বরিশাল শিক্ষাবোর্ড

এমএলএসএস থেকে সিবিএ নেতা, তিন বছরে শতকোটি টাকার মালিক

  • 27
    Shares

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এর ই. পি. আই কর্মী ইসরাত জাহান লাভলী। ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর(১৩, ১৪ ও ১৫)নির্বাচিত হন তিনি। ওই নির্বাচনে তিনি কোটি টাকার ওপরে খরচ করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী নগর আওয়ামীলীগ নেত্রী কামরুন নাহার রোজি। তার দাবি ছিলো খরচ করা সকল অর্থই ছিলো কালো টাকা। আর তার মালিক লাভলীর স্বামী বরিশাল শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী সংঘ সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিন। এরপর রোজী নির্বাচন সংশ্লিস্ট কর্মকর্তা ও দলীয় নীতিনির্ধারকদের কাছেও অভিযোগ করেছিলেন।

 

তবে রোজীর ওই অভিযোগের কারনে কোন বেগ পেতে হয়নি লাভলীকে। তার স্বামী নাসির অর্থের প্রভাবে সব ম্যানেজ করে নিয়েছিলেন। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বরিশাল শিক্ষাবোর্ডের তৃতীয় শ্রেনীর এই কর্মচারী ও কর্মচারী সংঘ সম্পাদক জুয়ার কোর্ট পরিচালনা, শিক্ষাবোর্ডে সকল টেন্ডার নিয়ন্ত্রন, ক্যান্টিন দখল, পুকুর দখল করে মাছচাষসহ অনেক অনিয়ম করে এখন অর্ধশত কোটি টাকা মালিক বনে গেছেন।

নগরীর (১৩,১৪ ও ১৫) নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কামরুন্নাহার রোজি বলেন, নাসির আমার এলাকার বাসিন্দা। ও বড় ভাইয়ের সাথে চায়ের দোকান করতো। একটি ছাউনীর মত ঘরে সবাই মিলে বসবাস করতো। ২০০১ সালে বিএনপি শিক্ষাবের্ডে চাকুরী হলে মোটামুটি একটু অবস্থার পরিবর্তন হয়। কয়েক বছর পূর্বে ও আমার বাসায় ভাড়া আসে। তষনও সংসারে টানাপোরন ছিলো। এরপর আমি ওর স্ত্রী লাভলীকে সিটি কর্পোরেশনে ই. পি আই কর্মী হিসেবে চাকুরী দেই। হঠাৎ করে বছর পাচেক পূর্বে সাসির আমাদের এলাকায় বেশ কিছু জমি কিনে। যার দাম অর্ধকোটি টাকার বেশী। এরপর সেখানে ৫ তলা ভবনও নির্মান করে। গত ৭ বছরে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে তৃতীয় শ্রেনীর এই কর্মচারী।

 

নগরীর টিয়াখালী ও শায়েস্তাবাদ এলাকায় তার রয়েছে শত একর জমি। তবে আমি হতবাক হই যখন নাসির দুই বছর আগে এলাকায় একটা বাহিনী করে তাদের অজ¯্র টাকা দিতে থাকে। এরপর ওই বাহিনীকে দিয়ে তিনটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের মধ্যে টাকা দেয়া শুরু করলে আমি পুলিশ ও হাইকমান্ডকে বিষয়টি জানাই। পরে যখন তার স্ত্রী লাভলী সিটি নির্বাচনে আমার প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী হন তখন বুঝতে পারি তার টাকা ছরানোর উদ্দেশ্য। রোজি দাবি করেন নির্বাচনে নাসির কোটি টাকার ওপরে খরচ করেছেন। আর তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ভোট চুরি করিয়েছে। তিনি বরেলন, লাভলী কেবল প্রার্থীই ছিলো। সব করেছে নাসির। প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় শ্রেনীর একজন কর্মচারী হয়ে এত টাকা কোথা থেকে আসলো তার তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন রোজি।

বরিশাল শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী সংঘ সভাপতি আবু জাফর। পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সম্পাদক আ. রব এর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জাফর বদরপুর ইউনিয়নের শ্রমিক দলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাবেক স্বরাস্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সুপারিশে ২০০১ সালে এম এল এস এস পদে চাকুরী হয় তার। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে শ্রমিকলীগ এর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন তিনি। মহানগর শ্রমিকলীগ সভাপতি আফতার হোসেনের আশির্বাদে ২০১২ সালে শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী সংঘের সাংগঠনিক সম্পাদক হন জাফর। এরপর দুইটি পদোন্নতি নিয়ে হয়ে যান উচ্চমান সহকারী। ২০১৫ সালে কর্মচারী সংঘ সভাপতি হন আবু জাফর। ওই বছরই তিনি নগরীর ২১ নং ওয়ার্ডের সার্কুলার রোড এলাকায় অর্ধকোটি টাকা দিয়ে জমি কিনে পরের বছর একটি বহুতল ভবন নির্মান করেন। এরপর ২০১৭ সালে সার্কুলার রোডে মানু মিয়া লেনে আরেকটি জমি কিনেন জাফর। সেখানেও বহুতল ভবন নির্মান করেন।

