‘জনভোগান্তিমুক্ত’ নগর ভবন—উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বরিশাল


সৈয়দ মেহেদী হাসান : রিকশা চালক হারুন। শারীরীক অসুস্থ্যতার কারনে রিকশা বিক্রি ও কিছু জমানো টাকা দিয়ে শুরু করেছেন মুদি দোকান। এই খবর ২০১৭ সালের জুন মাসের। নতুন দোকান; তাই বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি) কর্তৃপক্ষের ট্রেড লাইসেন্স নিতে ছুটলেন নগর ভবনে। সেখানে গিয়ে দেখলো ট্রেড লাইসেন্স শাখায় চেয়ার-টেবিল আছে কিন্তু কাজের লোক নেই। ঘন্টাখানের দাড়িয়ে একজনকে পেলেন-যিনি পান খেতে গিয়েছিলেন কালেক্টরেট পুকুর পাড়ে। ট্রেড লাইসেন্স করাবেন বলে জানাতেই ওই কর্মকর্তা ক্যালকুলেটরে হিসেব কষে জানালেন কর্পোরেশন নির্ধারিত ফি।


আরও জানালেন পুরো কাজ করতে বাড়তি ৩০০ টাকা দিতে হবে তাকে। কিন্তু কাউকে বলা যাবে না। এমনিতেই রিকশা বিক্রি ও জমানো কষ্টের টাকার দোকান; তার উপরে ট্রেড লাইসেন্স করাতে এসে বখশিশ দেওয়া-খুব একটা ভালো আচরণ মনে হয়নি হারুনের কাছে। কিন্তু করাতে হলো বাড়তি ৩০০ টাকা দিয়ে কর্মকর্তাকে খুশি।

কিন্তু ২০১৯ সালের জুলাই মাসে নগর ভবনে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে নির্ধারিত ফি আর কর্মকর্তার জন্য বখশিশ ৩০০ টাকা নিয়ে গেলেন রুপাতলী হাউজিং এলাকার দোকানী হারুন। কিন্তু হারুন অবাক হলেন এবার। নগর ভবনের ট্রেড লাইসেন্স শাখায় ঢুকতেই একটি চেয়ার টেবিলও দেখলেন না কর্মকর্তা-কর্মচারী শূন্য। বরংছ হারুন ঢুকতেই একজন জানতে চাইলেন-চাচা কি লাগবে? আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি? হারুন ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের কথা বলতেই নির্ধারিত ফি রেখে বাকি নির্দেশনা ও কাগজপত্র তৎনগদ দিয়ে দিলেন কর্মকর্তা। হারুন যখন বাখশিশের ৩০০ টাকা দিতে চাইলো তখন উল্টো কর্মকর্তা বিরক্ত হলেন।

সহাস্যে সেই কর্মকর্তা বললেন-সিটি করপোরেশনতো আপনাদের প্রতিষ্ঠান। এখানে আমরা আপনাদের চাকরী করি। আমাদের কেন বখশিশ দিয়ে কাজ করাতে হবে। আপনাদের কাজ করে দেওয়াতো আমার দায়িত্ব।
মুদি দোকানী হারুন তাজ্জব বনে গেলেন। সেই পুরানো কর্মকর্তাইতো-তাহলে এত সুন্দর আচরণ এলো কিভাবে? শেষে সাহস করে জানতেই চাইলেন হারুন-গত বছর বখশিশ নিলেন। এবার নিবেন না কেন? ওই কর্মকর্তা জানালেন, বাবা এখন বখশিশ নিলে আমার চাকরী থাকবে না। মেয়র স্যারের কানে গেলে আমার চেয়ারটা চলে যাবে। আমার বিরুদ্ধে মামলা হবে। হারুন একটি প্রশান্তি নিয়ে নগর ভবন থেকে বের হন আর নিরাপত্তারক্ষীকে যাচিয়ে বলেন, মেয়র সাদেক দুর্নীতিমুক্ত; দ্যাখো কর্পোরেশন কেমনে দুর্নীতিমুক্ত হইছে। সাদেক একটা বাপের ব্যাটা।

আর এই পুরো অভিজ্ঞতার কথা প্রতিবেদকের সাথে গতকাল সকালে তার সেই ছোট্ট দোকানে কাজ করতে করতে বলছিলেন। শুধু যে হারুন তা নয়; এমন হাজার হাজার তৃণমূলের মানুষ রয়েছেন যারা নগর ভবনের সেবার মান দেখে চমকে গেছেন। বিশ্বাস করতে পারছেন না এত দ্রুত কিভাবে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব। দীর্ঘদিন নগর ভবনের কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারীতায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সেই নগরবাসীকে আস্থা ফিরিয়ে দিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। দুর্নীতির বরপুত্র খ্যাত সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামালের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ২৩ অক্টোবর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর পূর্ন হয় তার দায়িত্ব পালনের এক বছর।

