জেল খাল সংক্রান্ত এ্যাকশন প্লান : নাগরিক বিনোদনের নতুন সম্ভাবনা


নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর বরিশাল আঞ্চলিক অফিস ২০১৭/১৮ অর্থবছরে গবেষণা কাজের আওতায় বরিশাল নগরীর জেল খাল নিয়ে “জেল খাল সংক্রান্ত এ্যাকশন প্লান প্রস্তাবনা: নাগরিক বিনোদনের নতুন সম্ভাবনা” নামক একটি এ্যাকশন প্লান প্রস্তাবনা প্রকাশ করে। গবেষণা প্রস্তাবনাটির প্রধান উদ্দেশ্য হল জেল খালের দুইপাশের অবকাঠামোগত জরিপের মাধ্যমে, দখলকৃত অংশের ভূমি ব্যবহার বিশ্লেষণ করা, এবং জেল খালকে একটি বিনোদনমূলক স্থান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।

 

খালটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকা থেকে কীর্তনখোলা নদী সংলগ্ন পোর্টরোড ব্রিজ পর্যন্ত মোট ৩.২২ কিলোমিটার এলাকায় অবকাঠামোগত জরিপের মাধ্যমে দেখা যায় পুরাতন মৌজাম্যাপ অনুসারে গবেষণা এলাকা নথুল্লাবাদ থেকে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত জেল খালর মোট আয়তন ছিল ১০.০৫ একর কিন্তু সময়ের বিবর্তনে দখল সংঙ্কচনের ফলে তা এখন অবশিষ্ট আছে ৬.৮০ একর মাত্র। আমাদের জরিপে উঠে এসেছে, এখন সর্বমোট ৯৫টি অবকাঠামোর দ্বারা বর্তমান জেল খালটির কাঠামোকে বিভিন্ন মাত্রায় দখল করা হয়েছে।

 

দেখা যাচ্ছে, দখলদারদের আবকাঠামোগুলোর মধ্যে ৩৫টি পাকাবাড়ি, ২৭টি সেমি পাকাবাড়ি এবং ৩৩টি কাঁচাবাড়ি রয়েছে। এই জরিপে আরও দেখা গেছে, খালটির বর্তমান গড় গভীরতা রয়েছে ১.৫ ফিটমাত্র।

এই গবেষণা সম্পাদনের মাধ্যমে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েয়ে যে, জরিপকালীন সময়ে সাধারণ অধিবাসী ও সরকারী পেশাজীবিদেরকে নিয়ে স্টেক হোল্ডার সভায় অংশগ্রহণকারীদের গুরুত্বপূর্ণ মতামতের ভিত্তিতে, জটিল ভূমিঅধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে যথাসম্ভব পরিহারের মধ্য দিয়ে “জেল খাল সংক্রান্ত এ্যাকশন প্লান প্রস্তাবনা” পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়।
এক্ষেত্রে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর বরিশাল আঞ্চলিক অফিস এ্যাকশন প্লানের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হল :

🔴 পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য খাল খনন করা।
🔴 খালের পাড় সংরক্ষণ ও দুপাশেই ওয়ার্কওয়ে নির্মাণ করা।
🔴 উপযুক্ত স্থানে মোডাল ট্রান্সফার পয়েন্ট নির্মাণ করা।
🔴 খালসংলগ্ন খোলা জায়গায় বিনোদনমূলক পার্ক স্থাপন করা।
🔴 খালের পাড়ে বসার জন্য কংক্রিট বেঞ্চির ব্যবস্থা করা।
🔴 ফ্রয়োজনীয় ব্রীজ নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা।
🔴 খালের দুইপাড়ে রাস্তা নির্মাণ ও পূর্বের রাস্তা প্রশস্ত কর।
🔴 সংযোগ নোডগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন করা।

অনবরত ময়লা আবর্জনা ফেলা , পয়নিস্কাসনের চ্যানেল থেকে আগত বর্জ্যপদার্থ পতন, খালঘেঁষে অবকাঠামো স্থাপন প্রভৃতি কারণে, খালের তলদেশ বিভিন্নভাবে ভরাট হয়েছে। খালটির ২৩টি স্থানের পানির গভীরতা পরিমাপ করে দেখা গেছে, খালটির কিছু জায়গায় বর্তমানে গভিরতা রয়েছে ১ থেকে ১.৫ ফুট, যা থাকার কথাছিল-কমপক্ষে ৮ থেকে ৯-ফুট। খালটির উৎপত্তিস্থল পোর্টরোডের কাছে অপরিকল্পিতভাবে বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনা করার ফলে, খালটিতে ব্যাপক আকারে ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে, ফলে এর উৎসমুখ প্রতিনিয়ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খালটিতে পানির প্রবাহ যথাযথ রাখতে উৎসমুখের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার পূর্বক পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে খালটি খনন করে কমপক্ষে ৮ থেকে ৯-ফুট গভিরতায় পরিণত করারর জন্য বিশেষভাবে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া খালটির টেকসই উন্নয়নের জন্য খালের দুইপাশে ৩০০কোন করে-পাড় বাঁধাই পূর্বক উক্ত জায়গায় কংক্রিটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ, গুল্ম রোপণ করতে হবে, যা একাধারে তাপ নিঃসরণ কমাবে অন্যদিকে পাড়ের মাটির ক্ষয়রোধ করবে।

