৭ জুলাই ১৯৭১

গঠিত হলো জেড ফোর্স


শাহাব উদ্দিন মাহমুদ : ১৯৭১ সালের ৭ জুলাই দিনটি ছিল বুধবার। এই দিন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল, তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল, অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল এই তিনটি নিয়মিত পদাতিক বাহিনীর সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রথম ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয়। মেজর জিয়াউর রহমানের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে এই ব্রিগেডের নামকরণ করা হয় ‘জেড ফোর্স’।

‘জেড ফোর্স’-এর ব্রিগেড কমান্ডের দায়িত্ব মেজর জিয়াউর রহমানকে ও ব্রিগেড মেজরের দায়িত্ব ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে প্রদান করা হয়। সিলেটে একদল মুক্তিযোদ্ধা পাকবাহিনীর বারইগ্রাম স্কুল ঘাঁটি আক্রমণ করে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড গোলা বিনিময় হয়। এই যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৩ জন সৈন্য নিহত হয়। সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা বাগান এলাকায় মুক্তিবাহিনীর ও পাকবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে পাকবাহিনীর ৩৯ জন সৈন্য নিহত হয়। নেত্রকোনার সদর থানার বাশাটি গ্রাম।


গোয়েন্দা সূত্রের খবরের প্রেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিকের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থান নেয়। ওপার থেকে নৌকাযোগে পাকহানাদাররা তাদের সহযোগীদের নিয়ে এগোচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আক্রমণ। মুক্তিযোদ্ধারা এদের পিছু ধাওয়া করে ৭ জনকে ধরে ফেলে এ ৭ জনের মধ্যে পাক হানাদারদের সহযোগী বাঙালী ছিল ক’জন। এদের মধ্যে তৎকালীন নেত্রকোনা সদর থানার দারোগা আব্দুর রশিদ, আনসার এ্যাডজোটেন্ট লাল মিয়া ও আব্দুল মালেক অন্যতম।

এদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী ডঃ হেনরি কিসিঞ্জার নয়াদিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং-এর সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হয়। সিনেটর ফ্রাঙ্ক চার্চ মার্কিন সিনেটে নিক্সন প্রশাসনের সমালোচনা করে অবিলম্বে পাকিস্তানে প্রেরিত অস্ত্রবাহী জাহাজ ফেরত আনার আহ্বান জানান। পশ্চিম পাকিস্তান পি.ডি.পি-র সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে যতো শিগগির সম্ভব আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার অনুষ্ঠানের দাবি জানান।

জাতীয় যুব কাউন্সিলের সভাপতি ও ঢাকা হাইকোর্টের এডভোকেট মাহবুবুর রহমান এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের অখন্ডতা বিনষ্টের জঘন্য চক্রান্তের বিরুদ্ধে দৃঢ় ও সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পাকিস্তান সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রয়োজনে ব্রিটেনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান। এদিন ১৩৫ জন এমএনএ ২৩৯ জন এমপিএ দের কনফারেন্সের সমাপনী দিবস (৭ জুলাই, ১৯৭১)। কনফারেন্সে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মন্ত্রীবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্যবগের্র সমাবেশে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাষণ দেন।

ভাষণে তিনি বলেন, …৬-দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র রচনার জন্য আপনারা জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন তা পালন করতে আপনাদের নেতা এবং তার সহকর্মীবৃন্দ কী কী প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তা আপনাদের জানা আছে। ১ মার্চের পর থেকে প্রতিটি ঘটনা যে কত দ্রুতগাতিতে অগ্রসর হয়েছিল যে আপনারা নিজেদের চোখে দেখেছেন। … আপনারা নিজ নিজ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন- অসহযোগ আন্দোলনের বাণী নিয়ে বাংলাদেশের হাটে, মাঠে, ঘাটে, বাংলাদেশের সরকারী আদালতে। বাংলার দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতার সাহায্যে আপনারা যে অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন সৃষ্টি করেছিলেন, ইতিহাসে তার নজির নেই।

