ঘুরে আসুন সৌন্দর্যের সোপানভূমি সোনার চর


অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী সোনারচর। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার দক্ষিণ সীমানায় বঙ্গোপসাগরের একেবারে কোল ঘেঁষে এর অবস্থান। এখানে রয়েছে বিস্তৃত বনভূমির পাশাপশি সাত কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, আছে লাল কাকরা। সাগরে যখন জোয়ারের পানি উথলে ওঠে তখন অনন্য এক সৌন্দর্য বিকশিত হয় সোনারচরে।তবে এই অপার্থিব জায়গাটা এখনও প্রায় বিচ্ছিন্নই।

বন বিভাগের আওতাধিন সোনার চর হচ্ছে বন্য-প্রাণীর অভয়ারণ্য। সুন্দরেরবনের পর চর কুকরিমুকরি ও সোনার চরকেই ধরা হয় দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। এখানে সৈকতের বালি খুব স্বচ্ছ। রোদের আলোয় তা চিকচিক করে বলেই এর নামকরণ হয়েছে সোনার চর।

সোনারচরের বয়স খুব বেশি নয়। ২০০৪ সালে প্রথম নজরে আসে সোনারচর। ধীরে ধীরে মানচিত্রে পাকা হয় এর স্থান। পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগ বনায়নের দায়িত্ব নেয় এখানে। একসময় গড়ে ওঠে বিশাল বনভূমি যার আয়তন ২,০২৬.৪৮ হেক্টর। সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষিত হয় এই অঞ্চল। বনে ছাড়া হয় ৩০০ হরিণসহ, বানর, শুকর এবং আরও নানান প্রজাতির প্রাণী। পরে যুক্ত হয় বাঘ আর কুমির। ২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর সোনারচরকে পশুপাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। বনের মধ্যে ২ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে গেছে পাকা রাস্তা। মূলত পর্যটকদের ভ্রমণের সুবিধার্থেই এটি করা হয়েছে। বন বিভাগের উদ্যোগে বাঘ আর হরিণের অভয়াশ্রম করা হয়েছে সোনারচরে। এছাড়া একটি কুমির প্রজনন কেন্দ্র গড়ে উঠছে। সোনারচরের বিচের দৈর্ঘ্য ৭ কিলোমিটার।

সোনারচরের বণ্যপ্রাণীদের মধ্যে আছে হরিণ, বুনো মহিষ, অজগর, শিয়াল, বুনো মুরগি। আছে অসংখ্য প্রজাতির পাখি। এখানকার দীর্ঘ সৈকতে দেখা মিলবে লাল কাঁকড়ার। সোনার চরকে আরও অপূর্ব করেছে এখানকার খাল। সমুদ্রের জল প্রবাহ থেকে তৈরি করেছে এই খালগুলো। বনভূমির মাঝে জালের মতো ছড়িয়ে আছে ছোট বড় দেড়শ খাল। ছোট ছোট নৈকায় করে এসব খালে ভেসে বেড়াতে পারবেন আপনি। পাশাপাশি উপভোগ করা যাবে বনের সৌন্দর্য।

পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে সোনার চরের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। চর কুকরি-মুকরি বা চর কচ্ছপিয়া থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটারের মতো। সুতরাং সোনার চর যেতে হলে চর কচ্ছপিয়া বা চর কুকরি-মুকরি থেকেই সহজ যাত্রা। ঢাকার সদরঘাট থেকে সরাসরি গলাচিপা বা চর ফ্যাশন চলে যান। অথবা ভোলা জেলার চর ফ্যাশনের চর কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে ট্রলারে চেপে চর কুকরি-মুকরি। সেখানে একরাত থেকে চরের সৌন্দর্য উপভোগ করে পরের দিন ট্রলারে সোনার চর চলে যাওয়া যায়। ট্রলার ভাড়া আসা যাওয়া মিলে সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকার মতো লাগতে পারে। সোনার চর দলবেঁধে যাওয়াই ভালো।