দেখা যাচ্ছে, মৌজা অনুযায়ী নথুল্লাবাদ থেকে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত জেল খালটির প্রস্থ একই পরিমানে নেই। তাই, প্রস্থবিবেচনায় জেল খালটি তিন ধরণের অবস্থা প্রকাশ চকেরপোল ব্রিজ এলাকায় সর্বনিন্ম ২৪-ফুট এবং উৎসমুখের কাছাকাছি সর্বোচ্চ ৭৫-ফুট এবং পরিমাপকৃত বাকি পয়েন্ট গুলোতে গড়ে ৪৮-ফুটের কাছাকাছি। এছাড়া কিছু জায়গা রয়েছে, যেমন নথুল্লাবাদ মোড় থেকে শুরু করে মরকখোলা মোড় পর্যন্ত খালের পাশে একটি রাস্তা আছে সুতরাং প্রস্তাবিত ওয়াকওয়ে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন হবে। স্বাভবিক হাঁটাচলা ও বাইসাইকেল চালনার জন্য খালটির দুপাশে কমপক্ষে সাতফুট ওয়াকওয়ে প্রয়োজন হবে, ফলে সে অনুযায়ী ওয়াকওয়ে এবং এরপরে খাল পাড়েব নূন্যতম তিনফুট জায়গা সবুজায়ন করে বসার ব্যবস্থাকরণের প্রস্তাবনাও দেয়া হয়েছে।

জেল খালের মৌজাম্যাপ অনুযায়ি যে সকল স্থানে খালের জায়গা ৩০-ফুটের কম জায়গা রয়েছে, সেখানে দুইপাশের ওয়াকওয়ে খালের উপর দিয়ে (Elevated Walkway) নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খালটিতে মোট তিনটি মোডাল ট্রান্সফার পয়েন্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখান থেকে মানুষ নৌকায় উঠানামা করতে পারবে এবং একই সাথে সড়কপথে যাতায়াত করতে পারবে। খালটি যেখানে যথেষ্ট প্রশস্ত এবং একইসাথে পার্শ্ববর্তী রাস্তার সাথে শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সংযোগ ভালো, কেবল সেইসব স্থানে মোডাল ট্রান্সফার পয়েন্ট প্রস্তাব করা হয়েছে। এজন্য মোডাল ট্রান্সফার পয়েন্ট নির্মাণের চিহ্নিত জায়গাসমূহ হল : নথুল্লাবাদ মোড় যা বরিশাল শহরের প্রবেশ্লার, মরকখোলা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা, যা কাউনিয়া মুলসড়ক ও লাকুটিয়া সড়কের সাথে সুংযুক্ত এবং জেল খাল সংলগ্ন নাজিরেরপুল এলাকা।
জেল খাল সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে ছোট বড় মিলে ছয়টি ব্রিজ/কালভার্ট আছে এর মধ্যে কাঠেরপুল, নাজিরেরপুল, কাউনিয়া লাকুটিয়া ব্রিজ, পোর্টরোড ব্রিজ, নতুল্লাবাদ ব্রিজ, মরকখোলা ব্রিজ উল্লেখযোগ্য।

 

এছাড়া যাতায়াতের সুব্যবস্থার জন্য খালের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে চারটি ব্রিজ প্রস্তাব করা হয়েছে, যেগুলির একটি খানবাড়ি রোডের খাল সংলগ্ন জায়গায় অবস্থিত যার সাথে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন সংযোগ রাস্তার সরাসরি যোগাযোগ আছে। অন্যটি পন্ডিম কাউনিয়া রোডের খাল সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত হতে পারে, যেখানে খালটি সবথেকে সরু হয়ে প্রবাহিত। অন্য দুইটি ব্রিজের একটি হাসপাতাল রাস্তার সাথে কাউনিয়ার মূলরাস্তার সংযোগ স্থাপন করেছে সেখানে। এছাড়া বর্তমানে অবস্থিত ব্রিজগুলোর বেশিরভাগই বক্স আকৃতির কালভার্ট যার দুইদিকের অংশ খালটির ৩০% জায়গা দখল করে ফেলেছে, অন্যদিকে এই ধরণের বক্স কালভার্ট এর জন্য বন্যার সময় অতিরিক্ত পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়, ফলে শহর জুড়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক জলাবদ্ধতা। এ ছাড়াও দুইপাড়ের মানুষের যাতায়াত বাবস্থা সহজিকরণের সাথে সাথে খালে পানির প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য বর্তমান ব্রিজগুলোকে নতুন করে তৈরির প্রস্তাবও করা হচ্ছে। কেননা, ব্রিজগুলো খালের উভয়পার্শে বক্স আকৃতির না হয়ে অর্ধবৃত্তাকৃতির করা বাঞ্চনীয়।

