নায়ক সুজন!

  • 29
    Shares

চারপাশে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের মানুষ। তাদের আচরণ বা দৈহিক পার্থক্যও বিস্তর। কিন্তু সাবাই চায় একটু ভালোভাবে বাঁচতে-দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে। কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধতায় সবাই কি পারে সমানভাবে সুখি ও নির্ভাবনার জীবন অতিবাহিত করতে? এত কোটি মানুষের মাঝে পাশের মানুষটিকে কেউ কি দেখি মানুষের চোখে? এমন অনেক জীবনের ইতিহাস রয়ে গেছে না দেখার অন্তরালে। চলতে চলতে জীবন থেকে নেওয়া সেই পাঁচালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন গল্পকার ও সাংবাদিক বিধান সরকার। আজ পড়ুন-দশম পর্ব।

চেহারায় ওয়েস্টার্ন একটা ভাব। হাসিতে চোখের কোনে ভাঁজ আর অবয়বের রেখা একটু ভিন্নতা পায়। এমন উপলব্ধি যেন নিজ থেকেও। তাইতো চুলে ক্লিপ আর আলাদা কাপড় ঝোলানো গলাবন্ধনী ওয়েস্টার্ন হিরোর পুরোটাই মর্যাদা যোগায়। চোখ ঠিকরে দূরের দ্যুতি, ভ্রুযুগল যেন চলন বলন সময়ের জন্য আলাদা মাত্রা পায়। অর্থাৎ অবস্থাদৃষ্টে কাউবয় কালচারের সাথে বেশ যায়। তা এই চোখ যখন আকুতি করে, স্টাইল তখন ফিকে হয়ে আসে!

এই কোয়েশ্চেনের একটাই উত্তর- পেটের তাগিদ। এই তাগিদেই ঘর ছাড়া, যত্ন বিহীন ছন্নছড়া। পোষাক একটাই। স্নানাদি সাড়তে হয় জন্মদিনের পোশাকে। ভাবতে লজ্জাবোধ হয়; বয়সতো কম হয়নি তেরো পেড়িয়েছে। অভাব কুরে খায় লজ্জাকে। তবে এই ইদে একটা পাঞ্জাবী কিনেছে পঞ্চাশ টাকায় ঢাকা থেকে। এই হলো ম্যানলি হিরো মো. সুজন।

বাড়ি চাঁদপুর শহর কালিবাড়ি স্টেশন সংলগ্ন। বাবা শাহা আলম রিক্সা চালান। সুজনের বয়স যখন দশ তখন ওর মা শেফালী বেগমের মৃত্যু হয়। সুজনের বোন আঁখি ওরফে তাজুর বয়স আরো কম। অমনি সময়ের কোন একদিন শাহা আলম ফের বিয়ে করেন। পড়ালেখায় ইস্তফা, কামাই না করে ঘুরেফিরে চলা এগুলো সৎ মা সহ্য করেন কি? নিজ থেকে প্রশ্ন তুলেই বর্ণনা করে, সৎ মায়ের হাতে মার খেয়ে অবশেষে ঘর ছেড়ে ঢাকায় পলায়ন। বাবা, ছোট বোন তাজুর কথা খুউব করে মনে পড়েছিল; পাছে সৎ মায়ের অত্যাচার তা ভুলিয়ে দিয়েছে। আচ্ছা সৎ মায়েরা অমন হয় ক্যা!
অস্ফুষ্ট অমন প্রশ্নের বিপরীতে বলেছিলেম-তুমি জোর বা প্রতিরোধ গড়োনি ক্যানো?

