কোথাও কেউ নেই আয়েশার জীবনে


বরিশাল : ‘নদীর দ্যাশে জন্ম; পান্তে (পানিতে) ভাইস্যাই জীবন শ্যাষ। নদীর পাড় ভাঙণের লগে লগে জীবন ভাইঙা গ্যাছে। ভাতার (স্বামী) নাই, পোলা নাই; আছে এউক্কা (একজন) মাইয়া। আমার জীবনই নাই; হের আবার দুঃখ কি?’ কথাগুলো বলছিলেন বরিশালের হিজলা উপজেলার বাসিন্দা আয়েশা খানম।

কিন্তু হিজলায় শেষ কবে গিয়েছেন তা মনে নেই। কার কাছে ফিরবেন? কোন ভিটায় একরাত্তির নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন? তেমন ঠাঁই নেই। তার বাড়ি ছিল হিজলার দুঃখ মেঘনা নদীর শাখা ধর্মগঞ্জের তীরে। ধর্মগঞ্জের ধর্ম পাড় ভাঙার খেলায় বিলীন হয়ে যায় পাঁচ পুরুষের বসতঘর। আয়েশা খানমের প্রথম সন্তান ভ‚মিষ্ঠ হওয়ার ঠিক সাতদিনের মাথায় ঘটে এই ঘটনা। অতঃপর উন্মুল।

অন্যের নৌকায় ভাসতে ভাসতে এসে নতুন জীবনের গোড়াপত্তন করেন বরিশাল নগরীতে। আর এখন নগরীর কোলঘেষে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদীর ওপারে চরকাউয়া ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডে ঝুপড়ি ঘরে থাকেন। বয়সে ষাট পার করা জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, শীর্ণকায় শরীর আয়েশা খানমকে এখন আর কোন কিছুতেই দুঃখিত করে না।

তার কাছে নারী-পুরুষ বলতে কিছুই নেই। যাদের টাকা পয়সা আছে তারাই ভাগ করে।

‘ট্যাকে টাহা না থাকলে কাম হইর‌্যা পাইনা দিশা, আবার ব্যাডা-মাতারি’ বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। বয়সের সাথে সাথে চেহারায় অসংখ্য ভাজ পড়েছে, যেন বরিশাল বিভাগে জালের মত ছড়ানো নদীর শাখা-প্রশাখা। শুধু তিনি যে পরিবারসহ সব হারিয়েছেন তা কিন্তু নয়, হিজলা মেহেন্দীগঞ্জ ও মুলাদী উপজেলায় নদী ভাঙণে সর্বহারা হওয়ার উদাহরণ মামুলি ব্যাপার। নদীর গ্রাসে ভিটে-জমি হারিয়ে গেলে অনেকেই পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু আয়েশা এসেছেন বরিশালে। স্বামী ইছাহাক বেপারীকে নিয়ে ইট ভেঙে সংসার চালাতে শুরু করেন।

তখনো জানতেন না, জীবনে আরো ভাঙন অপেক্ষা করছে। প্রায় ত্রিশ বছর আগে ভাটারখাল বস্তিতে ছিলেন। ততদিনে তিন সন্তানের জননী। এক ছেলে তিন মেয়ে। কিন্তু একদিন জানতে পারলেন স্বামী সাগরদী এলাকায় আরেক দিনমজুর নারীকে নিকাহ করে নতুন ঘর বেধেছে। অনেক চেষ্টা করেও স্বামীর দ্বিতীয় সংসার থেকে ফেরাতে না পেরে ভাঙন মেনে নেন।

আয়েশা খানম জানান, ইছাহাক বেপারী তাদের ভরণ-পোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন। তারও বছর তিন পরে জানতে পারেন মারা গেছেন স্বামী। মৃত্যুর আগে আয়েশা খানমকে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ দেখা দিতে যাননি আয়েশা।

তিনি বলেন, যেই স্বামী আমারে হালাইয়া থুইয়া যাইতে পারে হেই মরা স্বামীরে দ্যাখতে যামু ক্যা? আমার কি ঘিন নাই? যাউক তুই সবই খা। আমারে খাওয়াইবে আল্লায়।

