ক্যাসিনো: বার্তা কি পরিষ্কার?


আমীন আল রশীদ : কিছুদিন আগে ‘হ্যাশট্যাগ (#)মি-টু’র কারণে অনেক প্রভাবশালী, চেনাজানা মুখ; এমনকি সমাজে ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিতদের মনেও যে-রকম একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল, না জানি এরপর যৌন হয়রানির অভিযোগে কার নামটি সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে আসে! সে-রকম আতঙ্ক এখন ক্যাসিনো বা জুয়ার কারণে। কয়েকদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে অভিযান চালাচ্ছে, তাতে এ পর্যন্ত ধরা পড়া লোকগুলোর সবাই প্রভাবশালী এবং আরও সিগনিফিকেন্ট বিষয় হলো, তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।


যদিও শেষমেষ এই অভিযানটি কোথায় গিয়ে থামবে এবং আখেরে কতজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে ধরা পড়বেন এবং তাদের পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে আন্দাজ করা কঠিন। এছাড়া অভিযানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়েও এরইমধ্যে জনমনে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কেননা অভিযানটা ক্যাসিনো থেকে ছোটখাটো বারে (মদের দোকান) গিয়ে ঠেকেছে। কার্যত ঢাকা শহরের সব বারই এখন বন্ধ। প্রশ্ন হলো—সরকারের অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত এসব বার বন্ধ করা কি এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল? এছাড়া র‌্যাব এই অভিযানটি শুরু করলেও দিন-দুয়েক পরে পুলিশের কাছেও ব্যাপারটা বোধ করি ‘ইজ্জতের সওয়াল’ হয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গত কারণে তারাও অভিযান শুরু করে এবং তারা নরনারীদের সৌন্দর্যবর্ধনকেন্দ্র ‘স্পা’ ও বিউটি পার্লারে গিয়েও অভিযান চালায়। যে কারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে এই প্রশ্নও তোলেন, এরপরের অভিযানটা কোথায় হবে? আবার পুলিশের পক্ষ থেকে এমন দাবিও করা হয়, ঢাকা শহরে যে এভাবে ক্যাসিনো চলতো, সেটি তাদের জানা ছিল না। কিন্তু তাদের এই কথা সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেনি। এ রকম বাস্তবতায় ২৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছেন, ক্যাসিনোবিরোধী এই অভিযান কেবল র‌্যাবই চালাবে। তার মানে পুলিশ যে অভিযানটি শুরু করেছিল, তা নিয়ে সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, সেটি পরিষ্কার।

আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীর নিশ্চয়ই যে-কোনও সময় যে-কোনও জায়গায় অভিযান চালানোর অধিকার রয়েছে। এমনকি সরকারি খাতায় নিবন্ধিত মদের দোকানেও চাইলে তারা গিয়ে দেখতে পারে সেখানে শর্ত ভঙ্গ করে কাজ পরিচালিত হচ্ছে কিনা। হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তারা নিতেই পারে। এমনকি কোনও স্পা সেন্টার কিংবা বিউটি পার্লারেও তারা যেতে পারে যদি তাদের কাছে এমন অভিযোগ আসে যে, সেখানে আইনবহির্ভূত কাজ হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, অভিযানের নামে এসব তৎপরতা তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যখন একটা বড় উদ্দেশ্য সামনে রেখে অভিযানটা শুরু হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের মনে এরকম একটি ধারণা ও প্রতীতি জন্মাতে শুরু করেছিল যে, এবার খালেদ ভুঁইয়া এবং জিকে শামীমের ধারাবাহিকতায় বাকি দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাও আটক হবে। কিন্তু কী কারণে অভিযানের ক্যারেক্টারটি সহসা বদলে গেলো তা চট করে বলা মুশকিল। এছাড়া র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানের ধরনের এই ফারাক দেখে অনেকের মনে এই প্রশ্নও তৈরি হয়েছে যে, আসলে এই অভিযানগুলোর উদ্দেশ্য কী?

একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে খবর প্রকাশিত হলো, জুয়ার আসর থেকে সাংবাদিক আটক। যে সাংবাদিকের ছবিসহ সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে, তিনি খুবই পরিচিত মুখ। যদিও পরে পোর্টাল থেকে সংবাদটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, জুয়ার আসরে কি এই প্রথম কোনও সাংবাদিক গেলেন অথবা দেশে এর আগে কখনও জুয়া খেলা হয়নি? জুয়ার আসর থেকে যদি কাউকে আটক করতে হয় তাহলে শুধু তো এই একজন সাংবাদিক নন, প্রতিদিন সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ জুয়া খেলে, তাদের সবাইকে ধরতে হবে। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশে জুয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু এটিও বাস্তব্তা যে, নানা উপায়ে, জাহিরে-বাতেনে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ করে প্রতিনিয়তই জুয়া খেলা হয়। রাস্তার পাশেও শ্রমিকরা তাস দিয়ে অল্প পয়সায় জুয়া খেলেন। তাদের সবাইকে কি ধরা হবে? এই অভিযানের উদ্দেশ্য কি এটা? বোধ হয় না। তাহলে প্রশ্ন, এসব খুচরো-খাচরা কাজ করে বড় কিছু আড়াল করা হচ্ছে কিনা? প্রশ্নটা এ কারণে যে, জিকে শামীম ও খালেদ ভু্ঁইয়াকে গ্রেফতারের পর তারা অনেকের নাম বলেছেন, ধারণা করা যায়, তাদের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও আছেন। আছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা। শোনা যাচ্ছে, কিছু সাংবাদিকও তাদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন। তাদের আড়াল করার জন্যই এখন অভিযানটি উদ্দেশপ্রণোদিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে?

