ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেই কি সমস্যার সমাধান?


জাহিদ আব্দুল্লাহ রাহাত : বুয়েটে দেশের সব থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করেন। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে যেমন দেখানো হয় বুয়েট স্বীকৃত, তেমনিভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও বাংলাদেশকে সব থেকে বেশী প্রতিনিধিত্ব করেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে বুয়েটের একটি কমন গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এবং একজন বুয়েটিয়ানকে আমরা সাধারণ মানুষ একটু অন্যচোখে/ সমীহের দৃষ্টিতেই দেখি। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের হাঁটাচলা, কথাবলা,পলাশি মোড়ের কালচার, র‍্যাগ ডে উদযাপন ইত্যাদি আমারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উদাহরণ হিশেবে বলি। এক কথায়, বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কারণেই অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একটু আলাদা থাকে/ আগানো থাকে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অনেক ধরণের গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে- সবগুলোই হৃদয়বিদারক, নৃশংস। বেশীরভাগ গণপিটুনির ঘটনাগুলির যারা মূল হোতা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশা বা রুচির প্রশ্নে দেখা যাবে হয় এরা নিম্ন শ্রেণীর অথবা দ্বিতীয় শ্রেণীর ছিল। আবরারের সহপাঠীরা তাকে ডেকে নিয়ে যায় এবং ঠাণ্ডা মাথায় তিন দফা পিটুনি শেষে তাকে তিলে তিলে হত্যা করে। আবরারকে কোনও সন্ত্রাসী জঙ্গি সংগঠন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা নিকৃষ্ট আমজনতা হত্যা করেনি। হত্যা করেছে তারই সহপাঠীরা দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা।

(২)
আবরারের যদি মৃত্যু না ঘটতো, নির্যাতনের পরেও যদি সে বেঁচে থাকতো হয়ত তার নির্যাতনের কথা কেউ জানতেও পারতো না। বুয়েটে যে টর্চার সেল আছে আলাদা আইন- আদালত আছে সে কথাও কেউ জানতো না। আসলেই কি কেউ জানতো না? টর্চার সেল কি খালি বুয়েটেরই চিত্র? না, দেশের সব কটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই একই চিত্র। গনরুম, গেস্টরুম, র‍্যাগিং, সালাম না দেয়া, মিছিলে না আসা, বিনা কারণে ছাত্র- ছাত্রীদের উত্যক্ত করা, যৌন হয়রানি- এসব তো নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা। প্রশাসনের নাকের ডগায় কিংবা প্রত্যক্ষ মদদে সুবিধাভোগী ছাত্র অথবা শিক্ষকের দ্বারাই নিয়মিত এসব ঘটনা ঘটছে। ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করা বা জমিদারসুলভ মনোভাবের কারণেই দৃশ্যমান সংকট নিরসনে কোনও পদক্ষেপ দেখা যায় না।

একজন শিক্ষার্থী যখন ক্যাম্পাসে নতুন ভর্তি হয়, শুধুমাত্র একটা চড় খাওয়া কিংবা কোনোভাবে অপমানিত হওয়াটা তার মনস্তত্ত্বে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরে। তার সামনে পথ খোলা থাকে দুইটি – সে প্রতিক্রিয়াশীল হয় নতুবা প্রগতিশীল। প্রগতিশীল হওয়ার সম্ভবনা ক্ষীণতর, তাকে বিভিন্ন রুপে প্রতিক্রিয়াশীল হতে দেখা যায়। সে বিরুদ্ধচারণ, বিরুদ্ধ মতের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব পোষণ করে। সে আগ্রাসী, হিংস্র এবং নৃশংস হয় যা আমরা আবরারের সাথে হতে দেখলাম।

