বরিশালের সংবাদপত্রের সংখ্যা ও সংবাদিকতার মান


জাকিরুল মোমিন : ‘দক্ষিনাঞ্চল’ হলো ধান-নদী-খালের শহর। কিন্তু ‘আজকাল’ একথা কেউ না বলে এটাকে বলে পত্রিকার শহর। ‘ভোরের আলো’ ফুটবার আগেই বিপনণ কর্মীদের ছোটাছুটিতে মুখরিত হয়ে উঠে দিনের ‘প্রথম সকাল’।

কিন্ত এত সংবাদপত্র থাকতেও অনেক সাংবাদপত্রই ‘সময়ের বার্তা’ সময়মতো দিতে তাদের বেগ পেতে হয়।‘বরিশাল প্রতিদিন’ সংবাদপত্রের সংখ্যা বাড়লেও সংবাদের মান বাড়ছে না। ‘আজকের পরিবর্তন’র এই কারন খুজে বের জরুরি; যে এতো সংবাদপত্র থাকতেও ভাল মানের সাংবাদিক কেন আমরা পাচ্ছি না- যারা মানসম্মত সংবাদ পরিবেশন করে ‘দখিনের মুখ’ উজ্জল করবে।

পত্রিকার সংখ্যা যে হারে বাড়ছে তার পৃষ্ঠা যদি একসাথে জোড়া দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে যে এটা ‘শাহানামা’র মতো একটা মহাকাব্য হয়ে গেছে।

যা, ‘২৪ ঘন্টা’ একটানা পড়েও শেষ করা যায়না।কিন্তু এত সংখ্যক পত্রিকা না হয়ে ‘দেশ জনপদের’ ভালো মানের খবর পরিবেশনের জন্য অল্পসংখক পত্রিকা হলেও পাঠকরা সন্তুষ্ট থাকতো। কিন্তু এখানে সাংবাদিকতার চেয়ে অপসাংবাদিকতা বেশি।

‘আমাদের বরিশাল’ হলো ‘আলোকিত বরিশাল’।এখানে অপসাংবাদিকতা চলতে পারে না।

এই বরিশালে কবে কেউ ‘সাহসী বার্তা’ নিয়ে এগিয়ে এসে এই অপসাংবাদিকতা দূর করবে?

আমাদের বরিশালে ‘বরিশালের কথা’ বলার সাংবাদিক কি আসবে না? যারা ‘কীর্তনখোলার’ দূষণের কথা ‘আজকের সুন্দরবন’র বনদস্যুদের অত্যাচারের কথা সবার সামনে তুলে ধরবে?

সাংবাদিকরা থাকবে সবসময় নিরপেক্ষ। কিন্তু তারাও কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের কর্মীর মতো কাজ করে দলীয় ‘মতবাদ’ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত থাকে।‘সত্য সংবাদ’-এর পিছনে ছোটার তাদের সময় কোথায়? ‘বরিশালের কাগজ’ যখন পাঠক হাতে পায় তাতে তারা খোজে ‘বরিশালের আলো’র খবর, ‘পল্লী অঞ্চল’র খবর, উন্নয়নের খবর। তা না পেয়ে তারা হতাশ হয়।

সাংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ।

সেখানে ‘বরিশাল অঞ্চল’র সাংবাদিকরা যদি তাদের ‘কলমের কন্ঠ’কে শক্তিশালি করতে না পারে তাহলে সমাজের অনিয়ম দূর করা সম্ভব না। আজকে কলম সাংবাদিকের চেয়ে ফটোসাংবাদিকের আধিক্য বেশী।

সকাল হলেই মটোরসাইকেলে দামী ক্যামেরা সমেত ‘ভোরের অঙ্গীকার’ নিয়ে নেমে পড়ে রাজপথে। কেউ কেউ কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে ছবি তোলার আগেই আয়োজকদের মানিব্যাগ তুলতে হয়; তা না হলে এ ছবি আর আলোর মুখ দেখে না।

