জোড়াসাঁকোর ঠাকুর দ্বারকানাথের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

  • 25
    Shares

প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৭৯৪ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৮৪৬ সালের আজকের এই দিনে (১ আগস্ট) মৃত্যুবরণ করেন। কলকাতার সুবিদিত জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির তিনি প্রতিষ্ঠাতা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা। দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনযাপন ছিল রাজসিক ও জাঁকজমকপূর্ণ। তাকে নিয়ে লিখেছেন সাংবাদিক সাঈদ হাসান

১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধ ও ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ রাজের শাসন প্রবর্তন— মধ্যবর্তী এক শতাব্দীতে ভারত ছিল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। আদালত-হুকুমত-তহশিল-তেজারতি— সবকিছু কোম্পানির হাতে। অনভিজ্ঞ হাতে নতুন উপনিবেশ চালাতে গিয়ে কোম্পানি ভারতকে পরিণত করে প্রকাণ্ড সামাজিক পরীক্ষাগারে। বিলেতের প্রতিষ্ঠান ও ইউরোপীয় ভাবধারাকে ভারতে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা চলে। স্থানীয় সরকার, ভূমি রাজস্ব, বিচার প্রশাসন নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। মাদ্রাজ থেকে মুলতান অথবা সীমান্ত প্রদেশ পর্যন্ত সর্বত্র একই চিত্র। ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক ও জনজীবনে ব্রিটিশদের এমন একচ্ছত্র আধিপত্যের কালে ব্যতিক্রম দ্বারকানাথ ঠাকুর। ব্যবসা-বাণিজ্য-সমাজ-সংস্কৃতিতে নিরঙ্কুশ ব্রিটিশ উপস্থিতির পাশেই সমহিমায় শামিল ও উজ্জ্বল ছিলেন এ বাঙালি ব্রাহ্মণ। সামান্য পারিবারিক সমর্থন ও ক্ষুরধার ব্যবসায়িক প্রতিভার মিশেলে দ্বারকানাথ নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়েছিলেন। ব্রিটিশদের একচেটিয়া ব্যবসার কালে তিনি শিপিং লাইন্স, কয়লা খনি, বীমা কোম্পানি, ব্যাংক ও নীলকুঠির মালিক ছিলেন। খিদিরপুর ও হাওড়া ডকইয়ার্ডের মালিক হয়েছিলেন তিনি। ভারতে বাষ্পীয় ইঞ্জিন প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে রেলপথ নির্মাণেও বিনিয়োগ করেছিলেন।

ইঙ্গ-ভারতীয় ব্যবসায়িক সহযোগিতার সূচনা হয়েছিল সতের শতকে। গোড়াতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মাদ্রাজ, বোম্বে ও কলকাতায় বাণিজ্য কুঠি প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতের দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে ব্রিটিশদের বাণিজ্যকুঠি ছিল একেকটি ব্যবসায়িক ছিটমহল। ভারতীয় বণিকরা এসব ছিটমহলে ব্যবসা করতে যেতেন। কেউ ইংরেজদের এজেন্ট ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন। কেউ তাদের সঙ্গে অংশীদারি ব্যবসায় জড়াতেন। আবার আরেকটি দল এসব ছিটমহলেই নিজেদের স্বতন্ত্র বাণিজ্যকুঠি প্রতিষ্ঠা করে। ব্যবসায়ী-নিয়ন্ত্রিত লোকালয় ও উপশহরে বসবাস বণিকদের বাড়তি স্বস্তি ও সুবিধা দিত।

