ফিরে যেতে হচ্ছে ডারউইনের কাছে

  • 8
    Shares

পাকিস্তানে চার্লস ডারউইনের নাম নেয়া হয় ঘৃণার সঙ্গে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তার বিবর্তনবাদের তত্ত্বকে এড়িয়ে যান অথবা বেশ অবজ্ঞার সঙ্গে কৌতুক করে পড়ান।

সর্বনাশা নভেল করোনাভাইরাস আমাদের সামনে উদয় হওয়ার পর, এটা কোনো বিষয় নয় যে চার্লস ডারউইন দার্শনিকের চেয়ে একজন প্রকৃতিবিদ, জীববিজ্ঞানী ও ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন কিনা। খ্রিস্টান, ইহুদি ও হিন্দু মৌলবাদীরাও যে ডারউইনকে প্রতিনিয়ত নিন্দা করে সেটিও কোনো ব্যাপার না। এখনো ভয়ানক এই ভাইরাসকে মোকাবেলার যে আশা, তা দাঁড়িয়ে আছে ২০০ বছর আগে ডারউইনের আবিষ্কার করা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মূলনীতির ওপর।

সংক্ষেপে প্রাকৃতিক নির্বাচন বলছে, পৃথিবীতে প্রাণ প্রাক-উদ্দেশ্য এবং প্রাক-কাঠামো হিসেবে আসেনি, যা কিনা ঐতিহ্যগতভাবে বলা হয়ে থাকে। বিপরীতে মানুষ হোক কিংবা অণুজীব, জীবনের এই রূপগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিবেশের সঙ্গে সর্বোত্তমভাবে মানিয়ে নিতে পারলে বেঁচে থাকে, যখন অন্য সবকিছু মরে যায়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বিবর্তনের মাধ্যমে নতুন ধরনের জীবন এবং নতুন অণুজীব প্রকৃতিতে হাজির হয়। কিছু কিছু যেমন নভেল করোনাভাইরাস উপযুক্ত প্রাণী ও মানবদেহে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে এবং সফলতা অর্জন করে।

এখন বৈজ্ঞানিকভাবে ভাইরাসকে মোকাবেলা করার যে আশা, সেটি নির্ভর করছে ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের আবিষ্কারের ওপর।

বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে আপনি কিছু স্লাইডস ও একটি শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপ নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আসলে একটি মিলিয়ন ডলারের মাইক্রোস্কোপ এক্ষেত্রে বেশ কার্যকর হবে। এখন অপেক্ষা করে কোষগুলোর পুনরুৎপাদন দেখুন। শিগগিরই আপনি দেখবেন কিছু অপূর্ণ কপি। সবচেয়ে খারাপটি মরে যায় এবং কিছু টিকে থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কীভাবে ক্যান্সার সেল গঠিত হয়। সালোন-কেটেরিং সেন্টারের পরীক্ষা দেখাচ্ছে কিছু সাধারণ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া পরিবেশ বদলে গেলে কীভাবে আচরণ করে। এ পরীক্ষা অণুজীব বিজ্ঞানী হারমিত মালিককে এ মন্তব্য করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল যে প্রাকৃতিক বিবর্তন হচ্ছে পৃথিবীর ইঁদুর ও বিড়ালের মাঝে চূড়ান্ত এক খেলা। ভাইরাস বিকশিত হয়, শরীর সেটি গ্রহণ করে, প্রোটিন বদলায়, ভাইরাস সেটিকে এড়িয়ে যায়। এই খেলা কখনো শেষ হয় না।

ডারউইনের এই নির্বাচন জীববিজ্ঞানে ততটাই মৌলিক, যতটা পদার্থবিজ্ঞানে নিউটনের সূত্র। মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বকে অস্বীকার করলে, মাধ্যাকর্ষণ উধাও হয়ে যায় না। তবে এটি নিশ্চিতভাবেই আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের চর্চাকে ধ্বংস করবে। একইভাবে বিবর্তনবাদ তত্ত্ব না পড়ালে, সেটি নতুন ধরনের ভাইরাসের উত্থানকে ঠেকাতে পারবে না। আর এগুলো না পড়ালে তবে পাশাপাশি রোগ ও মহামারীসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলোর কথাও ভুলে যান।

ডারউইনের নির্বাচন তত্ত্ব ছাড়া কেউ মাইক্রোবিয়াল-হোস্ট ইন্টারেকশন, জীবাণুর বিবর্তনের বোঝাপড়া শুরুর কথা ভাবতেও পারে না। এছাড়া ওষুধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথে যাত্রাও এটি ছাড়া শুরু করা যায় না। তো এখন চাইলে আপনারা ডারউইনকে দোষ দিতে পারেন, কেন যোগ্যরাই টিকে থাকতে পারে, এমন কথা তিনি বলেছেন সেজন্য। কিন্তু এরপর অবশ্যই নিউটনকে শাস্তি দেবেন কারণ আপেল উপরে না গিয়ে নিচে পড়ল কেন সেজন্য।

তবে ভালো খবর হচ্ছে অনেক শিক্ষিত মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে কেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কাজ করে এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি করে না। আরো ভালো যে রক্ষণশীল ও বিজ্ঞান বর্জনকারী বিশ্বনেতারা এখন বিজ্ঞানীদের কাছে প্রার্থনা করছে, উদ্ধারকাজের গতি যেন তারা বাড়িয়ে দেন।

ভারতের অনেক নেতা প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতির দক্ষতার কথা বলছেন। অনেক বছর ধরে তাদের অনেকে গোমূত্রর নানা শক্তির কথা প্রচার করছেন। এছাড়া আয়ুর্বেদ ও যোগের কথাও বলে আসছিলেন তারা। কিন্তু ভারত এখন আক্রান্ত এলাকাগুলোয় জরুরি ভিত্তিতে গোমূত্র বা গোবর প্রেরণের কথা বলছে না।

অন্যদিকে পাকিস্তান সৌদি আরব থেকে আজওয়া খেজুর আনার অর্ডার দেয়নি। যাকে কিনা সর্ব রোগের নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করার কথা বলেছিলেন পাকিস্তানের এক জনপ্রিয় ধর্মপ্রচারক।

সম্প্রতি পোপ ফ্রান্সিস ভ্যাটিকানে একটি নাটকীয় ও নির্জন প্রার্থনার আয়োজন করেন। যেখানে তিনি পৃথিবীকে কভিড-১৯-এর মহামারীকে সংহতির পরীক্ষা হিসেবে দেখার কথা বলেন। অথচ ৩০০ বছর ধরে চার্চ প্লেগ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সৃষ্টিকর্তার শাস্তি হিসেবে দেখে আসছিল।

ইরানও এর মধ্য দিয়ে তিক্ত এক শিক্ষা পেয়েছে। গত মাসে তারা স্বীকার করেছে যে শুরুতে কওম ও মাশহাদে তীর্থযাত্রীদের প্রবেশের অনুমতি দিয়ে তারা মারাত্মক ভুল করেছিল। একইভাবে সৌদি আরব ওমরাহ স্থগিত করেছে।

ধন্যবাদ দিতে হয় জীববিজ্ঞানকে, যার ভিত্তি কিনা চার্লস ডারউইনের হাতে। নভেল করোনাভাইরাস অবশেষে একটি মারাত্মক কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয়ে পরিণত হবে। এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হবে। কিন্তু দিনশেষে একমাত্র ওষুধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমে আপনার জীবন বাঁচতে পারে।

দ্যা ডন থেকে চুম্বকাংশের অনুবাদ/পারভেজ হুদভয়


  • 8
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]