পাঁচ আসামীর জবানবন্দীতে রিফাত হত্যার লোমহর্ষক ব্যাখা

  • 69
    Shares

বরগুনা সরকারি কলেজ এলাকায় স্ত্রী মিন্নির সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয় শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে। লোমহর্ষক এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় রিফাতের। এ হত্যাকাণ্ড তদন্ত করে এরই মধ্যে ২৪ জনকে আসামি করে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে।

আসামিদের মধ্যে ১৫ জন বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ আসামির জবানবন্দির কপি কালের কণ্ঠ’র হাতে এসেছে। তাঁদের জবানবন্দিতে হামলার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, হামলা ও পালিয়ে যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে।

মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মামলার অন্যতম আসামি আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন (২১) তাঁর জবানবন্দিতে বলেছেন, হামলার আগের দিন রাতে নয়ন তাঁকে ফোন করে বলেন, ‘কোনো প্রশ্ন করবা না। কাল সকাল ৯টার মধ্যে কলেজে থাকবা। সার্কাস দেখাব।’

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। বিকেলে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

এ মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিও আসামি। হাইকোর্টের আদেশে জামিনে আছেন তিনি। আসামিদের মধ্যে মুসা এখনো পলাতক।

রাব্বি আকনকে গত ১১ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বরগুনার কেওড়াবুনিয়া এলাকার আবুল কালাম আকনের ছেলে। ১৮ জুলাই তিনি জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে রাব্বি বলেন, তিনি নয়ন বন্ডের মেসেঞ্জার গ্রুপের ‘বন্ড ০০৭’-এর সদস্য। আগে থেকেই নয়নের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। তিনি বরগুনা সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র। সেই সুবাদে মিন্নির সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল।

রাব্বি আরো বলেন, ২৬ জুন সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে তিনি বাসা থেকে বের হন। রিফাত ফরাজীকে ফোন দিয়ে তিনি কোথায় আছেন জানতে চান। রিফাত ফরাজী তাঁকে কলেজে আসতে বলেন। ৮-১০ মিনিট পরে রিফাত ফরাজীকে আবার ফোন দিলে তিনি কলেজে আসছেন বলে জানান, তাঁকেও যেতে বলেন। সোয়া ৯টার দিকে রাব্বি কলেজে যান। রিফাত ফরাজীকে আবারও ফোন দেন। এরপর রিফাত ফরাজী কলেজে আসেন। এ সময় রিফাত হাওলাদারও আসেন। মিন্নিও আসেন এবং রিফাত ফরাজীকে বলেন, ‘ওকি ভাইটু। রিফাত শরীফকে মারার জন্য খালি হাতে কেন?’ রিফাত ফরাজী বলেন, ‘খালি হাতই যথেষ্ট।’ মিন্নি নয়নের কথাও জিজ্ঞাসা করেন। পরে একটু দূরে গিয়ে কথা বলেন মিন্নি। তাঁদের বলে যান, ‘একটু প্ল্যান করে আসি’।

রাব্বি আকন জবানবন্দিতে বলেছেন, সকাল ১০টার দিকে রিফাত শরীফ কলেজে ঢোকেন। ওই সময় রিফাত ফরাজী ও রিফাত হাওলাদার ফোনে কথা বলেন। এরপর তাঁরা তিনজন কলেজ থেকে বের হয়ে যান। বের হওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে চন্দন, হাসান, টিকটক হ্নদয় মিলিত হন। তাঁরা ক্যালিক্স একাডেমির মোড়ে যান। আরেক আসামি সিফাতও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে সবাই কলেজের ফটকের দিকে যান। কলেজ থেকে বের হয়ে রিফাত শরীফ মিন্নিকে মোটরসাইকেলে উঠতে বলেন। কিন্তু মিন্নি উঠতে চান না। দুজনের মধ্যে বাগিবতণ্ডা হয়। এ সময় রিফাত ফরাজীর ভাই রিশান ফরাজী, তানভীর, নাঈম, চন্দন, সিফাত ও হাসান আসেন। রিশান ফরাজী এ সময় রিফাতকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি আমার মা-বাবাকে গালি দিয়েছ কেন।’ রিফাত শরীফ বলেন, ‘আমি গালি দিই নাই।’ এরপর রিফাত ফরাজী এসে রিফাত শরীফকে বলেন, ‘নেতা হয়ে গেছ।’ এ কথা বলেই মারধর শুরু করেন।