… সেই ২৫ মার্চের রাতের আধারে এই বীভৎস ঘটনার প্রতিবাদে আপনারা রুখে দাঁড়ালেন। বাংলার নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা মফঃস্বল শহরে, জেলা শহরে, গ্রামে, বন্দরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়ার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করব আমাদের ও বেঙ্গল রেজিমেণ্টের বীরত্ব আজকের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আমি জানি চট্টগ্রামে, ময়মনসিংহে, যশোরে, রংপুরে, খুলনায়, বরিশালে, ঢাকায়, ফরিদপুরে বাংলার সর্বত্র আপনাদের নেতৃত্বেই সংগ্রাম হয়েছে। নিজেদের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে আপনারা গ্রাম-বন্দরে ঘুরে বেরিয়েছেন। বাংলার সৈনিকদের পাশে পাশে আপনারা রয়েছেন। বাংলার সৈনিকরা যখন বুকের তাজা রক্ত মাতৃভূমির জন্য ঢেলে দিচ্ছেন এর পরে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা না করে আর কি পথ ছিল? স্বাধীনতার জন্য লড়াই না করে আর কি উপায় ছিল? মূলত এবং বাহ্যত বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার মুহূর্তে স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী রেখে যান। আমরা জানতাম বঙ্গবন্ধু যদি গ্রেফতার হন, তবে স্বাধীনতা ঘোষণা তিনিই করে যাবেন। আর এই স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্যই আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হবে। প্রিয় বন্ধুরা আমরা, ২৫ মার্চের রাতের পরে আমরা বিছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। তাই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা করতে আমাদের একটু বিলম্ব হয়েছিল। আমরা যে পাঁচজন শেখ সাহেবের পাশে ছিলাম এবং যাদের কাছে কথিত, লিখিত, অলিখিত সর্বপ্রকারের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু দিয়ে গিয়েছিলেন- ১৩ এপ্রিল তারিখে বাংলার পূর্ব অঞ্চলে সর্বপ্রথমে একত্রিত হলাম। পরিষদের সদস্যবৃন্দ যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের সামনে সেদিন আমি আমার সহকর্মীবৃন্দের তরফ থেকে স্বাধীনতা কার্যকরী করার জন্য পরিকল্পনা পেশ করেছিলাম।

… এই ধরনের অত্যাচার পৃথিবীর ইতিহাসে কোন সৈন্যবাহিনী কোন দিন করেনি। নারীর ইজ্জত লুণ্ঠিত হচ্ছে আজ আবার বাংলাদেশে, হত্যা করা হয়েছে দশ লাখ নারী, পুরুষ আর শিশুকে। মসজিদ, মন্দির আর গির্জা ধ্বংস হয়েছে। বাংলার ফসল আজকে মাঠে মাঠে লুটিয়ে পড়েছে। আমাদের তরুণদের আজকে হত্যা করা হচ্ছে, গুলি করে মারা হচ্ছে। বিশ্ববাসীর কাছে সারা পৃথিবীর পত্র-পত্রিকা আর কূটনৈতিক কার্যকলাপের দ্বারা আমরা এই কথা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে বাংলাদেশে আজ গণহত্যা চলছে। আজকে আপনাদের মন্ত্রিসভা নিরলস চেষ্টা দ্বারা সারা পৃথিবীর কাছে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে ইয়াহিয়া ভুল আর ভ্রান্ত, আর আমরা সঠিক পথে চলেছি। আজকে সারা পৃথিবীর পত্র-পত্রিকা তা গ্রহণ করেছে।

… আমাদের বন্ধু ও প্রতিবেশী ভারতবর্ষ আমাদের লাখ লাখ শরণার্থীকে শুধু আশ্রয়ই দেয়নি আমাদের দাবির ন্যায্যতাকে স্বীকার করে নিয়ে সাহায্য করার জন্য স্বেচ্ছায় আজকে এগিয়ে এসেছে। সেই জন্য ভারত সরকারের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। বন্ধুরা আমার, মুক্তিসংগ্রামে, স্বাধীনতা সংগ্রামে একদিকে যেমন সৈন্যবাহিনীকে প্রস্তুত করতে হয় চরম আঘাত হানার জন্য, তেমনি আর একদিকে কূটনৈতিক আক্রমণের দ্বারা শত্রুকে পর্যুদস্ত করতে হয়। তৃতীয়ত: দেশের অভ্যন্তরে মানুষের মনোবলকে শক্ত রাখতে হয়। আর শত্রুর মনোবল ভাঙতে হয়। বিদেশে কূটনৈতিক প্রচার চালিয়েছেন আপনার সরকার। মুক্তিফৌজকে সুগঠিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। হাজার হাজার ছেলে আজ মুক্তিফৌজে যোগ দেওয়ার জন্য, মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসছে। সবাইকে সমানভাবে সৈনিকের শিক্ষাদানের বন্দোবস্ত করা সম্ভব হয়নি। তার একমাত্র কারণ আমাদের সীমিত সামর্থ্য। সারা পৃথিবীর মানুষ যেন দেখতে পায় আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর সহকর্মীরা, বঙ্গবন্ধুর শিষ্যরা, বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়করা এক প্রাণ এক মন হয়ে বাংলার স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