সাদিক আব্দুল্লাহ দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি নগর ভবনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে হাত দেন। ইতিমধ্যে প্রধান কর কর্মকর্তা আ.ন.ম মোশফেক আজমসহ দুর্নীতিবাজ পাঁচ কর্মকর্তাকে বহিস্কার করেছেন। দীর্ঘদিন একই পদে থাকা স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ওঠা একাধিক কর্মকর্তাকে করেছেন বিভিন্ন পদে রদবদল। সঠিক সময়ে হাজিরার জন্য চালু করেছেন ডিজিটাল হাজিরা পদ্ধতি। নগর ভবনের বিশাল স্ক্রীনে শোভা পায় নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দৃশ্য।

বিসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা বেলায়েত হাসান বাবলু জানিয়েছেন, নগর ভবনে কোন নাগরিক এসে সেবা গ্রহণে বিরড়ম্বনায় পড়েছেন এমন কোন অভিযোগ এখন আর পাওয়া যায় না। মেয়র স্যার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে সমস্যা সনাক্ত করেন এবং তা সমাধান করে থাকেন। এই কর্মকর্তা মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর বরাত দিয়ে বলেন, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে মডেল সিটি গড়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

এর স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে দেশ সেরা মেয়রের খ্যাতি লাভ করেছেন। তার স্বপ্ন বরিশাল কাউকে অনুসরন না করে উন্নয়ন ও সেবা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এর মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠন তরান্বিত হবে।

জানা গেছে, সাদিক আব্দুল্লাহ দায়িত গ্রহণের আগেও ঠিকমত ঘরের খোরাক জোগাতে পারতো না নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ৬/৭ মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস বছরের পর বছর ধরে বকেয়া আটকে থাকতো। আন্দোলনে মাসের পর মাস অচল হয়েছিল নগর ভবন। বরিশাল নগরী রুপ নিয়েছিল ময়লার ভাগাড়ে। কিন্তু সাদিক আব্দুল্লাহ দায়িত্ব গ্রহণের পর বকেয়া কোন বেতন পাওনা নেই কর্মচারী-কর্মকর্তাদের। বরংছ ঈদের আগেই বোনাস বেতন পেয়ে যাচ্ছেন তারা।

এমনকি এরমধ্যেই কয়েকধাপে বেড়েছে বেতন-বোনাস। আনসার কমান্ডার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নগরপিতা যদি যোগ্য হন তাহলে তার নগরীর লোক দুঃখে থাকেন না। আমার এমন সময় গেছে যে সিটি কর্পোরেশনের ডিউটির কথা এলে করতে চাইতাম না। এখন প্রতিযোগীতা করে দায়িত্ব নেই। মেয়র স্যারে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার ঘরে এখন অভাব নেই। সময়মত বেতন বোনাস পাওয়ায় বাড়তি দুশ্চিন্তা করতে হয় না।

শুধু নগর ভবনের অভ্যান্তরে নয়; পরিবর্তনের ছোয়া লেগেছে প্রায় ৫ লাখ বাসিন্দার ৫৮ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশাল নগরে। নদী মাতৃক শহরের তকমা লাগিয়ে বিগত সময়ে উন্নয়ন বঞ্চিত করে রাখা বরিশালে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই উন্নয়ন কাজ চলছে। ইতিমধ্যে প্রধান সড়কগুলো পাঁচ বছরের চুক্তিতে ঠিকাদারকে দিয়ে সড়ক সংস্কারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন মেয়র। সড়কের মোড়ে মোড়ে স্থাপন করেছেন থ্রিডি জেব্রাক্রসিং। এতে করে সড়ক দুর্ঘটনা কমে গেছে অনেকাংশে। অনিবন্ধিত যানবাহন নগরীতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞারোপ করায় বিলোপ হয়েছে যানজটের।

জনসংযোগ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দ্রুত ও দীর্ঘ এই দুই মেয়াদী পরিকল্পনায় বরিশাল নগরীর উন্নয়ন হচ্ছে। তিনি জানান, বর্তমানে গুরুত্বপূর্ন সড়ক কার্পেটিং, খালপাড় সংরক্ষন, দখল হওয়া নদী ও খাল পুনঃরুদ্ধার এবং পুনঃখননের কাজ চলছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে আরসিসি ড্রেন নির্মাণ, গড়িয়ার পাড়ে কেন্দ্রিয় বাস টার্মিনাল, নথুল্লাবাদে নতুন নগর ভবন নির্মান, চৌমাথা, রূপাতলী, আমানতগঞ্জ এবং কাউনিয়াা হাউজিং এলাকায় বেইজমেন্টসহ ১০ তলা সুপার মার্কেট কাম বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, দুটি গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল সড়কে ৪টি ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণ, ৪ টি ভাসমান পানি শোধনাগার নির্মাণ করার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যা বাস্তবায়ন হলে নগরবাসী পাবে একটি আধুনিক শহর।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]