রাব্বি বলেছেন, রিফাত ফরাজী মারধর শুরু করার পর তিনি, চন্দন, নাঈম, রায়হান, টিকটক হ্নদয়, নাজমুল, সিফাত, রিফাত হাওলাদারও রিফাত শরীফকে মারেন। একপর্যায়ে রিফাত শরীফকে টেনেহিঁচড়ে ক্যালিক্সের মোড়ে নিয়ে যান তাঁরা। মিন্নিও সঙ্গে সঙ্গে আসেন। সেখানে নয়ন এসে হামলায় যোগ দেন। একপর্যায়ে রিফাত ফরাজী দুটি দা ও টিকটক হৃদয় লাঠি নিয়ে আসেন। পরে রিফাত ফরাজী ও নয়ন দা দিয়ে রিফাত শরীফকে কোপাতে শুরু করেন। আর রিফাত ফরাজীর নির্দেশ অনুযায়ী বাকিরা পাহারা দেন। রিফাত শরীফ যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন সে জন্য বাকি সবাই তাঁকে ঘিরে দাঁড়ান।

উল্লেখ্য, রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে মিন্নির জড়িয়ে থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি। তাঁর পরিবারের দাবি, মিন্নি ষড়যন্ত্রের শিকার।

ঘটনার আগে পরিকল্পনা

ঘটনার পরদিন গ্রেপ্তার হন অভিযোগপত্রভুক্ত পাঁচ নম্বর আসামি মো. হাসান (১৯)। তিনি বরগুনা কলেজ রোডের বাসিন্দা মো. আয়নাল হকের ছেলে। হাসান ওই কলেজ থেকে চলতি বছরই এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ঘটনার পরদিন তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৪ জুলাই তিনি জবানবন্দি দেন।

হাসান বলেছেন, ওই দিন সকাল ৯টার দিকে তিনি কলেজে যান এবং রাব্বি আকন ও রিফাত ফরাজীকে দেখেন। রিফাত ফরাজী তাঁকে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘একটু পরে কলেজ গেটে থাকবি। রিফাত শরীফকে মারব। তোরা আশপাশে থাকবি যাতে রিফাত শরীফ পালাতে না পারে।’

হাসান জবানবন্দিতে আরো বলেন, সকাল ১০টার একটু পরে তিনি ও আরো কয়েকজন কলেজ গেটের সামনের রাস্তায় ছগীরের দোকানের সামনে অবস্থান নেন। রাব্বি আকন ও রিফাত ফরাজী তাঁদের অবস্থান বুঝিয়ে দিয়ে ক্যালিক্স একাডেমির সামনে যান। তিনি তাঁর অবস্থানে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে পান, তাঁদের বাড়ির রাস্তার সামনে রিশান ফরাজী, তানভীর বন্ড ও রায়হান দাঁড়িয়ে আছেন। আর ক্যালিক্স একাডেমির সামনে সিফাত, টিকটক হৃদয়, রিফাত হাওলাদার ও রিফাত ফরাজী পরিকল্পনা করছেন। কিছুক্ষণ পরে মিন্নি ও রিফাত শরীফ কলেজ থেকে বের হন। সঙ্গে সঙ্গে রিশান, রায়হান, তানভীর, রিফাত ফরাজী, রাব্বি আকন, টিকটক হৃদয় ও সিফাত কলেজ গেটে আসেন। তাঁরা রিফাত শরীফকে মারতে শুরু করেন।

হাসান আদালতকে বলেছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামি অলি একটি ব্যাগে করে দা নিয়ে আসে। ব্যাগটি রাস্তার পাশের একটি টিনের চালে রাখা হয়। রিফাত ফরাজী, টিকটক হৃদয় ও সিফাত ওই ব্যাগ থেকে দুটি দা নিয়ে আসেন। এরপর রিফাত ফরাজী ও নয়ন দা দিয়ে রিফাত শরীফকে কোপান।

রিফাত ফরাজীই প্রথম মারধর শুরু করেন

নয়ন বন্ডকে অব্যাহতি সুপারিশ করে অভিযোগপত্রে মো. রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজীকে (২৩) প্রধান আসামি করা হয়েছে। তিনি বরগুনা শহরের ধানসিঁড়ি সড়কের দুলাল ফরাজীর ছেলে। গত ২১ জুলাই আদালতে জবানবন্দি দিয়ে রিফাত ফরাজী জানান, নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নিকে নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন রিফাত শরীফ। তাঁর পরিবার নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কটূক্তি করেন রিফাত শরীফ। এ জন্য তিনিও ক্ষিপ্ত ছিলেন। ঘটনার আগের দিন নয়নের সঙ্গে কথা হয় তাঁর।