(৩)
সারা বাংলাদেশে আবরার হত্যাকাণ্ডের একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ চলছে।ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা পথে নেমেছে বুয়েটের সাথে একাত্মতা পোষণ করছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ১০ দফা দাবী দিয়েছেন এবং একই সাথে শিক্ষক সমিতিও একটি ঘোষণা দিয়েছেন। শিক্ষক সমিতি বুয়েটের সকল ছাত্র- শিক্ষকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনীতির নিষিদ্ধের কথা বলছেন। বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষও তাদের সাথে একই সুরে কথা বলছেন। এই অবস্থানটি খুব গুরুত্বপূর্ণ- বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? বরং আমরা বিষয়টা যদি একটু ঘুরিয়ে দেখি, আজ বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর যদি আধিপত্য থাকতো হয়ত ছাত্রলীগ এরককম ঘটনা ঘটানোর আগে একটু চিন্তা করতো। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর শক্তিশালী অনুপস্থিতিই বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিপত্যকেন্দ্রিক টর্চার সেল হওয়ার অন্যতম কারণ।
এখনও বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা ক্রসফায়ার সাধারণ লেভেলে জনপ্রিয়। মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলার সহজ ও জনপ্রিয় থিওরী সরকারীভাবে বিভিন্ন পোষা বুদ্ধিজীবী কিংবা সংগঠনের মাধ্যমে জনগণকে খাওয়ানো হয়। আবরার হত্যাকাণ্ড প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে হয়েছে রাজনীতির কারণে নয়। তাই যারা রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলেন, তাদের বিষয়ে সাবধান।

(৪)
আবরারের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি গুরুত্বপূর্ণ। তার যুক্তি বা মতামতের বিরুদ্ধে যুক্তি কি ছিল? বাংলাদেশের জনগণকে ভারত বা পাকিস্তান বিষয়ে কথা বলতে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়- এটা একটা জাতীয় দুর্যোগ। যেকোনো সাধারণ মতামতকে মেরুকরণ করা হয় কিংবা পক্ষে- বিপক্ষে ট্যাগ লাগান হয়। আমি যদি বলি ভারতের বিপক্ষে বলার জন্যই আবরারকে খুন করা হয়েছে আমাকে বলা হবে পাকিস্তানি এজেন্ট। যদি বলি এটি আই এস- এর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যাতে ভারত বিরোধিতার সুযোগ নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা যায় তাহলে বলা হবে ‘র’ এর এজেন্ট। আবার ধর্মীয় রং বা শেপ দেয়ার বিষয়টি তো রয়েছেই। ১৯৭১ এ যে কারণে পাকিস্তান আমাদের শত্রু হয়েছিলো আর ভারত বন্ধু ছিল ২০১৯ এ সেই একই কারণে তো উল্টোটাও হতে পারে আবার এর উল্টোটাও হতে পারে।

এ বিষয়টি জটিল এবং আমাদের একটি নিয়মিত পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে। কারও প্রতি বৈরীতা নয় সবার সাথে বন্ধুত্ব। নীতি ঠিকই আছে কিন্তু নতজানু নীতি ঠিক নাই। কারও আগ্রাসী মনোভাবের বিরোধিতা যেকোনো দেশপ্রেমিক মানুষ করবেন। আবরার এই কাজটিই করেছিলেন।

(৫)
সারা দেশে একটি জমাট বাঁধা ক্ষোভ, ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ যেমন ঘটছে তেমনি এই নৃশংসতার সঠিক বিচারের দাবী উঠছে। সরকার এই পরিস্থিতিতে বিচারের আশ্বাস দিবেন, পরিবারকে সমবেদনা দিবেন কিছু আর্থিক সাহায্যও দিবেন। নতুন ইস্যু তৈরির চেষ্টা করবেন যাতে জনগনের দৃষ্টি অন্যদিকে চলে যায়( ডঃ ইউনুসকে নিয়ে অলরেডি শুরু হয়েছে)। কিংবা বিশ্বজিৎ, আবু- বকরদের বেলায় যা ঘটেছিলো তাই ঘটবে। হয়ত আরও জোড়ালো আন্দোলন হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকারের যা করনীয় সরকার ঠিক তাই করবেন।

কিন্তু কতগুলো প্রশ্ন থেকেই যায়- দেশপ্রেমিক আবরার কি আর ফিরে আসবেন? আরেকটি আবরার না হওয়ার সমাধান কি রাজনীতি নিষিদ্ধ করা? কেন বুয়েটসহ দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোতে মেধাবীদের মধ্যে ঘৃণা- নৃশংসতা জন্মে, তাদের টর্চার সেল বানাতে হয়? কেন অপরাধীদের(?) বিরুদ্ধে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয় কিংবা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন দেয়? ভারত- পাকিস্তান প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ এখনও কেন দ্বিধাবিভক্ত ,নির্মোহ আলোচনা- সমালোচনা অনুপস্থিত কেন?


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]