ঘুরে আসুন ব্রিটিশদের অভিশপ্ত নির্দশন মেহেরপুরের আমঝুপি নীলকুঠি


১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার মেহেরপুর সদর থানার বর্তমানে মুজিবনগর উপজেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামের ঐতিহাসিক আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ওই শপথ অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বরেণ্য সাংবাদিকরা উপস্থিত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী প্রচার করেন। এ ঐতিহাসিক ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নতুন প্রাণ সঞ্চার করে এবং বাংলাদেশ সরকারের আইনানুগ বৈধতা প্রদান করে।

ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণের স্থানে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। উক্ত স্মৃতিসৌধ ও ঐতিহাসিক আম্রকানন যেকোনো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

কিভাবে যাবেন:
মেহেরপুর জেলা সদর থেকে সড়ক পথে আম্রকাননের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। বাস, স্থানীয় যান টেম্পু/নছিমন/করিমন এর সাহায্যে ৩০ মিনিট সময়ে ঐতিহাসিক আম্রকাননে পৌঁছানো যায়। মেহেরপুর সদর হতে বাস ভাড়া ২৫-৩০ টাকা।

আবাসন ব্যবস্থা :
মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে বাংলাদেশ পর্যটন করপোর্রেশনের হোটেলে আবাসনের সুব্যবস্থা আছে। এছাড়া জেলা পরিষদের স্থাপিত ডাকবাংলোয় ৩টি ভিআইপি কক্ষে আবাসনের ব্যবস্থা আছে। মেহেরপুর জেলা সদরে সার্কিট হাউজ, পৌর হল এবং ফিনটাওয়ারসহ অন্যান্য আবাসিক হোটেলে আবাসনের সুব্যবস্থা রয়েছে।

মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স সংক্ষিপ্ত বিবরণ :
বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার এর শপথ গ্রহণের স্থান হিসেবে মুজিবনগর ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। শপথ গ্রহণের স্মৃতিকে অম্লান করে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে শপথ গ্রহণ স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলার লক্ষ্যে স্থানটিতে একটি মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরকে দেখানো হয়েছে। এই কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীর স্মারক ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছে। সার্বিকভাবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স, ঐতিহাসিক আম্রকানন, ঐতিহাসিক ছয় দফার রূপক উপস্থাপনকারী ছয় ধাপের গোলাপ বাগান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত প্রদর্শনী হিসাবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভেতরের অংশে মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। স্মৃতি কমপ্লেক্সের বাইরের অংশে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্নসমর্পণের দৃশ্যসহ ঐতিহাসিক ঘটনার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত উক্ত ভাস্কর্যগুলো যেকোনো পর্যটককে আকর্ষণ করবে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন সেক্টরের অবস্থান বাংলাদেশের মানচিত্রে প্রদর্শন করে মানচিত্রটি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরস্থ মূল আঙ্গিনায় স্থাপন করা হয়েছে। সুদৃশ্য এ মানচিত্রটি মুক্তযুদ্ধকালীন বিভিন্ন সেক্টরের অবস্থান ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী সম্পর্কিত এক প্রমাণ্যচিত্র।

ভাটপাড়ার নীলকুঠি, গাংনী

সংক্ষিপ্ত বিবরণ : ১৮৫৯ সালে স্থাপিত ধ্বংস প্রায় এই নীলকুঠিটি ইট, চুন-শুরকি দ্বারা নির্মাণ করা হয়। এর ছাদ লোহার বীম ও ইটের টালি দিয়ে তৈরী। এই কুঠির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাজলা নদী। বর্তমান সরকার একটি ডিসি ইকো পার্ক করেছে। যা পিকনিক স্পর্ট, আনন্দ বিনোদনের জায়গা হিসাবে গড়ে উঠেছে।

আবাসন ব্যবস্থা : গাংনী পলাশীপাড়া সমাজকল্যাণ সমিতির রেস্ট হাউজে আবাসন সুবিধা আছে। মেহেরপুর জেলা সদরে সার্কিট হাউজ, পৌর হল, ফিনটাওয়ার আবাসিক হোটেল, মিতা আবাসিক হোটেল, কামাল আবাসিক হোটেলে আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে।

ব্রিটিশ আমলের আমঝুপি নীলকুঠি বর্তমানে পর্যটন কেন্দ্র:
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মেহেরপুর জেলার পর্যটক কেন্দ্র হিসাবে ঐতিহাসিক আমঝুপি নীলকুঠি ও আম্রকাননের সৌন্দর্য না দেখলে মিস করবেন। জেলা শহর থেকে ৪ মাইল পূর্বে অবস্থিত আমঝুপি নীলকুঠি ৭৭ একর ২৮ শতক জমির উপর প্রতিষ্ঠিত।