এরপরে তার বিরুদ্ধে দুর্নিতীর আভিযোগ দেয়া হলে তিনি আগের বারিটি বিক্রি করে দেন। এখানেই শেষ নয় তার গ্রাম বদরপুরে ৫ একর জমি ক্রয় করেন আবু জাফর। সেখানে বদরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন জাফর। এর বাইরেও কয়েক একর জমির ওপর তার মাছের ঘের রয়েছে। শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী সংঘ এই নেতা সিটি নির্বাচনে ২১ নং ওয়ার্ড নির্বাচিত কাউন্সিলর এর পক্ষে অর্ধকোটি টাকা ব্যায় করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২১ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আলতাফ মাহামুদ শিকদার বলেন, আবু জাফরের সাথে বর্তমান কাউন্সিলরের বেশ সখ্যতা। তিনি অনেক অর্থের মালিক। খরচও করেছেন দুহাতে। এই এলাকায় তার বেশকিছু জমি রয়েছে। যা কোন সাধারন মানুষের ক্রয় করা সম্ভব না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল শিক্ষাবোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, জাফর-নাসির কর্মচারী সংঘ নেতা হবার পরে শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষার খাতা ছাপানো, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানোর স্বীকৃতি নবায়ন, পাঠদান অনুমতি ও পরিচালনা কমিটি বানিজ্যসহ শিক্ষাবোর্ডের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের টেন্ডার এবং পুকুর দখল করে মাছচাষ শুরু করে। এতে তারা কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে নেয়। বোর্ডের সর্বোচ্চ কর্তাকে ম্যানেজ করেই তারা এগুলো করে। বরিশাল শিক্ষাবোর্ডে জাফরের শ্যালক মিলন ও নাসিরের শ্যালক সুমন এবং নাসিরের ভাই কামরুলকে চাকুরী দিয়েছেন তারা। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নাসিরকে তার পরিচালিত কাটপট্টি এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ও পুর্ণবাসন কেন্দ্র থেকে গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে। এসময় তার ওই কোর্টে খেলতে আসা ১৬ জুয়ারীকেও আটক করা হয়।

 

পরে গোয়েন্দা পুলিশ তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে বেশ কয়েকদিন সে কারাবরন করলে অফিস কোন ব্যাবস্থা নেয়নি। এর বাইরে পরীক্ষায় ফলাফল কেলেঙ্কারীতে জাফরের যুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসলেও কতৃপক্ষ তা ধামাচাপা দিয়ে রাখছেন। তিনি বলেন, জাফর নাসিরের সোনালী ব্যাংসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকে নামে-বেনামে টাকা রয়েছে। যা দুদক অনুসন্ধান করলেই পাবে।

তবে বরিশাল মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক গাজী নঈমুল হাসান লিটু বলেন, আমি জাফর ও নাসিরের বিষয়ে অনেক আগেই শুনেছি। খোজ নিয়ে জেনেছি তারা শ্রমিকলীগের রাজনীতি করে। কিন্তু তারা তৃতীয় শ্রেনীর কর্মচারী হয়ে এতো টাকার মালিক কিভাবে হলো তা আশ্চর্যের বিষয়। এ বিষয়টি শিক্ষাবোর্ড ও প্রশাসন ভালোভাবে তদন্ত করে দেখলেই প্রকৃত বিষয় উদঘাটন হবে।

শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী সংঘ সভাপতি আবু জাফরের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমি বেতনের টাকা জমিয়ে এগুলো করেছি। এখানে দুর্নিতীর কিছু নেই। আর সাধারন সম্পাদক নাসির বলেন, কোন দুর্নিতী করিনি। বেতনের টাকা ও লোন করে সবকিছু করেছি।
বরিশাল শিক্ষাবোর্ড সচিব অধ্যাপক বিপ্লব কুমার ভট্রাচার্য বলেন, তাদের সম্পদের বিষয়ে আমার জানা নেই। আপনাদের জানা থাকলে তা উদঘাটন করে প্রকাশ করুন। এরপর আমরা বিষয়টি দেখে ব্যাবকস্থা নেব।


  • 27
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]