নয়ন মুদলে মায়ের মুখ ভেসে ওঠে

  • 60
    Shares

চারপাশে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের মানুষ। তাদের আচরণ বা দৈহিক পার্থক্যও বিস্তর। কিন্তু সাবাই চায় একটু ভালোভাবে বাঁচতে-দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে। কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধতায় সবাই কি পারে সমানভাবে সুখি ও নির্ভাবনার জীবন অতিবাহিত করতে? এত কোটি মানুষের মাঝে পাশের মানুষটিকে কেউ কি দেখি মানুষের চোখে? এমন অনেক জীবনের ইতিহাস রয়ে গেছে না দেখার অন্তরালে। চলতে চলতে জীবন থেকে নেওয়া সেই পাঁচালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন গল্পকার ও সাংবাদিক বিধান সরকার। আজ পড়ুন-পঞ্চম পর্ব

মায়ের কথা মনে নেই। তবে ছবি দেখেছে। ওই মুখ এখন ভাবনায় আসে ঘুমোতে গেলেই। তখন সবে পাঁচ বছর বয়স। মা নাছিমা বেগম দুই শিশু সন্তান রেখে গত হন। ওরপরই বাবা হোসেন মল্লিক বিয়ে করে সংসার পাতেন নতুন শ্বশুড় বাড়িতে। আর রাব্বি ও তার চেয়ে চার বছরের বড় ভাই ফেরদৌসের কঠিন জীবনের যাত্রা শুরু হয়। অবাক করা চাহনিতে ভাবনার মিশেল। কিছু একটা করতে চায় বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গীবাড়ি ইউনিয়নের নরকাঠি গ্রামের মল্লিক বাড়ির সন্তান রাব্বি মল্লিক(১৪)।

প্রচন্ড ঝড়ো বৃষ্টিতে সেদিন আটকে গিয়েছিলাম লাহারহাট ফেরিঘাটে। টোল আদায় ঘরে আশ্রয় নিতে দেখা হয় রাব্বির সাথে। ওখানেই কথা বলে জানতে পাই জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো থেকে ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনার কথা। পাঁচ বছর বয়সে মাতৃ বিয়োগের পর দুই ভাইয়ের ঠাঁই হয় চাচা মজনু মল্লিকের কাছে। চাচার ফরমাশ অনুযায়ী তার দোকানে কাজ মেলে। এজন্য বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি কখনোই। বড় ভাইকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকাতে। আর সাত বছর রয়সে রাব্বিকে পঠানো হয় লঞ্চে চায়ের দোকানীকে সহায়তা করতে। তিন বছর কাজ করার পর ফের চাচার দোকানে ফিরে আসা। এখন রমজান মাস, দোকানে বিকিকিনি কম। তাই রাব্বি দেহাতের বাড়ি সংলগ্ন লাহারহাটে ফিরে কাজ নিয়েছে হোটেলে। দুবেলা খাওয়ন আর পাঁচ হাজার টাকা বেতন।

মায়ের স্মৃতি কথা তুলতেই কিছুটা আনমনা হয়ে যায় রাব্বি। মায়ের কথা মনে নেই কেবল একখানি ছবি ছাড়া। তবুও বেশ ভাবায় মা। সারাদিন কাজ শেষে রাতে ঘুমোতে গেলেই মায়ের মুখখানি ভেসে ওঠে মানসপটে। মা আমার ফিরবেনা আর এই ভুবনে। একটু দম নিয়ে বলে,নানা বাড়ি নলছিটিতে। মা মারা যাওয়ার পর আর ওবাড়ি যাওয়া হয়নি। মামা আর খালারাও আসেনি, কখনো খোঁজও নেয়নি ওরা দুই ভাই কেমন আছে, কি অবস্থায় বেড়ে উঠছে। বাবা বিয়ে করে সংসার পাতলো। বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করে। সেখানে গেলে সৎ মা গালাগালি করে। বাবাও কিছু বলতে পারেন না। তাই সকালে গেলে ফের বিকেলে চলে আসে। বাবা কদাচিৎ বাড়ি এলে দেখা মিলে। সহজ কথায় স্নেহ বঞ্চিত হয়ে বেড়ে ওঠা। কত কিছুই না ইচ্ছে করে। বাবার কাছে আব্দার করবে সে সুযোগ কই রাব্বির। এই করেই বাস্তবতা তাকে হিসেবী করে তুলেছে। বড় ভাই রাজধানীতে ছাপাখানায় কাজ করে। ওর সাথে দেখা নেই অনেক দিন। ওখানে কাজ নেই বলে এখানেই থাকতে বলেছে বড় ভাই ফেরদৌস মল্লিক।

কাজ থেকে পাওয়া টাকায় রাব্বি কি করে এই কথার উত্তরে জানায়, বাড়িতে বৃদ্ধ দাদী রয়েছে। তার খরচ জোগান আর জমি নিয়ে মামলা চলায় চাচাকে খরচা দিতে হয়। নতুবা জমি ফিরে পেলে চাচা যদি প্রশ্ন তোলেন খরচ দাওনি তো জমির দাবী করো কিভাবে? দশ বছর আগে ওর চাচা বিদেশ যাবে বলে জমির দলিল বন্ধক রেখে এক লাখ বিশ হাজার টাকা ধার এনেছিল। এতে করে অনেক জমি বেহাত হয়েছে। এখন বাড়ির বলতে ৫২ শতক জমি রয়েছে। সেথেকেও বুঝ পেয়েছে মাত্র ২৬ শতকের। প্রতিপক্ষরা সাত ভাই আবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তাও পান। তাই জমি উদ্ধারে মামলার দারস্থ হতে হয়েছে রাব্বিদের।

ইচ্ছের কথায় অকপটে বলে, গরীব মানুষ, পড়ালেখা করতে পারিনি তাই চাকুরীতো আর করতে পাবোনা। ঈদের পর ইচ্ছে আছে স্পীডবোট চালানো শেখার। একলোক বলেছে, তার সাথে থেকে তিন মাস প্রশিক্ষন পেলেই পরে চাকুরী মিলবে। মাসে দশ থেকে বারো হাজার টাকা মাইনে পাবে। এই করেই সামনের দিনে যদিবা ভালো থাকা যায়, এমন ভাবনা রাব্বির মনে ঘুরপাক খায়।


  • 60
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]