জানা যায়, এই কুঠিবাড়ি ব্রিটিশ বেনিয়াদের অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নীল ব্যবসায়ীদের দোর্দন্ড প্রতাপে একদিন মেহেরপুরসহ পশ্চিমবঙ্গের অগনিত কৃষক ছিল দিশেহারা। আজ ব্রিটিশ সম্রাজ্য নেই। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নেই। জমিদার বাড়ির কাছারিও নেই। কিন্তু শোষণ বঞ্চনা, নির্যাতন, অত্যাচার আর ষড়যন্ত্রের স্মৃতি নিয়ে নিরব স্বাক্ষী হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরপুরের আমঝুপি নীলকুঠি বাড়ি। আমঝুপি কুঠিবাড়ির চৌহদ্দির ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় মূল ভবন। দক্ষিণমুখী মূল ভবনের সামনে রয়েছে বিশাল বারান্দা। বারান্দার সামনে সদর দরজার দুই পাশে ফুল বাগান।

এই বাগানে এখন ব্রিটিশ আমলের ফুলের সমরোহ আছে। সুদূর অতীতের স্মৃতি নিয়ে দু’টি নীলগাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এই দু’টি গাছ পরবর্তীকালে লাগানো বলেই মনে হয়। পাতাবাহারের গাছ দিয়ে দু’পাশ সাজানো রয়েছে, শান বাঁধানো ঘাট পর্যন্ত টেনে নেয়া হয়েছে। মূল ভবনের অভ্যন্তরে রয়েছে মোট ১৫টি কক্ষ। এর মধ্যে ৩টি বড় বেডরুম। কাঠের পাটাতন করা হলরুমে ডানদিকে ফায়ারপ্রেস। পেছনে ডাইনিং রুম। হল রুমটির কনফারেন্স হল এবং নাচঘর হিসাবে ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়।

মূলভবনে রয়েছে মোট ৪টি সাজ ঘর এবং একটি সার্ভেন্ট কোয়ার্টার। অপেক্ষাকৃত সুশোভিত ঘরটি ব্যবহৃত হচ্ছে ভিআইপি রুম হিসাবে। এ রুমটিতে রয়েছে মসৃণ মেঝে। সংলগ্ন বাথরুমে সাদা টাইলস যা প্রায় ২৬৬ বছরের পুরাতন। কাঠের আসবাবপত্রগুলোও সে আমলের ঐতিহ্য বহন করছে। অধিকাংশ দামি আসবাবপত্র ইতিমধ্যে খোয়া গেছে।

হলরুমের ফ্লোরে যে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল এখন আর তা নেই। প্রতিস্থাপিত করে সেগুন কাঠ লাগানো হলেও তা মসৃন নয়। বাকি কক্ষগুলো ব্রিটিশ আমলের স্মৃতি বহন করছে। মূল ভবনের ডান দিকে রয়েছে কবুতর রাখার জন্য একটি সুন্দর বাসা।

জনশ্রুতি রয়েছে ব্রিটিশ বেনিয়ারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কবুতর ব্যবহার করতো। এই কুঠি থেকে অন্য কুঠিতে চিঠিপত্রের আদান প্রদানের জন্য পায়রার সাহায্য নেয়া হতো। আরো ডানদিকে বাড়ির শেষপ্রান্তে রয়েছে নীল গুদাম। এখানে নীল প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হত এবং সেখান থেকেই কলকাতা ও কালিকট বন্দরে পাঠানো হত। মূল ভবনের ডানদিকে এবং বাড়ির শেষ প্রান্তে আস্তাবল। সেখানে এখন আর ঘোড়া নেই। গড়ে উঠেছে জনবসতি।

কুঠিবাড়ি স্থাপত্য নকশা অনুযায়ী মূল ভবনের একটি সাজঘরের মেঝে থেকে পাশ্ববর্তী নদী পর্যন্ত একটি সুরঙ্গ সুড়ঙ্গ পথ ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। নীলচাষীদের উপর নির্যাতন, অত্যাচার চালানোর পর সুড়ঙ্গ পথেই তাদের গুম করে দেয়া হত।

জনশ্রুতি আছে এই নীলকুঠি বাড়িতে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লাকে উৎখাত করার জন্য রবার্ট ক্লাইভ ও মীর জাফর ষড়যন্ত্র করেছিল। আবার ২১৮ বছর পরেশ বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছিল এই আমঝুপি কুঠিবাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে বর্তমান মুজিবনগর।

১৯৭৮ সালের ১৩ মে তৎকালীন খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আমঝুপি সম্মেলনের মাধ্যমে আমঝুপি কুঠিবাড়িকে একটি পর্যটক কেন্দ্র হিসাবে হাতে নেয়া হয়। ১৯৭৯ সালের ২৬ মার্চ কুষ্টির তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান ভূইয়া এ প্রকল্পের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেন।

আমাদের ইতিহাস জানার জন্য একবার হলেও মেহেরপুরের এসব ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে আসার প্রয়োজন সবার।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]