তামিমকে পেয়েছে টাকার নেশায়

  • 1
    Share

চারপাশে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের মানুষ। তাদের আচরণ বা দৈহিক পার্থক্যও বিস্তর। কিন্তু সাবাই চায় একটু ভালোভাবে বাঁচতে-দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে। কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধতায় সবাই কি পারে সমানভাবে সুখি ও নির্ভাবনার জীবন অতিবাহিত করতে? এত কোটি মানুষের মাঝে পাশের মানুষটিকে কেউ কি দেখি মানুষের চোখে? এমন অনেক জীবনের ইতিহাস রয়ে গেছে না দেখার অন্তরালে। চলতে চলতে জীবন থেকে নেওয়া সেই পাঁচালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন গল্পকার ও সাংবাদিক বিধান সরকার। আজ পড়ুন-নবম পর্ব।


আমার লগে দুইডা জ্বীন আছে। একটা ভালো, আরেকটা খারাপ। ভালোডা জাগলেই বাড়ির পানে মন টানে। আর খারাপটায় পথে নামায়। বাপ আমার মায়েরে ছাইড়া দিল হেই থেইক্যা স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হইল। টাকার নেশা হইয়া গেছে আমার। অসুস্থ শরীর, পাইপ দিয়া প্রস্রাব করতে হয়। ভাড়ী কাজ করতে পারিনা। ডাক্তার কইছে চাইর মাস পর আবার অপারেশন করা লাগবো। তহন বাড়ি চইলা যামু।

 

বাপ আরেকটা বিয়া কইরা সংসার পাতছে। মা চইলা গেছে সৌদি আরব। চাচারা কইছে আমারে আপারেশন করাইয়া ভালো করবো। ভালো হইয়া চাচাদের দোকানে কাম করমু। এমন কথাগুলো তামিম ইকবাল (১২) নামক শিশুটির। যার বাড়ি শরিয়তপুর জেলার সুরেশ্বরের চরবাঘা গ্রামে। ওর সাথে কথা হয় বরিশাল লঞ্চঘাটে। যে শোনালো এই সমাজে স্নেহ, মায়া, মমতা সব মিথ্যা; টাকাই সত্য। তাহলে শুনি ওর এইটুকুন জীবনের গল্প।

তামিমের বাবা নজরুল ইসলাম গাড়ি চালক। মা তাজনেহার বেগম। তাদের সংসারে রিফাত ও তামিম দুই সন্তানের জন্ম হয়। তামিমকে যে বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হলো ওই বছর বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হলো। যার রেশে পড়ালেখায় ছেদ পড়লো তামিমের। বাবা নজরুল ইসলাম আরেক নারীকে বিয়ে করে সংসার বাঁধল। এনিয়ে তামিম বলে, ওই মহিলা আমার বাবারে তাবিজ করছে। হেইয়ার লাইগ্যা আমার মায়েরে ছাইড়া দেছে। সংসার ভাইঙ্গা গেলে বড় ভাই রিফাত বাড়ি ছাইড়া চইলা যায়। আর আমি মায়ের লগে নানা বাড়ি মাদারীপুরে থাকি। তয় আমার বয়স যখন নয় বছর তহন বাড়ি ছাড়ি।

এই বাড়ি ছাড়ার নেপথ্যের একটি ঘটনা বর্ণনা করে তামিম। তাহলো ছোট বেলায় নানি বাড়ি যাওয়ার পথে হঠাৎ প্রচন্ড বাতাস বয়। ওই বাতাস মায়ের কোলে থাকা তামিমের বুকে লাগে। গায়ের বর্ণ নীল হয়ে যায়। ফকিরের কাছে নিয়ে গেলে তার বক্তব্য ছিল, ওর শরীরে দুইটা জ্বীন প্রবেশ করেছে। বড় হলে ভালো হবে বটে; তবে দুইটা জ্বীন ওরে দুই দিকে টানবে। তামিমের ভাষায় তাই হইল। ভালো জ্বীনডা আইলে আমার মন বাড়ির পানে ছুটে। আর খারাপটায় বাড়ি ছাড়া করে। খারাপ জ্বীনের পাল্লায় পড়ে তামিম বাড়ি ছেড়ে ঢাকার সদরঘাট আসে।

