আজ কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদিন

তাহের কোনো বিশ্বাসঘাতকের কাছে হার মানেননি

  • 46
    Shares

জাহিদ রহমান : বাংলাদেশের ইতিহাসে ২১ জুলাই একটি কালো দিন। এই দিনে বিশেষ সামরিক আদালতে প্রহসনের এক বিচারে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার বীরউত্তম কর্নেল আবু তাহেরকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরের মাথায় বীরউত্তম তাহেরকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করে এক নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান। এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। তারই নীলনকশা অনুযায়ী অত্যন্ত গোপনে এবং তড়িঘড়ি করে হত্যাকাণ্ড সম্পাদন করা হয়েছিল।

গতকাল বীরউত্তম আবু তাহের হত্যাকাণ্ডের ৪২ বছর পূরণ হয়েছে। বীরউত্তম কর্নেল আবু তাহেরই হলেন প্রথম মুক্তিযোদ্ধা যাকে সুপরিকল্পিতভাবে তারই মুক্ত করা প্রিয় স্বদেশভূমিতে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আবু তাহের ১১ নম্বর সেক্টর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। একাত্তরের ১৪ নভেম্বর ঐতিহাসিক কামালপুরের যুদ্ধে নেতৃত্বদান করার সময় পাকসেনাদের গোলার আঘাতে তিনি মারাত্মক আহত হন। তাঁর আঘাত এতোটাই তীব্র ছিল যে পরবর্তীকালে তাঁর বাম পা কেটে ফেলতে হয়। আর তাই ক্রাচে ভর দিয়েই চলাফেরা করতেন কর্ণেল আবু তাহের। আবু তাহের ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

সাহসী এই অফিসারকে ১৯৬৫ সালে সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপে (কমান্ডো বাহিনী) বদলি করা হয়। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে প্রথমে কাশ্মীর ও পরে শিয়ালকোর্ট রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করে বীরত্বের জন্য তিনি খেতাব লাভ করেন।

১৯৬৯ সালের শেষের দিকে তিনি আমেরিকার ফোর্ট ব্রাগ ও ফোর্ট বেনিং-এ গেরিলা যুদ্ধের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং উচ্চতর সমরবিদ্যায় অনার্স গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন।

১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তানের কোয়েটা স্টাফ কলেজে সিনিয়র ট্যাকটিক্যাল কোর্সে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে স্টাফ কলেজ ত্যাগ করেন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে তিনি মেজর এম এ মঞ্জুর, মেজর জিয়াউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন পাটোয়ারীসহ পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

আবু তাহের ময়মনসিংহ এবং রংপুরের একাংশ নিয়ে গঠিত ১১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার নিয়োজিত হন। ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর আবু তাহেরকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

ঐ বছর জুন মাসে তিনি ৪৪তম ব্রিগেডের অধিনায়ক ও কুমিল্লা সেনানিবাসের অধিনায়কের দায়িত্ব লাভ করেন।

সেনাবাহিনী সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে তৎকালীন সরকারের সাথে মতপার্থক্য হলে ৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল জাসদের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে ফারুক-রশিদের নেতৃত্বাধীন একদল উচ্ছৃঙ্খল ক্ষমতালোভী সামরিক অফিসার। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর সামরিক বাহিনীতে একের পর এক ক্যু এবং পাল্টা ক্যু-এর ঘটনা ঘটতে থাকে।

মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে ক্যান্টনমেন্টে একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে। সর্বশেষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে নিজে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে আবির্ভূত হন। এই ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ক্যান্টনমেন্ট।

এক পর্যায়ে জিয়াউর রহমান বীরউত্তম তাহেরের কাছে এই বলে সাহায্য প্রার্থনা করেন যেনো তাঁকে বাঁচানো হয়। নানা ঘটনা প্রবাহে বীর উত্তম তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাহেরের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সিপাহীরাই জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন।

জিয়া মুক্ত হওয়ার পর তাহেরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করেন। কিন্তু দ্রুতই চোখ উল্টে ফেলেন জিয়াউর রহমান। ক্ষমতা কুক্ষিগত করেই সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এরপর জাসদ নেতৃবৃন্দসহ সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের সাথে জড়িতদের দমনে সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রয়োগ করে।

২১ জুলাই বীর উত্তম তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল গোপন বিচারে এবং প্রচলিত আদালতের বাইরে। অনেকটা তড়িঘড়ি করে এই সাজানো মামলায় রায় ঘোষণা ও তা কার্যকর করা হয়েছিল। লোহার খাঁচায় করে আদালতে আনা হতো অভিযুক্তদের। শুধু এই নয়, সর্বশেষ তাহেরের কবরে পর্যন্ত সেনা পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন তৎকালীন সেনা প্রধান।