ব্রিটিশ ছিটমহল ঘিরে ও সেখানে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করে ভারতের কয়েকটি সম্প্রদায় প্রভূত অর্থসম্পদ ও খ্যাতির অধিকারী হয়। পশ্চিম উপকূলের বোম্বেতে গুজরাটি গোত্রগুলোর পাশাপাশি ছিল পারসি, জৈন ও মুসলিম বোহরা সম্প্রদায়। মাদ্রাজে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তামিলনাডুর ছেত্তিয়ার ও অন্ধ্রের কোমাতি সম্প্রদায়। একইভাবে কলকাতায় সুবর্ণবণিকদের পাশাপাশি কয়েকটি ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ গোত্র বিত্ত ও প্রতিপত্তি পেয়েছিল। যেসব ব্রাহ্মণ পরিবার প্রতিষ্ঠা পেতে কলকাতায় এসেছিল, তাদের মধ্যে দ্বারকানাথের পূর্বপুরুষরাও ছিলেন। এছাড়া আর্মেনীয় খ্রিস্টান, বাগদাদি ইহুদি, রাজস্থানের মাড়োয়ারি ও পাঞ্জাবের ক্ষত্রিয়রাও কলকাতায় এসেছিল। আর্মেনীয় ও বাগদাদিরা কলকাতার পাশাপাশি মাদ্রাজ ও বোম্বেতেও গিয়েছিল। মাড়োয়ারি ও ক্ষত্রিয়রা কলকাতা বন্দরের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সংযোগ ঘটিয়েছিল। আঠারো শতকের শেষার্ধে এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপকূলীয় ছিটমহলগুলো হয়ে ওঠে ধনী ও সমৃদ্ধ ক্ষমতাকেন্দ্র। যার ফলে কোম্পানি ক্ষমতার উচ্চাভিলাষ পুষতে থাকে।

দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনকাল ১৭৯৪ থেকে ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। আঠারশ ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে কলকাতার সর্বজনস্বীকৃত সমাজপতি তিনি। বিলেতে সর্বাধিক পরিচিত ভারতীয় নাগরিক ও ব্যবসায়ীও ছিলেন তিনি। কবি রবীন্দ্রনাথ ও ঋষি দেবেন্দ্রনাথকে দেখে দ্বারকানাথকে জানা দুষ্কর। আঠারো শতকের গোড়ায় যশোরের নরেন্দ্রপুর ছেড়ে যে পরিবারটি কলকাতার গোবিন্দপুরে বসতি গড়েছিল, তাদের দেখেও দ্বারকানাথকে বোঝা সহজ নয়।

ব্রিটিশদের ভারত জয়ের সমসময়েই ঘটেছিল শিল্প-বিপ্লব। দুটো ঘটনা মিলে ইঙ্গ-ভারতীয় বাণিজ্য সম্পর্কের চেহারাটাই পাল্টে দিয়েছিল। ব্রিটেন ও ভারতের অবস্থান ছিল শিল্প-প্রাযুক্তিক দৃশ্যপটের দুই প্রান্তে। শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল ব্রিটেন। আর ভারতের কৃষক ও কারিগররা তখনো ব্যবহার করছিল হাজার বছরের পুরনো প্রযুক্তি। প্রাযুক্তিক দূরত্ব এত প্রকট হওয়ায় ব্রিটিশদের অধিকৃত হয়ে ভারত পড়ে যায় বিরাট অর্থনৈতিক চাপে। বিলেতের কারখানাজাত পণ্যকে ভারতের বাজারে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। বিলেতের শিল্পের ও কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থে এখানকার কৃষিজমিতে শুরু হয় বাণিজ্যিক চাষাবাদ। আফিম, নীল, চিনি, চা, কফি ও সুতা উত্পাদন শুরু হয়। নিজেদের বিলাসদ্রব্য আমদানির খরচ মেটাতে জমিদাররাও এসব পণ্য চাষে নিরত হন।

কোম্পানির কর্মীরা নতুন উত্পাদিত অর্থকরী পণ্যের রফতানি বাজার উন্মোচনে ব্যস্ত হন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন দ্বারকানাথ ও সমমনা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে দ্বারকানাথ যেখানে ভিন্ন, তা হলো তিনি বাণিজ্য-যুগের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও সংগঠনকে শিল্পযুগে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। বিলেতে ভারতের কাঁচামাল রফতানির পাশাপাশি তিনি সেখানকার শিল্প বিপ্লবকে এখানে আমদানি করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন।

দ্বারকানাথ শুধু বিত্তবান ব্যবসায়ী ছিলেন না। চিত্তের বিত্তও তার কম ছিল না। ইংরেজি শিক্ষিত দ্বারকানাথের দীক্ষা ছিল আঠারো শতকের জাতীয়তাবাদ ও উনিশ শতকের উদারবাদী দর্শনে। ভারতীয়দের অধিকার ও ভারতকে নিয়ে ব্রিটেনের কমনওয়েলথ সংহত করার কথা বলতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বক্তৃতা করেছেন। তারও আগে সতীদাহের বিরোধিতা করে তরুণ বয়সেই পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়ির বড়দের বিরাগভাজন হতে দ্বিধা করেননি। তুতো ভাই প্রসন্ন কুমার ঠাকুরকে নিয়ে তিনি রামমোহন রায়ের আত্মীয় সভায় যোগ দিয়েছেন। বন্ধু ও গুরু রামমোহন রায়কে তিনি আগাগোড়া সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছেন। রেভারেন্ড উইলিয়াম অ্যাডামকে নিয়ে রামমোহন ১৮২১ সালে ক্যালকাটা ইউনিটারিয়ান কমিটি গঠন করলে দ্বারকানাথ তার সঙ্গী হয়েছেন। গোঁড়া হিন্দু ঠাকুররা যে ব্রাহ্মমতে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তার মূলে ছিলেন দ্বারকানাথ।