 

ইচ্ছে জাগে কোরবানীর মাংস টোকায়ে বরিশাল এসে ঈদ করবে। তখন সুরভী-৯ লঞ্চ নতুন নেমেছে। সদরঘাটের ৪ নম্বর পন্টুনে ভিড়ানো কালাম খান লঞ্চ থেকে সুরভী-৯ লঞ্চে ওঠতে যাওয়ার সময় চাপ লেগে কোমড়ে প্রচন্ড আঘাত লাগে। সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রা উদ্ধার করে তামিমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়। খবর পেয়ে তামিমের মা তাজনেহার বেগম রাজধানীতে চলে আসে। সুরভী লঞ্চের মালিক চেয়েছিল তামিমকে সুস্থ করে তাদের কাছে রাখবে, পড়ালেখা শিখাবে। কিন্তু তামিমের মা বেঁকে বসেন। ক্ষতিপূরণ চান ছেলে আহত হওয়ার জন্য। ওসময় দশ লাখ টাকা পেয়েছিল তাজনেহার বেগম এটা তামিমের কথা। ওরপর হাসপাতালে দিনকয়েক তামিমকে দেখভাল করে বাবার বাড়ি মাদারীপুরে চলে আসেন। ওর মাস তিনেক পর সৌদি আরব চলে যান তামিমের মা তাজনেহার বেগম।

ঢাকা মেডিকেলে দুটি অপারেশনের পর কিছুটা সুস্থ হলে তামিমের আরেক অধ্যায়ের সূচনা হয়। চিকিৎসক পাইপ বসায়ে দেয় মুত্রনালীতে। তিন বছর পর ফের অপারেশন করতে হবে বলে জানিয়ে দেয়। এরপর গামছা পড়ে ভিক্ষা করতে নামে তামিম। আরেকটু সুস্থ হলে লঞ্চে কাজ নেয়। সেই থেকে ঢাকা বরিশাল রুট তামিমের মুখস্থ হয়ে যায়। ফাঁকে ফাঁকে সুরেশ্বর গ্রামের বাড়িতে যায় যেখানে দাদা-দাদী আর চাচারা রয়েছে। বাবার কথা বলতে, নতুন সংসার গড়েছেন আজিমপুর এলাকায়। গুলিস্তান টু আব্দুল্লাপুর রুটে বাস চালায়। যখন তাবিজের প্রকোপ কমে আসে তখন সন্তানদের কথা মনে পড়ে বলে জানায় তামিম। কিছু দিন হলো নিরুদ্দেশে থাকা বড় ভাই রিফাতের খোঁজ মিলেছে। সে এখন চাচাদের দোকানে দর্জির কাজ করে।

যেদিন তামিমের সাথে কথা হয়, সেদিন থেকে লঞ্চের কাজ ছেড়ে দিয়েছে। বরিশালে এক চায়ের দোকানে কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। তবে পুরোটা সুস্থ হবার জন্য ফের অপারেশনের প্রয়োজন রয়েছে ওকথা মনে আছে তামিমের। এজন্য চার মাস পর বাড়িতে চলে যাবে। অপারেশনের জন্য এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাগতে পারে। এই টাকা চাচারা যোগান দেবে। চাচারা কেন টাকা দেবেন এমন প্রশ্নে জবাবে তামিম বলে, বাপ মা থাকতেও নাই। তাই এতিম ভাইবা চাচারা অপারেশন করাইবো। ভালো হইয়া চাচাদের দোকানো কাম করমু।

 

তাদের সাথেই থাকমু। ফের মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করতে বলে, হাসপাতালে অসুস্থ হওয়ার সময় আম্মু আম্মু কইয়া হাত ধইরা রাখছিলাম। কিন্তু আম্মু আমার হাত ছাড়াইয়া সেই যে চইলা গেলো আর আহেনাই। হেইয়ার পরতো সৌদী আরব চইলা গেল। হুনছি নানাবাড়ি টাকা পাডায়। আমাগো কোন খোঁজ খবর নেয়না। ওসময় বিড়বিড় করে বলতে থাকে, পাষাণ দুনিয়া টাকাই সব। তাই আমারেও যেন টাকার নেশায় পাইছে।##

 

২৬.১১.২০২০


  • 1
    Share

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]