তীব্র গরমে বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগী


কড়া রোদ আর তীব্র গরমে বিভিন্ন হাসপাতালে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট রোগীরা সংখ্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, শীতে যেমন শ্বাসকষ্ট হয়, তীব্র গরমেও এ সমস্যা হতে পারে। এ কারণে রোগীদের গরম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। মো. আব্দুল কুদ্দুস (৪০) চাঁদপুর জেলার বাসিন্দা। গত ১০ বছর আগে তার হার্টে রিং পরানো হয়। এরপর থেকে তিনি ফলোয়াপে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা পেয়ে এখন সুস্থ আছেন। শুধু তিনি নয় তার মতো অনেক রোগী হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের কাছে গড়ে প্রতিদিন ১৫০-২০০ শ্বাসকষ্টের রোগী আসছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরেও শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা অসংখ্য। তবে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বরত কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নভেম্বর থেকে জানুয়ারিতে সাধারণতে রোগীদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয়। তখন আমরা ডাটা সংগ্রহ করি। কিন্তু গরমকালে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয় এবং কত রোগী এর কারণে চিকিৎসা নিচ্ছে এমন কোনও ডাটা আমাদের কাছে নেই।’
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর শাহেদুর রহমান খান ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন রোগীর শ্বাস স্বাভাবিক থাকার জন্য টেম্পারেচার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা অ্যাজমার রোগী, তাদের ক্ষেত্রে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াম টেম্পারেচারের ডিফারেন্স হলেই অ্যাজমার অ্যাটাক হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন যে তাপমাত্রা এতে দেখা যায় দিনের একটা ভাগে ঠাণ্ডা থাকছে, আবার অন্যসময় অনেক গরম। এছাড়া অত্যাধিক গরম, ঠাণ্ডা এগুলোতে বিভিন্ন ভাইরাস ঘুরে বেড়ায়। যার কারণে ইনফেকশন হয়। সঙ্গে সর্দি, কাশি এগুলোও হয়। অনেকে ভোগেন শ্বাসকষ্টে।’ শাহেদুর রহমান বলেন, ‘শ্বাসকষ্ট শুধু ঢাকার মানুষের হচ্ছে তা না, গ্রামেও এয়ার পলুশন হচ্ছে। গ্রামের রোগীও আমরা পাচ্ছি। আমাদের সেন্টারে সারাদেশ থেকে রোগী আসে। এয়ার পলুশনের জন্য এই রোগের প্রকোপ বেশি হয়। আবহাওয়া যেহেতু খুবই গরম এই গরমের কারণে অনেকের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।’

চিকিৎসা প্রসঙ্গে শাহেদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এখানে আউটডোরে ৬শ থেকে ৭শ রোগী প্রতি দিন আসে। এরমধ্যে শ্বাসকষ্টের রোগী আসে প্রায় দুইশর মতো। আমাদের অ্যাজমা সেন্টারে মোট বেড হচ্ছে ৭০টি। এরমধ্যে সবগুলো বেডে এখন রোগী আছে। আমাদের হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ আছে। এই রোগের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত এন্টিবায়োটিক আছে। আমাদের ইনহেলার যেগুলো দামি সেগুলো সরকার দিতে পারে না। সব মিলিয়ে সব ধরনের ওষুধ আছে। যারা ভর্তি হয় তাদের কোনও ওষুধ কিনতে হয় না। আমরা সব ওষুধ দিয়ে থাকি।’

বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গরমকালে শ্বাসকষ্টের করণ, কিছু এলার্জেন্ট আমাদের পরিবেশে থাকে। একেকজনের জন্য এটা সংবেদনশীল। যার অ্যাজমা গরমকালের এলার্জেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত তার শ্বাসকষ্ট হবে। অন্যজনের হয়ত শীতকালে সমস্যা হয়। এটা রোগীর সংবেদনশীলতার ওপর নির্ভর করে। গরমের আদ্রতার সঙ্গে শ্বাসতন্ত্রের সম্পর্ক আছে। যত আদ্রতা বেশি হবে শ্বাসনালী ততো বেশি সংবেদনশীল থাকে। আদ্রতা বেশি হলে মাইট (জীবাণু) বেশি হয়। এরা অ্যাজমা রোগীর শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দেয়।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্বাসকষ্ট শীতকালীন রোগ। কিন্তু এখন প্রচুর কার্ডিয়াক রোগী পাচ্ছি যারা গরমকালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে আমাদের এখানে ভর্তি হচ্ছে। এটার প্রধান কারণ আমরা মনে করছি, বায়ু দূষণ। প্রাণীরা কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়ে আর গাছ তা গ্রহণ করে এবং প্রাণীরা গাছের ছাড়া কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে, আমরা ছোটবেলা থেকেই এটা সবাই জানি। কিন্তু এখন গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব আমরা এখন সরাসরি রোগীদের ওপর দেখতে পাচ্ছি।’

প্রতিকার প্রসঙ্গে ডা. হারিসুল হক বলেন, ‘একটি দেশের যতটুকু বনভূমি থাকা দরকার সেটা যদি আমরা আনতে না পারি অন্তত লিমিটেড অবস্থায় যেতে না পারি তাহলে এই ধরনের রোগীর সংখ্যা আগামীতে আরও বাড়বে। তাই একজন চিকিৎসক হিসেবে এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য অবশ্যই গাছ লাগানোর ওপর জোর দেবো।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালগুলো সবসময় সব ধরনের রোগী সামলানোর জন্য রেডি থাকে। এখন গরমের কারণে ডায়রিয়া হচ্ছে। আমরা পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। আর যে সমস্ত এলাকায় এই ধরণের রোগী হচ্ছে আমরা সেখানে মাইকিং করছি। যারা যারা আমাদের প্রচারের সঙ্গে যুক্ত, যারা সংক্রামক রোগ দেখেন তাদের সঙ্গে শনিবার মিটিং করবো। ’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন রোজার মাসে আমাদের স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের খাবারগুলো পরিদর্শন করতে বলেছি। মানুষের জন্য আমাদের যেটা পরামর্শ, যেহেতু একইসঙ্গে রোজা এবং গরম। গরম লাগতে পারে আবার ঠাণ্ডাও লাগতে পারে। তারা যেন প্রখর রোদ এভয়েড করে। রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। গরমে শরীরে ঘাম হলে কাপড় দিয়ে মুছে গা শুকাতে হবে। আর পানির সঙ্গে লবন মিশিয়ে যদি খাওয়া যায় তাও ভালো।’


বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।