যেহেতু, খালটির চারপাশের রাস্তাগুলোর সাথে কিছু কিছু স্থানে রাস্তার সংযোগ নেই, এক্ষেত্রে জনসাধারণকে একজায়গা থেক অন্যজায়গায় পৌঁছাতে গেলে অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হয়, সেলক্ষে বিদ্যমান রাস্তার কিছু কিছু সংযোগহীন স্থানে সংযোগ স্থাপন পূর্বক খালের উভয় পাড়ের সাথে যথাযথভাবে যোগাযোগ স্থাপন করাও জরুরী। এ বিষয়টিও বিবেচনা পূর্বক সম্পূর্ণ অঞ্চলে সাতটি সংযোগ রাস্তার প্রস্তাবনা আনা হয়েছে। উক্ত রাস্তাগুলো খালের দুইপাড়ের সাথে যথাযথ সংযোগ স্থাপন করবে এবং একইভাবে জনগণের ভ্রমণের সময় এবং যাতায়াত খরচ কমাতে সহায়তা করবে।

জেলখালের সাথে বরিশাল শহরের তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নোড ওতপ্রতোভাবে জড়িত, সেগুলো হল : নথুল্লাবাদ মোড়, মরোকখোলা মোড় এবং জেলখানা মোড়। জেল খালটিকে বিনোদনমূলক স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এই তিনটি নোডের পরিকল্পিত উন্নয়নও বিশেষভাবে জরুরী। সেলক্ষে নথুল্লাবাদ মোড়ে বহুতলবিশিষ্ট পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যিকভবন, ক্যানালফ্রন্ট মার্কেট ও মোডাল ট্রান্সফার পয়েন্ট-এর প্রস্তাব করা হয়েছে। খালের পার্শ্ববর্তী মৌজা প্লটের মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় সরকারি খাসজমি সহ ফাঁকা জায়গা রয়েছে, সেই সকল স্থানের ভূমিকে পরিকল্পিত উপায়ে সৌন্দর্যবর্ধন করা যেতে পরবে। খালসংলগ্ন মরকখোলা নামক স্থানে একটি ইকোপার্ক করার প্রস্তাবনাও আনা হয়েছে।

যেহেতু উক্তস্থানে রাস্তার যথাযথ সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে সুতরাং জনসাধারণ ইকোপার্কের সাথে সাথে খালের মধ্য দিয়ে নৌকায় ভ্রমণের সুযোগ পাবে। পার্কের স্থানটিতে একটি বৃহৎ পুকুর আছে সেটি সংরক্ষণ পূর্বক পরিকল্পনা করা হয়েছে। উক্ত পুকুরটিকে অতিরিক্ত পানি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন স্থান হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এর মাঝখান দিয়ে একটি কাঠেরপুলর প্রস্তাব করা হয়েছে। পুকুরের চারপাশে বসার ব্যবস্থা সহ শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। পুকুরের পানি পরিস্কার রাখার স্বার্থে সেখানে পদ্মফুল চাষ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বরিশাল নগরীর পুরাতন জেলখানাটিকে নতুন করে সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, সেলক্ষে খালটির বর্তমান অবস্থা বিবেচনা পূর্বক বিভিন্ন ধরনের সুবিধাদি প্রদান করা হবে। বর্তমানে জেলখানাটি বগুরা আলেকান্দা মৌজার ৩২৭৭-৮১, ৩২৮৪-৮৮, ৩২৯৩, ৩২৯৪ নং প্লটের মধ্যে অবস্থিত উক্ত প্লটগুলো সবমিলিয়ে ৫৩৫ একর। জেল খালটি একাধারে পন্ডিমে সদররোড দক্ষিণে লাইনরোড দ্বারা বেষ্টিত। খালটি জেলখানার পূর্বপাশ দিয়ে বহমান এই সকল স্থানে খালের গড় প্রশস্থতা ৫০-৫৫ ফুট।

 

সেই কারণে, এই অঞ্চলে বোটঘাট করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিক দিয়ে এই অঞ্চলে রাস্তার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এই অঞ্চলটি মোডাল ট্র্যান্সফার স্টেশন হিসেবে ব্যাবহারের উপযুক্ত। মাস্টারপ্লানে জেলখানাটি স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে, সেক্ষেত্রে স্থানান্তর শেষে বহুতলা বিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবন জেল জাদুঘর, গণগ্রন্থাগার ইত্যাদিসহ নিুোক্ত প্রস্তাবনা প্রদান করা হয়েছে। জেল খাল সংলগ্ন এলাকায় খালের দুপাশে অবস্থিত ভবনসমুহকে সম্মুখভাগ জেল খালের দিকেই রাখার জন্য একটি বিশেষ প্রস্তাবনও দেয়া হয়েছে, যা খালকে পরিস্কার রাখতে সহায়তা করবে।

লেখক : প্লানার, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, বরিশাল আঞ্চলিক আফিস।


বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।