লঞ্চে ঢাকা থেকে চর ফ্যাশন (বেতুয়া ঘাট বা ঘোসের হাঁট) ডেকের ভাড়া ২শ’ টাকা। কেবিন ১ হাজার টাকা। চর ফ্যাশন থেকে চর কচ্ছপিয়া ফেরিঘাট যেতে হবে মোটর সাইকেল অথবা বোরাকে (ইজিবাইক) চেপে। সময় বাঁচানোর জন্য মোটর সাইকেলে চেপেই চর কচ্ছপিয়া যাওয়া ভালো। সময় লাগবে ৪৫ মিনিট, ভাড়া জনপ্রতি ১শ’ টাকা। এবার স্পিডবোট কিংবা ট্রলার রিজার্ভ নিয়ে নিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫শ’ টাকায়। অথবা লাইনের ট্রলারে চেপে চলে যান চর কুকরি-মুকরি। এখানে রাত কাটানোর জন্য সঙ্গে তাবু নেবেন। এছাড়া উপজেলা পরিষদ ভবনে অনুমতি সাপেক্ষে থাকা যায়। এছাড়া রাত কাটানো যাবে বনবিভাগের অফিসার’স কোয়ার্টার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ি কিংবা খোলা মাঠে তাবু পেতে। তবে দিন গিয়ে দিনে ফেরাই উত্তম। আর খাওয়া-দাওয়ার কোনো চিন্তা নেই। বাজারের হোটেলে অর্ডার দিলেই তাজা মাছের সঙ্গে দেশি মুরগি সহজেই পেয়ে যাবেন, দাম ও হাতের নাগালে।

সোনার চরে রয়েছে ২০ হাজার ২৬ হেক্টর বিস্তির্ণ বনভূমি। এলজিইডি দপ্তরের তত্ত্বাবধানে উন্নয়ন করা হচ্ছে ৫শ’ ৫০ মিটার সি.সি রাস্তা, পাবলিগ টয়লেট। সংস্কার করা হয়েছে রেস্টহাউস। তারপরও এখানে গেলে কিছু সতর্কতা জরুরি। এখানে গেলে অবশ্যই আবহাওয়ার তথ্য নিন সবসময়য়। আর ক্যাম্পিং এর পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা ভেবে রাখুন। সমুদ্র তীরে বিপদ সংকেত আছে কিনা খেয়াল করুন। আপনি বিপদসংকেত খেয়াল না করলে কক্সবাজারের মতো আপনাকে সতর্ক করতে এখানে কেউ ছুটে আসবে না। এমনকি বিপদে পড়লেও উদ্ধার বাহিনী আসতে সময় লাগবে। তাই সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে পর্যটকরা সাধারণত যেদিকটি ব্যবহার করে আপনিও সেই দিকটিই ব্যবহার করুন। জেলেরা মাছ ধরতে আসে এখানে। শুধু দেশীয় নয়, ভারতীয় ট্রলারের অনধিকার প্রবেশের কথাও খবরে আসে মাঝে মধ্যে। এমন কিছু দেখলে বন বিভাগকে অবগত করুন। এড়িয়ে গেলে হয়ত আপনিই ঝামেলায় পড়বেন।

শেষ বিকেলে সূর্যের ম্লান আলো যখন লালচে হয়ে সৈকতের বুকে ঢলে পড়ে তখন অবিশ্বাস্য এক মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। সৈকতের বুকে আছড়ে পড়া আলোয় সাগরের পানির রং যেন সোনালী বর্ণের হয়ে যায়। আর বিকেলে সৈকতের ঝুর ঝুরে বালু কণা যেন লালচে হয়ে সোনার থালায় রূপ নেয়। দূর থেকে মনে হয় সাগরের বুকে একটি সোনার টুকরো এ যেন উপভোগ করার মতো দৃশ্য। মনে হয় সোনার চর নামকরণ সার্থক।

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]