বীর উত্তম তাহের ছিলেন আপাদমস্তক দৃঢ়চেতা এক সাহসী মানুষ। এ কারণেই পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ার পরও রাষ্ট্রপতির কাছে তিনি ক্ষমা প্রার্থী না হয়ে বরং উচ্চ কণ্ঠে বলেছিলেন-‘নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনের মূল্যবান সম্পদ আর কিছু নেই’। কোনো অবস্থাতেই তিনি কারো কাছে ক্ষমা প্রার্থী হবেন না। রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য তাহেরের পরিবার এমন কী তার মা আশরাফুন্নেসার পক্ষ থেকে তাহেরকে বারবার অনুরোধ করা হলেও তিনি একবারের জন্যেও সে পথে পা বাড়াননি বরং বরাবরই তিনি নিজের সাহসী সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন অকপটে।

তিনি বলেছিলেন মৃত্যুতে তিনি বিন্দুমাত্র ভয় করেন না, ইতিহাস একদিন তাকে মূল্যায়ন করবেই। আর এ কারণেই বিপ্লবী তাহের দৃঢ়তার সাথে নিজ হাতে ফাঁসির রশি নিজের গলায় পড়ে সারাবিশ্বে মুক্তিকামী মানুষের জন্যে এক অনন্য নজীর স্থাপন করে যান। ফাঁসির আগে তিনি ছিলেন ভীষণ ধীর স্থির এবং শান্ত। তবে শাসকদের প্রতি তাঁর ঘৃণাটা ছিল মারাত্মক।

কর্নেল তাহের এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়তে- যেখানে শ্রেণীবিভেদ থাকবে না। এ কারণে ব্যক্তিগত ভোগবিলাসের দিকে তিনি কখনই ধাবিত হননি। সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগও করেছিলেন তাঁর নিজস্ব দর্শন নিয়ে। সেনাবাহিনীকে তিনি পিপলস আর্মির আদলে গড়তে চেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর যোগ দেওয়াটাও ছিল অসাধারণ এক সাহসের বহিঃপ্রকাশ।

৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর বীর উত্তম তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু গ্রেপ্তারের আগে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তারের আগের দিন জাসদ সভাপতি মেজর (অব.) এম এ জলিল, সাধারণ সম্পাদক আসম আব্দুর রব, ড. আখলাকুর রহমান, হাসানুল হক ইনুসহ অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়।

জাসদের বর্তমান সভাপতি এবং বীর উত্তম তাহেরর অন্যতম সহযোগী হাসানুল হক ইনু তাহেরের গোপন বিচার প্রসঙ্গে লিখেছেন-কর্নেল তাহের গ্রেপ্তার হওয়ার সাতমাস পর ১৯৭৬ সালের ১৪ জুন প্রধান সামরিকআইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ‘বিশেষ সামরিক আইন আদালত বিধি ১৯৭৬’ অধ্যাদেশ জারি করে এবং ওই দিনই ‘এক অধ্যাদেশ বলে এক নম্বর বিশেষ সামরিক আইন’ গঠন করা হয়।

এ ধরনের আদালতের বিচারকদের বিচার বিভাগ থেকে নেওয়া হয়ে থাকলেও এখানে বিচার বিভাগ থেকে কাউকেই নেওয়া হয়নি। পাঁচজন বিচারকের তিনজনই ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর। কর্নেল ইউসুফ হায়দার, চেয়ারম্যান হিসেবে আর উইং কমান্ডার আব্দুর রশিদ ও নৌবাহিনীর কমান্ডার সিদ্দিক আহমেদ সদস্য হিসেবে। বাকি দুজন ছিলেন তৎকালীন সামরিক সরকার প্রশাসনের ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তরের প্রথম শ্রেণীর দুই ম্যাজিস্ট্রেট যথাক্রমে আব্দুল আলী ও হাসান মোর্শেদ।

কর্নেল তাহের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বহুদিন ধরেই মানুষ এক অন্ধকারের মধ্যে পতিত ছিল। কিন্তু এটি স্পষ্ট হয় ২০১১ সালের ২২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট যে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন সেই রায়ে বলা হয়েছিল-এই মৃত্যৃদন্ডাদেশ স্পষ্টতই সামরিক জান্তার বন্দুকের নল থেকে উৎসারিত স্বেচ্ছাচারী আইনের বল প্রয়োগ। ঠাণ্ডা মাথায় মাথায় খুন ছাড়া এই রায়কে আর কী বলা যায়।’ এই রায়ের আগে অন্যতম সাক্ষী হয়ে এসেছিলেন মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুলজ। যিনি গোপন বিচারের অন্যতম এক প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

বীর উত্তম কর্নেল তাহের এখনও কতোটা প্রাসঙ্গিক? অনেকেই মনে করেন বীরের মতো জীবনদানকারী প্রকৃত দেশপ্রেমিক এই বিপ্লবীর মৃত্যু নেই। মৃত্যু পর্যন্ত সৎ নির্লোভ থেকে দেখিয়ে গেছেন সাহসী পথ। মর্যাদার প্রশ্নে হার মানেননি কোনো বিশ্বাসঘাতকের কাছে।


  • 46
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]