জবাবা আসে-আরে না,মুরুব্বীদের সাথে বেয়াদবী করতে হয় না। তাইতো ঘর ছেড়ে ঢাকা সদর ঘাটে আইসা পড়লাম। এখানে বুলেট ভাইয়ের সাথে পরিচয়। তিনি বললেন, সকালে আর বিকেলে হাত খরচা পঞ্চাশ টাকা করে আর দুপুরে পাবা ভাত পেটপুরে, কবরা আমার সাথে কাজ? এই কাজ হলো লঞ্চে জল বিক্রি করা। মাস খানিক করার পর জমানো পাওনা টাকা চাইতে গেলে বুলেট টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর সেখান থেকে সরাসরি লঞ্চযোগে কোন একদিন বরিশালে।

বরিশালে এসেও একই অবস্থা। তবে ক’দিন ঘোরাফেরা করতে হয়েছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ আর পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য। এগুলো সুজনেরি বক্তব্য। এখানে এমনি হয়। এমনিতে জায়গা পাওয়া খুউব দুস্কর হয়। সিনিয়রদের মারধর বা খিস্তিখেউড় শুনতে হয়। কখনোবা ফাই ফরমাশ মানতে হয়। এর মধ্যদিয়ে দিন গুজরান করে নিজেই একদিন আপনার রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে নেয়। সুজনের চলমান দিনগুলো বেশ কাটছে। কুমিল্লা এলাকার আরেক বন্ধুকে জুটিয়ে নিয়েছে। গায়ের রংটা উজ্জ্বল আর চলন বলনে একটা হিরো হিরো ভাব বলে পারিপাশির্^ক অবস্থায় খুউব একটা খারাপ নেই। নদী বন্দরে শুয়ে থাকে ইচ্ছে মত। তবে রাতে মশায় জ¦ালতন করে বটে। লঞ্চে জল বিক্রি করে রোজগার ভালো হলে বা গ্যাটে টাকা থাকলে মশা তাড়াবার কয়েল কিনে নেয়।

সেদিনের কথোপকথনে বাড়ির কথা জানতে চাইলে সুজনের চোখে যেন ঝিলিক তোলে বটে, তবে খানিকটা পর বদনখানি মলিন হয়ে ওঠে। এই রাজ্যে বা এই পৃথিবীতে এমন লাখো কোটি সুজন আছে। একদা মহারাষ্ট্রের পুনের এক বালুর মাঠে পলিথিনের ডেরায় দেখা হয়েছিল শিশু ওসমানের। সামনের কোন স্বপ্ন ওর জানা নেই। তখন ওই টুকোই জানতো,দল যেথায় যাবে সেথায় তার গন্তব্য।

 

সুজনের সাথে ওসমানের চেহারায় মিল থাকায় অপ্রসাঙ্গিক কথা ঢুকে পড়েছে বটে। সুজন বাড়ি যায়, দুই কি তিন মাস পর পর। পানি বিক্রি করে যখন তিন থেকে চার হাজার টাকা জমাতে পারে। ছোট বোন আঁখি আর বাবার টানে। আঁখি চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। বোনের পড়ার খরচ আর বাবার প্রতি দরদ থাকায় জমানো টাকা বাবার হাতে তুলে দেয়।

তা এমনি করে ক’দিন চলবে, সামনের দিনের কোন পরিকল্পনার প্রশ্ন তুলতে সুজনের জবাব-মঠবাড়িয়া উপজেলার তুষখালীতে তার নানার বাড়ি। ছোট বেলায় বার দু’য়েক গিয়েছিল মায়ের সাথে।

একবার টাকা জমিয়ে নানা বাড়ি যাবে। সেখানে ফার্নিচারের দোকান বা গ্যারেজে কাজ নিবে। এরপর অর্থ কড়ি জমিয়ে বাড়ি করবে। তারপর এমন প্রশ্নের সাথে একটু গোপন হাসি থাকায় বুঝতে পেয়ে সুজনও শক্ত চোয়াল প্রশস্ত কালে টোল পরা গালে লাজুক ভাবে স্থান ছাড়ে। যেখানে নায়ক হবার ইচ্ছে জানাতে চাওয়া প্রশ্নের উত্তর ঢাকা পরে।

বিধান সরকার/০৭.০২.২১


  • 29
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]