… আপনারা যারা প্রতিনিধি আপনাদের কাছে আমার আকুল আবেদন গেরিলা যোদ্ধারা যে রণনীতি আর কৌশলে যুদ্ধ করে চলছে, সেই রণনীতি আর কৌশলে আপনারাই তাঁদের সর্বাধিক সাহায্য করতে পারেন- জনগণের মনোবল অটুট রেখে আর সমর্থন বজায় রেখে। বন্দুক নিয়ে যারা লড়াই করছে তারাও যেমন মুক্তিযোদ্ধা, আপনারাও তেমন মুক্তিযোদ্ধা। এই জনযুদ্ধ, ভাড়াটিয়া সৈন্যদের যুদ্ধ নয়। তাই বন্ধুরা, আমাদের নীতি আদর্শে আপনারা অটল থাকবেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হচ্ছে আমাদের আদর্শ। বিশ বছরের ক্রমাগত সংগ্রামের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে এই আদর্শকে আমরা আজকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরছি। অসাম্প্রদায়িকতা বা ‘সেকুলারিজমের’ মহান আদর্শ বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে আমরা আজকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরছি। এই একটা বিষয়ে আপনাদের স্পষ্ট থাকতে হবে। কোন প্রকার সাম্প্রদায়িকতার মালিন্যে যেন আওয়ামী লীগের সদস্যবৃন্দের নাম কলঙ্কিত না হয় সে বিষয় আপনাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।

… আপনাদের মাধ্যমে আর একবার আমি মহান রুশ জাতির কাছে আবেদন জানাই, তারা এই স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াক। চিরকাল বাংলার মুক্তিকামী মানুষ সোভিয়েত রাশিয়ার মানুষকে স্মরণ করবে। আমাদের প্রতিবেশী চীনের বর্তমান নায়করা ইয়াহিয়ার সঙ্গে মিতালী গড়ে তুলছেন। জানিনা পিছনে রাষ্ট্রগত স্বার্থ ছাড়া কি থাকতে পারে। আমরা তো চীনকে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখিনি। চীনের সাধারণ নাগরিকরা যাই বলুন না কেন মহান জাতি চীনের প্রতি কোন অবিশ্বাস আমরা পোষণ করি না। চীনের সাধারণ মানুষকে আমরা আমাদের ভালবাসাই দেই। আর আবেদন জানাই, আপনারা আপনাদের নায়কদের বাধ্য করুন- যেখানে কৃষক-শ্রমিক মরছে, যেখানে একটা জাতি নির্যাতনে নিষ্পেষিত হচ্ছে সেখানে একটা অত্যাচারী সাম্রাজ্যবাদী সরকারকে তারা সমর্থন যেন না জানায়।

… সর্বশেষে আপনাদের বলি সংকল্পে অটুট থাকতে হবে! দুর্বলতা কোনভাবে যেন আমাদের মনে স্থান না পায়। পরিপূর্ণ স্বাধীনতাই আমাদের লক্ষ্য। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার বিকল্প কোন প্রস্তাব, আপনাদের কাছে, বাংলার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তৎসত্ত্বেও ইয়াহিয়া খান সাহেবের কাছে বলেছিলাম, আহ্বান জানিয়েছিলাম যুদ্ধ বন্ধ করুন। আমরা দশ লাখ মরেছি, তোমার ২৫ হাজার সৈনিককে তো ইতোমধ্যে মুক্তি বাহিনীর লোকেরা খতম করেছে। ২৫ থেকে ৩০ হাজার সৈন্য আহত হয়েছে। শুধু বাংলার ঘরে ঘরে মা-বোনেরা ক্রন্দন রোল নয়, পাঞ্জাবের ঘরেও তো ক্রন্দনের রোল। সেখানেও বিধবার মর্মভেদী হাহাকার তোমার কানে কি পৌঁছে না? তাই যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধান কর। (১) বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার কর। (২) বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দাও। (৩) সব সেনাবাহিনী প্রত্যাহার কর। (৪) যে ক্ষতি করেছ তার ক্ষতিপূরণ দাও। এই চারটি শর্ত আমি দিয়েছিলাম শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্য। ইয়াহিয়া খান প্রত্যুত্তর দিয়েছেন আটাশে জুন তারিখ। আটাশের পর থেকে শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়েছে। এখন বাংলার ভবিষ্যত নির্ধারিত হবে বাংলার মাঠে, প্রান্তরে, পদ্মা, মেঘনা, যমুনার কূলে যুদ্ধের মাধ্যমে। … আপনাদের সবাইকে জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।-জয় বাংলা

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]