নিজের মতাদর্শিক প্রচারের স্বার্থে দ্বারকানাথ প্রকাশনা শুরু করেছেন। পত্রিকা ও ছাপাখানা কিনেছেন। সতীদাহ ইস্যুতে রামমোহনের আত্মীয় সভা ও রক্ষণশীলদের ধর্মসভার মধ্যকার বিরোধ ও উত্তেজনা তীব্র হলে দ্বারকানাথ নিষ্ঠুর প্রথাটির বিরুদ্ধে সরব থেকেছেন।

গোড়ার দিকে ইংরেজ বণিকদের মফস্বলে জমি কেনার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ছিল। ইংরেজ ও ইউরোপীয় বণিকরা এ নিষেধাজ্ঞা রদের পক্ষে সরব হয়েছিল। রামমোহনের পাশাপাশি দ্বারকানাথও তাদের পক্ষ নিয়েছেন। বণিকদের আবেদনে তিনি অনুস্বাক্ষর করেছিলেন। রক্ষণশীল বাঙালি সমাজে নেতৃস্থানীয় সবাই এ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ছিলেন। ভিনদেশী বণিকরা দেশের অভ্যন্তরে ভূসম্পত্তির মালিক হোক, এটা তারা চাইতেন না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে ছিল। কোম্পানি চাইছিল তাদের একচ্ছত্র ব্যবসার সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখতে। দ্বারকানাথ তখন স্বদেশী সমাজপতি ও ভিনদেশী কোম্পানির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।

ঝানু ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ। ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ককে জমিদার, দেওয়ান, বণিক ও নীলকর হিসেবে নিজের সুবিধামতো কাজে লাগিয়েছেন। আবার ব্যবসায়িক স্বার্থে তাদের সঙ্গে সমানে সমানে টেক্কা দিয়েছেন। রফতানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় কলকাতার বণিকরা সংকটে পড়েছিল। আর্থিক সংকটের কারণে একের পর এক ট্রেডিং হাউজ বন্ধ হচ্ছিল। দ্বারকানাথ তখন কলকাতায় বিলেতি বণিকদের ত্রাতা হয়েছেন।

বিত্তের পাশাপাশি আভিজাত্যেও ব্রিটিশদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন দ্বারকানাথ। ব্রিটিশ প্রভাবাধীন কলকাতার ধনিক ও বণিক সমাজে বাঙালির বনেদিয়ানা ও রুচির উত্কর্ষ প্রমাণ করেছেন। ইংরেজদের সঙ্গে মেলামেশা করায় নিজ ঘরে তিনি অচ্ছূত্ হয়েছেন। স্ত্রী দিগম্বরী দেবী তাকে জোড়াসাঁকোর বাড়ির অন্দর মহলে যেতে দিতেন না। বাড়ির বাইরে বৈঠকখানায় তিনি অতিথিদের সঙ্গে মিলিত হতেন, তাদের আপ্যায়ন করতেন। দমদমের কাছে তার বেলগাছিয়া গার্ডেন নামের বাড়িতে আমন্ত্রিত হতে সাহেব-মেমরা লালায়িত হতেন। দ্বারকানাথের আপ্যায়ন পেলে ইংরেজ পার্টিতে গর্ব ভরে সে গল্পও করতেন।

কলকাতার ইউরোপীয় থিয়েটারের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন দ্বারকানাথ। একপর্যায়ে তিনি চৌরঙ্গী থিয়েটারটি কিনেও নিয়েছিলেন। ইউরোপীয় নৃত্য, নাট্য ও সঙ্গীতের প্রতি তার আমৃত্যু আকর্ষণ ছিল। পৌত্র রবীনন্দ্রনাথ ঠাকুর এক্ষেত্রে তারই উত্তরাধিকার বহন করছিলেন।


  • 25
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]