কাগজে-কলমে প্রস্তুত আইসোলেশন ওয়ার্ড, বাস্তবতায় উল্টো চিত্র


সৈয়দ মেহেদী হাসান ॥ ক্রমশই ভয়ংকর রুপ ধারণ করছে কোভিড-১৯ ভাইরাস। দেশব্যাপী ভাইরাসটির প্রার্দুভাবে একে একে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সড়ক ও নৌ-পথ। বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের সবগুলো জেলা অন্য জেলা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর সাথে এবং অভ্যান্তরীন রুটের সব ধরণের নৌ চলাচল স্থগিত করেছে বিআইডব্লিউটিএ। ওদিকে সমীতি আকারে গণপরিবহন চলাচলের ঘোষণা থাকলেও নথুল্লাবাদ ও রুপাতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে ছেড়ে যায়নি কোন বাস।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, বিভাগে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে দুই হাজারের বেশি। যদিও প্রায় ১০ হাজার প্রবাসী এই বিভাগে রয়েছেন’ তবে তাদের সকলকে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। বিভাগে রয়েছে চিকিৎসক সংকট ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তার ঘাটতি। আবার কাগজে-কলমে আইসোলেশন ওয়ার্ডের বিপুল সংখ্যা দেখালেও বাস্তবে চিত্র ঠিক তার উল্টো। এ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন এই বিভাগের পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ। এত বৃহৎ জনগোষ্ঠির জন্য করোনা ভাইরাস সনাক্তে কোন ল্যাব স্থাপন না করায় ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের মাঝে। যদিও মন্ত্রণালয়ে ল্যাব স্থাপনের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে মর্মে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান। তবে তার অনুমতি এখনো দেয়নি মন্ত্রণালয়। ফলে করোনার মহামারি রোধে প্রাথমিক পর্যয়ের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও এখনো গড়ে ওঠেনি এই অঞ্চলে।

জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা-বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে গতকাল পর্যন্ত বিভাগে ২ হাজার ২৩৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ২৩৮ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে আনা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় নিয়মিত ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, বিভাগের ছয় জেলার হিসেব অনুযায়ী, বরিশাল জেলায় নতুন ৮১ জনসহ ৪৭৮ জন, পটুয়াখালীতে নতুন ২০ জনসহ ৬০৭ জন, ভোলায় নতুন ৫০ জনসহ ৩২২ জন, পিরোজপুরে নতুন ৩৯ জনসহ ৩৪২ জন, বরগুনায় নতুন ৩৬ জনসহ ৩০০ জন ও ঝালকাঠিতে নতুন ১০ জনসহ ১৭১ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। এছাড়া বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) এলাকায় নতুন দু’জনসহ ১৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে ডাঃ বাসুদেক কুমার দাস জানান, চিকিৎসকদের নিরাপত্তায় সংকট রয়েছে। তবে ইতিমধ্যে নিরাপত্তা সরঞ্জাম আসতে শুরু করেছে। যেহেতু এখনো স্প্রেডিং টাইমে রয়েছে। ভাইরাসটির ব্লাস্টিং টাইমের মধ্যে চাহিদামত নিরাপত্তা সরঞ্জাম এসে পৌঁছবে।

স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, বিভাগে ৯১৯টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যদিও আক্রান্তদের মূল চিকিৎসা বরিশাল শহরের দুটি হাসপাতালে হবে। সেই হাসপাতাল দুটি হলো শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিট ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সাউথ এ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা চিকিৎসাং ২৫০ বেড ও সাউথ এ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫০ আউসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। এর বাইরে বিভাগের ৪২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৬টি জেলার সদর ৫১৯টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এতো গেল কাগজে-কলমের হিসেব। বাস্তবতায় এখনো পুরেপুরি প্রস্তুত করা হয়নি এই বেডগুলো বলে সরেজমিনে ও সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে।

সরেজমিনে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ টি, সাউথ এ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮টি এবং বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে ৫টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও বরিশাল জেলার সবগুলো উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে মর্মে খোঁজ নিলে, উজিরপুর, বাকেরগঞ্জ, মেহেন্দীগঞ্জ, বাবুগঞ্জে তা পাওয়া যায়নি। যদিও ওইসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তারা দাবী করেছেন, আলাদা স্থানে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। রোগী সনাক্ত করা হলে বেড প্রস্তুত করা হবে।
ওদিকে ঝালকাঠি জেনারেল হাসপাতালের অদূরে একটি পরিত্যাক্ত ভবনে দুটি কক্ষে ১৫ টি বেডের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন শ্যামল কৃষ্ণ হালদার। ওই জেলায় প্রতি উপজেলায় আইসোলেশন ইউনিট স্থাপনের কথা থাকলেও তার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

