

‘মাৎস্যন্যায়’ বলে একটি শব্দ আছে। যার অর্থ বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়। সংখ্যালঘু বলতে কি শুধুমাত্র ধর্মের কারণে মানুষ নির্যাতনের শিকার? ছোট’র উপরে বড়’র কর্তৃত্ব! ধর্মীয় সংখ্যালঘুর উপরে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর কর্তৃত্ব। ক্ষমতাসীনের দ্বারা ক্ষমতাহীন নির্যাতিত! নারীর উপরে পুরুষের কর্তৃত্ব। পুরুষ দ্বারা নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার। বিত্তবানের দ্বারা বিত্তহীন নির্যাতিত। অশিক্ষিতের উপর শিক্ষিতের কর্তৃত্ব! কালোর উপরে সাদার কর্তৃত্ব। এরকম অনেক বিষয়ে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুর চরিত্র স্পষ্ট করা যায়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে নানা বর্ণের, একাধিক সংস্কৃতির ও বহু ধর্মের মানুষের বাস। মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাবের আদান প্রদান, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ফলে সে দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বিরাজ করে। মানুষের ভেতরে মতের অমিলসহ নানা কারণে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অবনতি এবং অগ্রহণযোগ্য সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে। আর যে কারণে রাষ্ট্র বানিয়ে রেখেছে আইন-আদালত। প্রতিটি দেশের নাগরিক তার নিজ দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে বাধ্য এবং প্রয়োজনে নিজ দেশের আইনের আশ্রয় নিতে পারে।

ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২৭টি দেশের ২৭জন প্রতিনিধির কাছ থেকে বক্তব্য শুনছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বাংলাদেশের একজন মানবাধিকার কর্মী- হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক। ‘দলিত কণ্ঠ’ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ‘শারি’র নির্বাহী পরিচালক। এছাড়াও তিনি মহিলা ঐক্য পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। প্রিয়া সাহা নিজেকে বাংলাদেশী পরিচয় দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেছে, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নিখোঁজ রয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই। এখনো বাংলাদেশে এক কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু মানুষ বসবাস করছে। আমার অনুরোধ, দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশ ছাড়তে চাই না। শুধু আমাদের বাংলাদেশে থাকতে সাহায্য করুন। আমি আমার বাড়ি হারিয়েছি। তারা আমার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। তারা আমার জমি কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু কোনো বিচার হয়নি।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানতে চান, ‘কারা তার জমি দখল করেছে? কারা বাড়ি দখল করেছে?’ জবাবে প্রিয়া সাহা বলেছে, ‘মুসলিম মৌলবাদী গ্রুপ এগুলো করছে। তারা সব সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকে।’

– প্রিয়া সাহা যে পরিসংখ্যান দিয়েছে তা কতখানি সত্য?
– তিনি হাজার, লক্ষ, কোটি’র হিসাব বোঝেন তো?
– তার উপস্থাপিত সংখ্যা নির্যাতনের শিকার সংখালঘুদের তথ্য প্রমাণ প্রকাশ করতে পারবে?

প্রিয়া সাহা আমেরিকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়ে নিজের সুরক্ষা চেয়েছে। বাংলাদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা চেয়েছে। তিনি তো আমাদের প্রতিবেশী হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ভারতে আশ্রয় চাইলেন না কেন? পত্রিকায় দেখেছি ভারতেও ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হন। প্রিয়া সাহা যাদের জন্য নিরাপত্তা চাইলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে, তাদের সকলকে কি আমেরিকা আশ্রয় দিতে সক্ষম? শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের কোন দেশ আশ্রয় দিতে সক্ষম? অথবা ধর্মীয় কারণে একটি দেশ বা একটি জাতি গঠন সম্ভব? যদি আমেরিকা বিভিন্ন দেশের সকল সংখ্যালঘুকে আশ্রয় দিতে সক্ষম না হয়, তবে কে বা কারা কোন উদ্দেশ্যে এই ২৭টি দেশের ২৭জনকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছে? প্রিয়া সাহা কিভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়ে অভিযোগ জানাতে গেলেন? কে বা কারা প্রিয়া সাহাকে সহযোগিতা করেছে?

২/৩ মাস আগে প্রিয়া সাহার বাড়ীতে আগুনে পুড়েছে। কেউ কি তার বাড়িতে আগুন দিয়েছে নাকি আগুন লাগা নিতান্তই দুর্ঘটনা তা আমি জানি না। তর্কের খ্যাতিরে যদি ধরেও নেই তার বাড়ি শত্রুতা বশত কেউ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। তাহলে তিনি কি তার জন্য অভিযোগ দায়ের করে মামলা করেছে আদালতে? অথবা তিনি নির্যাতনের শিকার হয়ে রাষ্ট্র, সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন? কি কারণে তিনি দেশে থেকে হাজার কিলোমিটার দূরদেশে নালিশ জানাতে গেলেন? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কি বাংলাদেশ শাসন করেন?

একজন মানবাধিকার কর্মী যিনি মাঠ পর্যায়ে তৃণমূল মানুষের সঙ্গে কাজ করেছে তিনি কিভাবে দেশ সম্পর্কে ভিনদেশীদের কাছে নালিশ করতে পারে? বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা, শিক্ষা প্রিয়া সাহা কিভাবে মাটি চাপা দিয়ে দিতে পারে? আমাদের দেশে তো সমস্যা একটি নয়, অগণিত। প্রতিদিন অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। মানুষকে আতংকগ্রস্থ করে তুলেছে। এর জন্য কে দায়ী? কারা সন্ত্রাস করছে? সন্ত্রাসের বীজ কোথা থেকে আসছে? এর জন্য কি দায়ী শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যাগুরু? পৃথিবীর সর্বত্রই মাৎস্যন্যায় চলছে। কোথাও কম কোথাও বেশী। নালিশ দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না। নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদের করতে হয়। বাংলাদেশ হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সহ অন্যান্য মতবাদে বিশ্বাসী সকল মানুষের দেশ। যদিও কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক বিষাক্রান্ত মৌলবাদী কিছু লোক হুঙ্কার দিয়ে বলে বাংলাদেশ মুসলমানের দেশ। যদিও এটা সকল বাংলাদেশী বিশ্বাস করে না, মানেও না। আমাদের বাংলাদেশে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সরকারের উদ্যোগ ও আইনের প্রয়োগ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সচেতন থাকা একান্ত জরুরী।

ভায়লেট হালদার : প্রবাসী লেখক


  • 36
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]