পড়তে চায় লামিয়া


চারপাশে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের মানুষ। তাদের আচরণ বা দৈহিক পার্থক্যও বিস্তর। কিন্তু সাবাই চায় একটু ভালোভাবে বাঁচতে-দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে। কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধতায় সবাই কি পারে সমানভাবে সুখি ও নির্ভাবনার জীবন অতিবাহিত করতে? এত কোটি মানুষের মাঝে পাশের মানুষটিকে কেউ কি দেখি মানুষের চোখে? এমন অনেক জীবনের ইতিহাস রয়ে গেছে না দেখার অন্তরালে। চলতে চলতে জীবন থেকে নেওয়া সেই পাঁচালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন গল্পকার ও সাংবাদিক বিধান সরকার। আজ পড়ুন-সপ্তম পর্ব

কচি কচি দুখানা হাত আর টিনটিনে দুটি পা। হাড় জিরজিরে শরীর। চোখ জোড়া কাজল পড়ানো। সম্ভবত অপুষ্টির শিকার হওয়াতে চোখের নীচে কালশিটে দাগ পড়া। এতে যেন বাড়তি সৌন্দর্য পেয়েছে। চঞ্চলতা বয়ে বেড়ায় ওচোখে। যেন হিজল জলের সুনিবিড় স্বপ্নবহা। কতই না ভাবনা আসে লামিয়াকে দেখে। ওই চোখ যখন আকুতি করে ভিক্ষের জন্য হাতটি বাড়ায়, তখন বড় বেমানান লাগে। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কিছুই কি করার নেই আমার? এ প্রশ্ন থমকে যায়, অক্ষমতার কাছে। রাষ্ট্র, তার চিন্তায় ব্যস্ত। দায় সাড়তে, জানি জানান দিতে তাই এই লেখা। ফিরবার বেলায় একলোক উৎসাহ দিয়েছিলেন- লেখেন, যদিবা ওর কিছু উপকারে আসে।

বরিশাল সিটি নির্বাচন উপলক্ষে প্রচারণা চলছে। প্রতি ঘন্টার সংবাদ সংযোগে লাইভ করার তাগিদ। সংযোগে যাওয়ার আগে ক্যামেরা, ডিভাইস প্রস্তুত করার সময় অশ্বিনী কুমার হলের সামনে দেখা মেলে অর্ধ বয়সী এক নারী ভাত খাচ্ছেন। খানিকটা সময় পর জীর্ন বস্ত্রের এক শিশু এসে খাবারে ভাগ বসায়। পরমস্নেহে শান্ত স্বভাবের মা সাবিনা আক্তার ওর পাতে তুলে দেয় এক মুঠো ভাত। ওই নিয়ে খাওয়া শেষ করে আমাদের কাছে উপস্থিত শিশুটি যার পোষাকি নাম লামিয়া আক্তার (৮)। বাবার কথা জিজ্ঞাসা করতেই উত্তর আসে- কবরে। কখন, কোথায় আর কিভাবে বাবার মৃত্যু হয়েছে একথা জানতে চাইলে লামিয়া আকপটে বলে চলে তার পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা।

ওর বাবা বাবুল হাওলাদার ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার বাইদারঠোডা গ্রামের সন্তান ছিল। পাশাপাশি গ্রাম তালতলায় ছিল সাবিনা আক্তারদের বাড়ি। দুজনে বিয়ে করে চলে আসে বরিশাল নগরীর ভাটিখানায়। রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন বাবুল হাওলাদার। এই দম্পত্তির ঘরে আরিফ নামে পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। বড় ভালোই চলছিল দিনকাল। ছেলে আরিফকে স্কুলে পাঠায়। দ্বিতীয় সন্তান লামিয়া আক্তার যখন মায়ের গর্ভে এর কোন একদিন বাবুল হাওলাদার কাজে গিয়ে আহত হন। মেডিকেলে নেয়া হয়েছিল তবে বাঁচানো যায়নি। লামিয়া ওর মায়ের কাছে জানতে পায় সেদিন রড পড়ে আহত হয়ে ওর বাবা মারা যান। বাবার কোন ছবিও নেই। তবে যখন বাবার কথা মনে পড়ে তখন আপনা থেকেই ডাগর চোখজোড়া জলে ভিজে যায়। আহারে জীবন!

লামিয়ার একমাত্র ভাই আরিফ এসএসসি পাশ করার পর অভাব ওর পড়ালেখায় ইতি টানে। এখন রাজধানীতে খালুর সাথে বাসে কন্ডাক্টরি করে বেড়ায়। গেল ঈদে মায়ের জন্য শাড়ি, বোনের জন্য জামাকাপড় পাঠিয়েছিল। এবছর পাঠায়নি। কারণ জানতে চাইলে লামিয়ার সহজ উত্তর-হয়তোবা বিয়ে করেছে। লামিয়ার মা সাবিনার শরীর তেমন ভালো যায়না। তাই নগরীর বিবিপুকুর পাড় নতুবা অশি^নী কুমার হলের সামনে চেয়ে চিন্তে দিন পাড় করে। শিশু লামিয়াও মায়ের কাজে শরীক হয়। কচি হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চায়। পাশপাশি জোড়মসজিদ এলাকার রাজ্জাকিয়া মাদ্রাসায় বড়ওয়ানে পড়ালেখা করে। মাদ্রাসার বেতন বকেয়া, তাই ক’দিন হলো সেখানেও যেতে পারছে না।

নবীর শিক্ষা করোনা ভিক্ষা, একথা লামিয়া জানে বৈকি। তারপরও যখন টাকার প্রয়োজন পড়ে তখন এই ছাড়া আর বিকল্প কি, সুধায় লামিয়া। তবে ইদানিং টাকা চাইতে লজ্জা ও ভয় দুটোই কাজ করে ওর। তাই মায়ের পাশে থাকে কিন্তু হাতপাতে খুব কম সময়। কেউবা কাজের কথা বললে যেতে ইচ্ছে করে, পাছে মাকে হারিয়ে ফেলে এই ভয় খুব তাড়া করে। একবার ভাইয়ের সাথে রাজধানীতে নানীর কাছে পাঠনো হলে ভাই হারিয়ে গিয়েছিল। এজন্য লামিয়ার ইচ্ছা মায়ের কাছাকাছি থাকতে আর পড়ালেখা করতে। কেউবা বলেন, স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য। তবে ওর মায়ের ইচ্ছা লামিয়া মাদ্রাসায় পড়ুক। কিন্তু মাদ্রাসার দ্বারও বন্ধ হয়েছে বকেয়া বেতনের দায়ে। তারপরও আট বছরের এই শিশুটির চোখে স্বপ্ন, পড়ালেখা করে বড় হয়ে চাকুরী করবে। সংসার গড়বে। যেখানে তার মায়ের ঠাঁই মিলবে। বিদায় নেবে অভাব।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]