বরগুনার সিভিল সার্জন ডাঃ হুমায়ূন শাহিন খান জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত জেলায় ৮টি বেড নিয়ে একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আরেকটি ভবনে ৪২টি বেড স্থাপন করা যাবে এমন উপযোগীতার কক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কর্মকর্তা বলেন, সভার মাধ্যমে সমন্বয় করে আমরা চেষ্টা করছি সার্বিক প্রস্তুতির। তবে বরগুনা জেলায় নিযুক্ত চিকিৎসকরা সবাই নতুন বিসিএসে সংযুক্ত। যে কারনে তাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত উচ্চতর অভিজ্ঞতা না থাকায় আমরা এবং চিকিৎসকরা ভয়ে আছি। পাশাপাশি নার্স ও ডাক্তারদের নিরাপত্তায় চাহিদা মাফিক সরঞ্জামাদি না থাকায় এই ভয় আরও বেশি।

পিরোজপুর জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ হাসনাত ইউসুফ জাকী মনে করেন, ভাইরাসটি মহামারি আকার ধারন করলে পিরোজপুর সিভিল সার্জনের যে লোকবল এবং চিকিৎসক রয়েছে তা দিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি নিরপত্তা সরঞ্জামেরও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এই জেলায় ২৭টি বেড প্রস্তুত রাখার কথা থাকলেও বাস্তবিক স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সেখানে বেড স্থাপন করে চিকিৎসা প্রদানের মত উপযোগ্যতা এখনো হয়নি।

পটুয়াখালী জেলার সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ জাহাংগীর আলম জানিয়েছেন, বিভাগের অন্যসব জেলার মত তিনিও ১০০ টি পিপি (পার্সোনাল প্রটেকটিভ) পেয়েছি। যার মধ্যে ৬০টি উপজেলায় প্রেরণ করা হয়েছে। বাকি ৪০টি জেলা সদরের জন্য রাখা হয়েছে। এই কর্মকর্তা বলেন, সবগুলো উপজেলায় পাঁচটি করে আইসোলেশন বেড স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া আছে। বেড এখনো স্থাপন করা হয়নি। রোগী সনাক্ত হলে স্থাপন করা হবে মর্মে জানান ডাঃ মোঃ জাহাংগীর আলম। একই চিত্র ভোলা জেলায়। উপজেলায় কমপ্লেক্সগুলোতে পাঁচটি করে বেড স্থাপনের কথা থাকলেও তা স্থাপন করা হয়নি। সিভিল সার্জন ডাঃ রথিন্দ্র নাথ মুজমদারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে নির্ভনযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সভা-সেমিনার করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার নূন্যতম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি এই জেলায়।

ওদিকে গতকাল পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের কোথাও সশস্ত্র বাহিনী নামেনি। তবে বিভাগয়ি কমিশনার মোঃ ইয়ামিন চৌধুরীর সাথে শেখ হাসিনা সেনা নিবাসের কর্মকর্তারা বেলা ১১টার দিকে বৈঠক করেছেন। বরিশাল জেলার জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান জানিয়েছেন, সমন্বয় সাধনের জন্য বিভাগীয় কমিশনার স্যারের সাথে বৈঠক করেছে সশস্ত্র বাহিনী। বুধবার বরিশালসহ সব জেলায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে মাঠে নামবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এদিকে বরিশাল থেকে সকল রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌ-বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু সরকার। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে যেন না পরে সেই কারনে নৌরুটগুলো বন্ধ করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থায় থাকবে বলেও জানান তিনি।

নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস মালিক গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কিশোর দাস জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই অভ্যান্তরীনসহ দেশের সকল রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বাস চলাচল বন্ধ করা হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাস মালিক জোটের। এর আওতায় বরিশাল বিভাগের সব জেলা, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাস মালিক জোটের সভাপতি কাওছার হোসেন শিপন। তিনি বলেন, করোনা প্রতিরোধে আমরা নির্দেশনা পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক বাস চলাচল বন্ধ করি। সেইসাতে দাবী জানাচ্ছি বিআরটিসি বাস ও থ্রি-হুইলার পরিবহনগুলোও বন্দ করা হোক। অন্যথায় ভাইরাস ছড়ানো প্রতিরোধ করা কষ্টসাধ্য হবে।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]