স্বামীর ওপরে অভিমান করে আর কোনদিন তার কবরও দেখতে যাননি এই নারী। এমনকি ফেরননি পিতার বাড়িতেও। চার সন্তান নিয়ে ইট ভেঙে সংসার চালাতেন। তখন পাঁচটাকায় দিনমজুরি দিতেন। আর তাতেই চলতো অভাবের সংসার। মেয়ে দুটিকে বড় করে বিয়েও দেন। কিন্তু মেয়ের শ্বশুর বাড়ির লোকজনের চাহিদামত টাকা দিতে না পারায় বড় মেয়েকে খুব জ্বালাতন করতো। শেষে বিষ খেয়ে মারা গেছেন সেই মেয়ে। তার পরের মেয়েটিও স্বামীর ঘরে বসে মারা গেছেন। তার ধারণা, শ্বশুর বাড়ির মানুষ মেয়েকে মেরে ফেলেছে। কিন্তু তার বিচার চাইতে পারেনি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে লাশ হয়ে ফেরেন ছেলে।

আয়েশা বলেন, কুঁড়ি রমজানে এশার নামাজের পর ঘরে ফিরে হঠাৎ বুকে ব্যাথা উঠেছে বলতে বলতে মারা যান। এখন মনোয়ারা নামে এক মেয়ে আছে। তারও জীবনে সংসার হয়নি। মায়ের সাথেই থাকেন। শ্বাস-কাশের রোগ আছে। হয়তো তার মৃত্যু আয়েশার আগে হতে পারে।
এক জীবনের আয়ু ফুরাতে গিয়ে একে একে শেষ হয়ে গেছে চারপাশের সকল স্বজন। অসহায় এই নারীর দিন কাটছে অন্যের সাহায্য সহায়তায়। স্থানীয় ইউপি মেম্বার একটি ঝুপড়ি ঘর তুলে দিয়েছেন। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে ৮ হাত। তাতে শোয়ার জন্য একটি চৌকি আর কয়েকটি বাসন-কোসন আছে। একটি সোলার প্যানেল রয়েছে। তাতে ঘরে একটি লাইট জ্বালাতে পাড়ে। দিনে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে কারো কাজের সাহায্য করে দেন, কখনো সাহায্য পেতে হাত পাতেন। দুশ্চিন্তায় আছেন অন্যের জমিতে ঝুপড়ি ঘরটিও অল্পদিনে ভেঙে ফেলবে একটি জুতা প্রস্তুতকারী কারখান লোক। স্থানীয়রা জানান, বরিশালের একটি জুতা প্রস্তুতকারী কোম্পানী জমিটি কিনে নিয়েছে। শিগগিরই কারখানার অবকাঠামোর কাজ ধরবে জমিতে। তারা এসে উচ্ছেদের কথা জানিয়ে গেছে।

আয়েশা বলেন, এই ঘর ভেঙে ফেললে অন্যের বাড়ির বাগানে গিয়ে থাকতে হবে। নয়তো পথের পাশে থেকে বাকি জীবন পাড় করতে হবে। সরকারি সহায়তা বলতে কিছুই পাচ্ছেন না। কেন পাচ্ছেন না? তারও সহজ জবাব আয়েশার, কিছু পাইতে হইলে কইয়া (তদ্বির) =েদওয়ার করার মানুষ লাগে। মোরতো কেউ নাই কোথাও।

অসহায় এই নারীর বিষয়ে কথা চরকাউয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুনিরুল ইসলাম ছবির সাথে। তিনি জানান, তাকে ঘরটি আমি তুলে দেইনি। সম্ভবত ইউপি সদস্য দিয়েছেন। এছাড়া কোন সাহায্যও দেওয়া যায়নি। কারন এক ইউনিয়নের লোককে অন্য ইউনিয়নের কেউ সহায়তা করতে পারেন না। সাহায্য পেতে হলে ভোটার আইডি কার্ড দরকার। ওই নারীর তা সম্ভবত নেই। আর তিনি আমার ইউনিয়নের লোকও নন। সে কারনে তিনি সরকারি সাহায্য পাচ্ছেন না।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]