জবানবন্দিতে রিফাত ফরাজী বলেছেন, তিনিই প্রথম রিফাত শরীফকে মারধর শুরু করেন। পরে দা দিয়ে কোপানোর কথাও স্বীকার করেছেন তিনি।

কেওড়াবুনিয়ায় পনু চেয়ারম্যানের ঘেরে আশ্রয় নেন ৫ জন

আসামি কামরুল হাসান সায়মুনকে (২১) গ্রেপ্তার করা হয় ৩০ জুন। ১৫ জুলাই তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সায়মুন বরগুনা সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট (অনার্স) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বরগুনা কড়াইতলা স্টাফ কোয়ার্টারের কায়সার আহম্মেদ লিটনের ছেলে তিনি।

জবানবন্দিতে সায়মুন বলেন, নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রাব্বি আকনের সঙ্গে কলেজে পড়ার সময় তাঁর বন্ধুত্ব হয়। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগে তাঁকে মেসেঞ্জার গ্রুপ ‘বন্ড ০০৭’-এর সঙ্গে যুক্ত করেন রাব্বি। হত্যাকাণ্ডের দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বরগুনার গার্লস স্কুল রোডে পার্থ স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যান। তিনি বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় রিফাত ফরাজী তাঁকে ফোন করেন এবং মোটরসাইকেল নিয়ে ধানসিঁড়ি তিন রাস্তার মোড়ে যেতে বলেন।

সায়মুন আদালতকে জানান, তিনি তাঁর মোটরসাইকেল নিয়ে ধানসিঁড়ি মোড়ে যান। সেখানে রিফাত ফরাজীকে না পেয়ে তাঁকে ফোন করেন। তখন রিফাত ফরাজী তাঁকে ক্রোক স্লুইজে যেতে বলেন। সেখানে যাওয়ার পর তানভীর রাস্তায় থামার জন্য তাঁকে ইশারা করেন। ওই সময় পাশের পুকুরসংলগ্ন বাগান থেকে নয়ন, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী বের হয়ে আসেন। তাঁকে মোটরসাইকেলটি দিতে বলেন তাঁরা। তিনি মোটরসাইকেলের চাবি দিয়ে দেন। রিফাত, রিশান ও নয়ন মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যান। পরে অন্য পথে তিনিও কেওড়াবুনিয়া যান। সেখানে পনু চেয়ারম্যানের ঘেরে গিয়ে দেখেন নয়ন, রিফাত ফরাজী, রাব্বি আকন, রিশাত ফরাজী ও জিহাদ বসে আছেন। তাঁরা তাঁকে মোটরসাইকেল ফেরত দিলে তিনি বাড়ি চলে আসেন।

রাব্বির বাসায় পালিয়ে ছিলেন সিফাত

আরেক আসামি রাফিউল ইসলাম রাব্বি (২০) বরগুনা উরবুনিয়া গ্রামের আবদুর রহমান নান্নার ছেলে। তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জের সাউদার্ন সিটি কলেজের ছাত্র। এ বছরই এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। গত ১ জুলাই রাব্বিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১০ জুলাই তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

রাব্বি আদালতকে বলেন, হামলার দিন সকাল থেকেই তিনি বাড়িতে ছিলেন। বিকেল ৪টার দিকে তিনি স্থানীয় বাজারে যান এবং সেখানে অন্য ছেলেদের মোবাইল ফোনে তিনি রিফাত শরীফকে কোপানোর ভিডিও দেখেন। এরপর নিজের মোবাইল ফোনেও দেখেন। আসামি মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯) তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে চলাফেরা করতেন সিফাত। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সিফাত ফোন করে তাঁকে বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হতে বলেন। তিনি বের হয়ে দেখেন একটি মোটরসাইকেলে সিফাতকে কেউ একজন নামিয়ে দিয়ে গেছে। এ সময় তাঁকে খুব নার্ভাস দেখাচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ করলে সিফাত জানান, নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী, রিশান ফরাজীরা রিফাত শরীফকে কুপিয়ে খুন করেছেন। এ জন্য এলাকা গরম। তাই তিনি রাতে তাঁর বাড়িতে থাকবেন। পরদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সিফাত লেবুখালীতে তাঁর বাবার কাছে চলে যান।


  • 69
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]