অথচ আগে ক্যামেরার এতো দৌরাত্ব ছিল না।

বরিশালের সংবাদপত্রের ইতিহাস অনেক পুরোনো। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ১৮৬২ সালে বাসন্ডা গ্রামের পূর্নচন্দ্র সেন বরিশাল শহরে সর্বপ্রথম মুদ্রনযন্ত্র স্থাপন করেন। পরবর্তীতে এক ‘হিরন্ময়’ সকালে তারাপাশা গ্রাম নিবাসী হরকুমার রায় সম্পাদিত ‘পরিমলবাহীনি’ নামক সর্বপ্রথম সংবাদপত্র এই যন্ত্রে মুদ্রিত হয়ে পাঠকের কাছে আাসে।

১৮৭২ সালে মাগুরানিবাসী ঈশ্বরচন্দ্র কর, সত্যপ্রকাশ নামক মুদ্রাযন্ত্র স্থাপন করেন এবং এখান থেকেই ‘বরিশাল বার্তাবহ’ নামক এক সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ১৮৮০ সালে এই সত্যপ্রকাশ যন্ত্রে ‘কাশীপুরনিবাসী’ নামক মাসিক পত্রিকা ছাপিয়ে তা বিনামূল্যে বিতরণ করতেন। ১৮৯৩ সালে রাজমোহন চট্টপ্যাধ্যায় হিতৈষী মুদ্রাযন্ত্রে ছাপিয়ে ‘বরিশাল হিতৈষী’ নামক সাপ্তাহিক সংবাদপত্র বের করেন।

কিন্তু হিতৈষী নিয়মিতরুপে প্রকাশ না হওয়ায় অশ্বিনী কুমারের মনে সংবাদপত্রের বিষেশ অভাব অনুভ‍ূত হচ্ছিল।এদিকে কাচাবালিয়া গ্রাম নিবাসী প্রতিভাবান সংবাদপত্র পরিচালক প্রিয়নাথ গুহ বরিশাল এসে অশ্বিনীকুমারের সাথে পরিচিত হলেন।

অশ্বিনী কুমার স্থির করলেন এই প্রিয়নাথ গুহকে দিয়ে একটি সংবাদপত্র বের করবেন।

১৯০০ সালে উপেন্দ্রনাথ সেন, জমিদার অবিনাস চন্দ্র গুহ এবং স্বয়ং অশ্বিনীকুমার এই তিনজনে মিলে তিন হাজার টাকা দিয়ে একটি মুদ্রাযন্ত্র ক্রয় করেন এবং এর নাম দেওয়া হলো ন্যাশনাল মেশিন প্রেস।

এই প্রেস থেকে প্রিয়নাথ গুহের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘বিকাশ’ মুদ্রিত হতো। এই হলো সংবাদ পত্রের ‘বরিশাল সমাচার’।

পরিশেষে বলবো এখনো বরিশালে অনেক অগ্রজ সাংবাদিক আছে। অপসাংবাদিকতারোধে তাদের এগিয়ে আসা জরুরী। যে সব সাংবাদিক দুনিয়ার চাকচিক্যময় বস্তুর লোভে পড়ে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে কুলষিত করছে তাদের জরুরীভাবে জবাবদীহিতার আওতায় আনা।

হলুদ সাংবাদিকতা রোধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাদের বোঝানো গনমাধ্যম জনগনের স্বার্থ, সুরক্ষা, সুশাসন ও গণতন্ত্রের উন্নয়নে কাজ করে। সুতারং তোমরা এই মহান পেশাকে কলুষিত না করে এমনভাবে কাজ করো যাতে কেউ তাচ্ছিল্য করে সাংবাদিককে সাংঘাতিক বলতে না পারে। এটাই হোক অনুজদের প্রতি অগ্রজদের ‘আজকের বার্তা’।

বিদ্রঃ ব্রাকেটবন্দী যা দেয়া তা বরিশালের সংবাদপত্রের নাম। সব নাম মনে পড়ছে না, কিছু নাম হয়তো বাদ পড়েছে।

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে হুবহু কপিকৃত)


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]