সন্দেহটা এ কারণে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ না করে খোদ রাজধানীর বুকে কোটি কোটি টাকার জুয়ার আসর চালানো অসম্ভব। তাতে তারা যে দলের, যে সংগঠনের এবং যে স্তরের নেতাই হোন না কেন। আবার এইসব কাজ চলবে অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানবে না, তাও অসম্ভব। সুতরাং যারা বছরের পর বছর এইসব ক্যাসিনো থেকে সুবিধা নিয়েছেন, তাদেরও বোধ করি ‘নুন খেয়ে গুণ গাওয়া’র একটা ব্যাপার আছে। সুতরাং অপরাধীদের আড়াল করা বা তাদের গা ঢাকা দেওয়া কিংবা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

সাধারণ জুয়ার সঙ্গে ক্যাসিনোর মূল পার্থক্য টাকার অঙ্কে। সাধারণ জুয়া যেমন তাস দিয়ে কিংবা হাউজি খেলায় হারজিতে টাকার পরিমাণ অনেক বেশি নয়। কিন্তু ক্যাসিনোতে পরিমাণটি অবিশ্বাস্য এবং এটা পয়সাওয়ালারাই খেলে। কারা খেলে? কারা এই ক্যাসিনোতে যেতেন সেটি বের করা কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য খুব কঠিন কিছু্? প্রতিটি ক্যাসিনোর প্রবেশপথেই সিসি ক্যামেরা থাকার কথা। সুতরাং কারা এখানে নিয়মিত জুয়া খেলতেন এবং তাদের সেই পয়সার উৎস কী, সেটি বের করা আরও বেশি জরুরি। যারা ক্যাসিনো চালান বা এখান থেকে চাঁদা নেন কেবল তাদের আটক বা গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়।

গরিব বা স্বল্প আয়ের মানুষ যারা রক্তঘাম করে হালাল পথে পয়সা কামান, তারা ক্যাসিনোতে যান না। বরং যারা অবৈধ পথে পয়সা কামান, যাদের টাকা খরচের জায়গা থাকে না, এসব ক্যাসিনো তাদের দুনিয়া। সুতরাং দেশের কতটি ক্যাসিনোতে কত শত লোক নিয়মিত যেতেন, সেটি দিয়ে অবৈধ পয়সার একটা নতুন গ্রাফ তৈরি করা সম্ভব। যদিও দুর্নীতিবাজ ও অবৈধ পয়সার সব মালিকই ক্যাসিনোতে যান না। কিন্তু এর মাধ্যমে একটা মোটামুটি অঙ্ক কষা সম্ভব।

সরকারের তরফে বলা হচ্ছে এটি শুদ্ধি অভিযান, যা শুরু হয়েছে নিজের দলের ভেতর থেকেই। বলা হচ্ছে গুটিকয়েক লোকের অপরাধের দায়ভার পুরো দল নেবে না। খুবই ভালো কথা। কিন্তু ক্যাসিনোর নামে এই টাকার খেলা কি বিচ্ছিন্ন কোনও বিষয়?

ক্যাসিনো হচ্ছে রাষ্ট্রের দানবীয় ‍দুর্বৃত্তায়নের বাইপ্রোডাক্ট। কবে বা কোন আমল থেকে এই দুর্বৃত্তায়ন শুরু হয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে তা বলা কঠিন। তবে এটা ঠিক যে, এই দুর্বৃত্তায়ন প্রতি বছরই বেড়েছে। মাঝেমধ্যে দুয়েক বছর হয়তো গতি থেমেছে বা মুলতুবি হয়েছে, কিন্তু পরক্ষণে নতুন করে শুরু হয়েছে। আর এই দুর্বৃত্তায়ন প্রক্রিয়ায় যে শুধু রাজনৈতিক নেতারাই এককভাবে দায়ী সে কথা বলারও সুযোগ নেই। বরং এই দুর্বৃত্তায়নের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে সব পেশার মানুষ। এই বৃত্তের বাইরে থাকা লোকেরাই বোধ করি এখন সংখ্যালঘু।

সুতরাং চলমান অভিযানের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় ক্যাসিনোর মতো বড় অপরাধের দুনিয়া ধ্বংস করা, সেটি অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু পরক্ষণে এটিও মনে রাখা দরকার, অবৈধ পথে পয়সা ইনকাম তথা ঘুষ ও দুর্নীতির সব পথ খোলা রেখে, কিছু লোককে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সুযোগ দিয়ে ক্যাসিনো, স্পা, মদের দোকান কিংবা বিউটি পার্লারে গিয়ে ঝটিকা আক্রমণ আখেরে কোনও ফল দেবে না। কিছু লোক আটক হবে, কিছু লোকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হবে, কিছু লোক জেল খাটবে, কিছু লোক পালিয়ে যাবে, কিছু লোক আপস করবে; কিন্তু জালের বাইরে চলে যাবে সব রাঘববোয়াল এবং সময়-সুযোগমতো তারা আবার ক্যাসিনোর মতো ব্যবসা শুরু করবে। এখন যারা অভিযান চালাচ্ছেন তাদেরই কেউ কেউ হয়তো সেখানে সহায়তাও করবেন। সুতরাং রাষ্ট্রে দানবীয় দুর্বৃত্তায়নের সব পথ উন্মুক্ত রেখে এ জাতীয় অভিযান গণমাধ্যমের জন্য কিছু সংবাদের খোরাক জোগাবে বটে, আখেরে ফল শূন্য। আমরা শূন্য ফলের কোনও অভিযান চাই না।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]