প্রাথমিকে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণে আরও একধাপ অগ্রগতি

  • 114
    Shares

এস.এম অজিয়র রহমান : প্রাথমিক শিক্ষায় গত কয়েক বছরে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর শুরুটা হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই। ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করেছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের গৃহীত আরো পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে তিন দফার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি।

এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই রঙিন বই তুলে দেয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, অনগ্রসর এলাকায় স্কুল ফিডিং চালু, সরকারি বিদ্যালয়ে দপ্তরি-কাম-প্রহরী নিয়োগ, স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টিসহ প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু, পুল শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী প্রায় শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সমতা আনা, নতুন শিক্ষাক্রমে নতুন পাঠ্যবই, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু, অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি)-২০৩০ এর লক্ষ্যমাত্রা-০৪ এ টেকসই, গুণগত মানসম্পন্ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের লক্ষ্যে শিক্ষায় ডিজিটালাইজেশন ও তথ্য- প্রযুক্তির সমন্বয়ে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করছে। আর শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই এ ডিজিটালাইজেশনের বিষয়ে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক শিক্ষার ডিজিটালাইজেশনের দুইটি দিক রয়েছে; প্রথমত: প্রাথমিক শিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া তথা ডিজিটাল ক্লাসরুম এর ব্যবহার, এবং দ্বিতীয়ত: প্রাথমিক শিক্ষা কন্টেন্ট ইন্টারএ্যাক্টিভ মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল ভার্সনে রুপান্তরকরণ। প্রাথমিক শিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া তথা ডিজিটাল ক্লাসরুম এর ব্যবহারের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য রয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিতকরণে শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো এবং শ্রেণি কার্যক্রমে অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের মতো প্রযুক্তিকেও একটি শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করবে।

এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে যুগোপযোগী কর্মপদ্ধতি। কম্পিউটার শিক্ষা বা ল্যাবভিত্তিক বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে তথ্য-প্রযুক্তিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে কাজে লাগানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে কম্পিউটার বা অন্যান্য তথ্য-প্রযুক্তি, ব্ল্যাকবোর্ডের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে ব্যবহৃত একটি আধুনিক শিক্ষা উপকরণ হিসেবে কাজ করছে। এ লক্ষে সরকারের তরফ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট মডেম ও স্পীকারের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এ শ্রেণি কক্ষকেই বলা হচ্ছে ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম’। প্রাথমিক শিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া তথা ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যবহার এখন সময়ের দাবী।

 

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা লাভ এবং তা আয়ত্ত ও প্রয়োগ করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) সকলের জন্য টেকসই গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ডিজিটাল ক্লাসরুম ব্যবহার করে সেই কাঙ্খিত মান অর্জন করা সম্ভব। শিশুদের শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদান পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু আকর্ষণীয় ও আনন্দময় করে তোলা অতি জরুরি। মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বিকশিত চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি এবং অনুসন্ধিৎসু মননের অধিকারী হয়ে সকল শিক্ষার্থী যাতে প্রতি স্তরে মানসম্পন্ন প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্টের ব্যবহার অত্যাবশ্যক। দেশজ আবহ ও উপাদান সম্পৃক্ততার মাধ্যমে শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর চিন্তা-চেতনা ও সৃজনশীলতার উজ্জীবন এবং তার জীবন-ঘনিষ্ঠ জ্ঞান বিকাশে সহায়ক।

ডিজিটালাইজেশনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা কন্টেন্ট ইন্টারএ্যাক্টিভ মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল ভার্সনে রুপান্তরকরণ। এই রুপান্তরের নানা উদ্দেশ্য রয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের (প্রথম-পঞ্চম শ্রেণি) আলোকে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ক (১৭টি বইয়ের) ইন্টারএ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্ট তৈরি করা এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে সঠিক কর্মপদ্ধতি।

 

পাঠ্যপুস্তকের ধারণাসমূহ আরো আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ছবি, চার্ট, ডায়াগ্রাম, অডিও, ভিডিও সহ মাল্টিমিডিয়া উপকরণসমূহ সংযোজন করে এ্যানিমেশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ভিক্তিক শিক্ষক, প্রশিক্ষক, এডুকেশন সেক্টর বিশেষজ্ঞ, চাইল্ড সাইকোলজিস্ট, কালার, প্রোগ্রামিং ও এনিমেশন বিশেষজ্ঞদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি অধ্যায়ের কাঙ্ক্ষিত শিখনফলের আলোকে এই ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্টসমূহ প্রস্তুত করা হচ্ছে। ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্টসমূহের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা যায় নানা দিক থেকে। কন্টেন্টসমূহ শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠ্যবিষয়কে সহজ এবং শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াকে অংশগ্রহণমূলক, আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক করে তোলা সম্ভব হয়। কন্টেন্টসমূহ শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষকে শিক্ষার্থী কেন্দ্রীক শ্রেণিকক্ষে পরিণত করা যায়।

 

পাঠদানকে অধিকতর মনযোগ-আকর্ষী করা এবং বিষয়ভিত্তিক ধারণা স্পষ্ট করা ও উন্নততর প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলোর মাধ্যমে পাঠ সম্পর্কে শিক্ষকের অনুধাবন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য স্ব-শিক্ষণের ব্যবস্থা করার একটা অন্যতম উপায় ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেনেটের ব্যবহার। আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিচিত করানোর জন্য এই প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই।

 

এই সকল ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে কম্পিউটারকে শিক্ষাদানের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপসমূহের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের উদ্যোগে ৭টি বিদ্যালয়ের ২৩ জন শিক্ষক নিয়ে পাইলট আকারে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। এ পাইলট কর্মসূচির সফল অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে, এটুআই প্রোগ্রামের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সারাদেশে পঁচিশ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেছে। এর মধ্যে ২০,৫০০ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তি’ প্রকল্পের মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে।

 

এটুআই প্রোগ্রামের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। শিক্ষকগণ বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, ধর্ম, বাংলা, কৃষিশিক্ষাসহ প্রতিটি বিষয়ের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করছেন ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশের সকল শিক্ষকদের একটি কমন প্ল্যাটফরমে নিয়ে আসার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় এটুআই প্রোগ্রাম শিক্ষক বাতায়ন তৈরি করেছে।

 

শিক্ষকগণ তাদের তৈরিকৃত ডিজিটাল কনটেন্ট, ভিডিও, এনিমেশন এখানে শেয়ার করেন এবং অন্যান্য শিক্ষকগণ তা প্রয়োজনে ডাউনলোড করে নেন। শিক্ষক বাতায়নে মোট ৪৫,০০০ জন শিক্ষক রয়েছেন, যারা নিয়মিত ডিজিটাল কনটেন্ট আপলোড করছেন ও ডাউনলোড করছেন। এখানে ২৫ হাজারের বেশি ব্লগপোস্ট ও ১২ হাজারের বেশি ডিজিটাল কনটেন্ট রয়েছে। শিক্ষক বাতায়নের সদস্য সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রাম-শহরের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বৈষম্য দূর করছে শিক্ষক বাতায়ন।

লেখক: জেলা প্রশাসক, বরিশাল


  • 114
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]