ববি আন্দোলনের নেপথ্যে সাবেক ও বহিস্কৃতদের ষড়যন্ত্র


বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সংকট নিয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন উপাচার্য প্রফেসর ড. এসএম ইমামুল হক। তিনি অভিযোগ করেন, নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে সাবেক ভিসি, বহিষ্কৃত রেজিস্ট্রার, একাউন্টেন্ট ও বর্তমান ট্রেজারারসহ কিছু লোক শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অর্থের যোগান দিচ্ছেন। মূলত এ আন্দোলন নিয়ে লোক গেম হচ্ছে বলে অভিযোগ ভিসি’র।

ববিতে আন্দোলনের ১৪তম দিনে মঙ্গলবার (৯ এপ্রিল) সকালে মুঠোফোনে এ কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এসএম ইমামুল হক।

যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলন শুধুমাত্র ভিসি’র বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। এটা কারোর পক্ষে কিংবা কারোর ইন্ধনের আন্দোলন নয় বলে জানিয়েছেন তারা। এমনকি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাবার যে অভিযোগ উঠেছে তাও সত্যি নয় বলে দাবি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ড. মাহাবুবুর হাসান।

উপাচার্য প্রফেসর ড. এসএম ইমামুল হক বলেন, ‘২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে যা হয়েছে তার পুরোটাই সাজানো এবং পূর্বে পরিকল্পিত। কেননা শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজনের বিষয়টিতে তারা আগেই প্রতিবাদ করতে পারতো। তা না করে প্রতিবাদ করার জন্য কেন স্বাধীনতা দিবসের দিনটিই ওরা বেছে নিলো?

ভিসি বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোক। স্বাধীনতা দিবসের দিনটিতে কেউ এমন করলে সেটা নিয়ে আমার কষ্ট লাগারই কথা। যে জন্য সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কাউটের অনুষ্ঠানে এ নিয়ে দু-একটি কথা বলেছি। সেই কথার ভুল ব্যাখ্যা এবং ভিন্নভাবে প্রচার করে শিক্ষার্থীদের আমার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা হয়েছে। তার পরেও আমি শিক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি। এর পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কোন কারণ নেই।

প্রফেসর ড. এসএম ইমামুল হক বলেন, ‘নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যাতে বিশ্ববিদ্যালয়টি অল্প সময়ের মধ্যে সুনাম অর্জন করতে পারে সে জন্য। গত ৪ বছর ১০ মাসে আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনেক কিছুই করেছি। যার মধ্যে অন্যতম কাজ হলো বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্নীতি মুক্ত করা। আর এটা করতে গিয়েই আজ আমার বিরুদ্ধে এতো আন্দোলন হচ্ছে।

ভিসি বলেন, ‘আমার পূর্বে যিনি ভিসি ছিলেন আমি এসে তার দুর্নীতি ও অর্থ কেলেঙ্কারি ধরে ফেলেছি। তিনি সরকারি অর্থ নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্টে রেখে ট্রাস্টি ভবন বানিয়েছেন। অথচ ওই ভবনটি নির্মাণের পুরো ক্রেটিড তিনি নিয়েছেন। ট্রাস্টি ভবনে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবির জায়গাতে সাবেক ভিসি তার নিজির মুর‌্যাল তৈরি করেছেন। আমি সেটা ভেঙে দিয়েছি। তাছাড়া সাবেক ভিসি’র ৭ লাখ টাকা দুর্নীতির একটি অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীকে চাকরি দেয়ার কথা বলে অনৈতিক প্রস্তাব দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। আমি তাকে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ছুটিতে পাঠিয়েছি। পরবর্তী সিন্ডিকেটের সভায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে। দুর্নীতির অভিযোগে একাউন্টেন্ট বরুনকে আমি শাস্তি দিয়েছি। সে বর্তমানে সাময়িকভাবে বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন।

তাছাড়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভিসি’র পদ শূন্য। তাই ভিসি’র অবর্তমানে দায়িত্ব পালন করবেন ট্রেজারার। সেই সুযোগ খুঁজছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজাররা ড. মাহাবুব হাসান। তিনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার জন্য এরই মধ্যে লবিং-তদবির শুরু করে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতে ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তার মধ্যেও ট্রেজারার তার নিজ অর্থে শিক্ষার্থীদের জন্য ডাইনিং খোলা রাখেন। যা সবাই যাবেন। তাছাড়া এই আন্দোলনের সাথে আরো কিছু কর্মচারীর পরোক্ষ যোগসাজস রয়েছে। যাদের নিয়োগ দিয়ে গেছেন সাবেক ভিসি।

ববি ভিসি ইমামুল হক দাবি করে বলেন, ‘ওইসব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভেবেছেন প্রধানমন্ত্রী আমাকে পুনরায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিবেন। যেটা দুর্নীতিগ্রস্ত ওইসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাবেক ভিসি’র মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। তারা চাচ্ছেন না আমি পুনরায় এখানকার ভিসি হয়ে আসি। এজন্যই তারা শিক্ষার্থীদের পেছনে থেকে ইন্ধন যোগাচ্ছে আন্দোলনের জন্য। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অর্থের যোগান দিচ্ছে।

শুধুমাত্র কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, ভিসি এসএম ইমামুল হক অভিযোগ করেছেন পুলিশের বিরুদ্ধেও। তিনি বলেন, ‘আন্দোলন বন্ধের বিষয়ে আমি পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছি। কিন্তু তারাও আমাকে কোন ধরনের সহযোগিতা করছেন না। বরং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এখন লোকাল গেম হচ্ছে। আর এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সবাই অবগত আছেন বলেও জানিয়েছেন ভিসি।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন নিয়ে ভিসি যে অভিযোগ তুলেছেন তা সত্যি নয় বলে অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষার্থীরা বলেছেন, এটা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। কারোর পক্ষে বা কাউকে খুশি করার আন্দোলন নয়। আমরা আমাদের চাঁদার টাকায় আন্দোলন করছি। কারণ এটি আমাদের অস্থিত্বের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘ ভিসি ইমামুল হক একজন দুর্নীতিবাজ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি দুর্নীতির রাজত্ব গড়ে তুলেছেন। আমারা সাধারণ শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। এর ফলে ভিসি’র সাথে আমাদের সম্পর্কটা এমন পর্যায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে তিনি পদত্যাগ না করলে আমরা আন্দোলনকারীদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে। তাই শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনকে ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা না করার জন্য অনুরোধ জানান শিক্ষার্থীরা।

অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মাহবুব হাসান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই। শিক্ষার্থীদের ডাইনিংএ চালু রাখার যে অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে করা হচ্ছে সেটা সত্যি নয়। তাছাড়া আমি ভিসি হওয়ার জন্যও কোন চেষ্টা করছি না। প্রধানমন্ত্রী যাকে দায়িত্ব দিবেন তিনিই ভিসি হবেন বলে জানিয়েছেন ট্রেজারার।

জাগরণ/ডেস্ক


বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।