বরিশালে এক বস্তিতেই ৩০ শহীদ মিনার

  • 20
    Shares

বরিশাল : বরিশাল নগরী থেকে নদী বিচ্ছিন্ন কলোনী রসুলপুর। সিটি কর্পোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভূখণ্ডটি বস্তি হিসেবে সমধিক পরিচিত। আট বছর আগেও এখানে শহীদ মিনারকে মূর্তির সঙ্গে তুলনা করা হতো। তবে এখন সেখানে শহীদ মিনার নির্মাণে যথারীতি প্রতিযোগিতা হচ্ছে। ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে উৎসব শুরু হয় ১৮শ ভোটারের তিন হাজারের মত বাসিন্দার মধ্যে।

মূলত স্কুলপড়ুয়া শিশুরা স্মৃতি ও ঐতিহাসিক মিনার গড়ে তোলার কাজে অংশ নেয়। এ নিয়ে ব্যস্ততার অন্ত থাকে না অভিভাবকদেরও। অস্থায়ীভাবে নির্মিত এসব শহীদ মিনার দেখতে শহরের বিশিষ্টজনরা আসেন। তাই ২১ ফেব্রুয়ারি ঘিরে শিশুদের সাজ-সজ্জারও কমতি নেই।

এমন ভিন্নধর্মী প্রতিযোগিতার আয়োজন করে রসুলপুর বস্তির আগামী প্রজন্মের মধ্যে ভাষা সংগ্রামের বীজ বপন করে দিচ্ছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বরিশাল জেলা শাখার সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী। কুসংস্কারের আচ্ছাদন খুলে ফেলতে এই প্রতিযোগিতাকে একটি সংগ্রামের অংশ হিসেবে নিয়েছেন তিনি।

এ বছর রসুলপুর কলোনীতে ৩০টি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। দলভিত্তিক কাজ করে এই নির্মাণযজ্ঞে অংশ নিয়েছে কমপক্ষে ১৫০ জন শিশু।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কলোনীর অলিগলিতে সামর্থ্য অনুযায়ী গড়ে তোলা হয়েছে শহীদ মিনার। মাটির বেদিতে কাঠ, ইট দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে প্রতিটি মিনার। কাঠের গুড়োর সঙ্গে রঙ মিশিয়ে লেখা হয়েছে ভাষা শহীদদের নাম। অঙ্কিত হয়েছে মানচিত্র। রঙিন কাগজে আবৃত করা হয়েছে শহীদ মিনার এলাকা। এক ভিন্ন পরিবেশ ফুটে উঠেছে শিশুদের কোমল হাতের ছোঁয়ায়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান সঞ্জয় সরকার বলেন, শহীদ মিনার আমাদের জাতিসত্তার প্রতীক। আগে শুনেছি শহীদ মিনার নির্মাণের প্রতিযোগিতার কথা। কিন্তু আজ দেখতে এসে সত্যিই আমি অভিভূত। এত সুন্দরভাবে শিশুরা প্রতিটি শহীদ মিনার তৈরি করেছে দেখে আমি আপ্লুত।

তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র শফিকুল রাতভর চেষ্টা করে নির্মাণ করেছে শহীদ মিনার। সে জানায়, প্রতি বছরই শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সে। কাজটি করতে তার ভালো লাগে। টিমের সবাই মিলে মা-বাবার কাছ থেকে ১৬০ টাকা নিয়ে সম্পন্ন করেছে পুরো শহীদ মিনার নির্মাণ কাজ।

চকবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে বেল্লাল সরদারের মেয়ে মিম। তারা তিন ভাইবোন মিলে ঘরের সামনেই তৈরি করেছে একটি শহীদ মিনার। পাশ দিয়ে যেই হেঁটে যাচ্ছেন তাকে ডেকে ডেকে দেখাচ্ছেন তাদের নির্মিত শহীদ মিনারটি।

মিমদের এক ঘর পরে মমিনুল ইসলাম সিয়ামের নির্মিত শহীদ মিনার। সে শুধু শহীদ মিনার নির্মাণ করে শেষ করেনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তে রঞ্জিত দিনটির ইতিহাস ছোট ভাই বায়জিদকে সঙ্গে নিয়ে অভিনয় করে দেখিয়ে দিচ্ছে। সকালে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শুরু করেছে অভিনয়। কতবার মানুষকে এই অভিনয় করে দেখিয়েছে তা গুনে বলতে পারেনি সিয়াম। সে বলে, আমার ভালো লাগে ২১ ফেব্রুয়ারির অভিনয় করতে।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী স্মৃতিও নির্মাণ করেছে অমর একুশের স্মৃতির মিনার। এভাবে একে একে ৩০টি শহীদ মিনারের নির্মাণশিল্পীরা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে প্রতিযোগিতায়।

ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী জানান, ২০১৪ সালে রসুলপুরের সরকারি জমিতে বস্তি উচ্ছেদ অভিযানের খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত মানুষকে সহমর্মিতা জানাতে এসে ও উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবি জানাতে এসে একটি বিষয় নজর কাড়ে তার। রসুলপুর বস্তিতে শিশুদের শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তখন একটিও শহীদ মিনার ছিল না এখানে। এমনকি শিশুরা নির্মাণ করতে গেলে বড়রা মূর্তি আখ্যা দিয়ে শিশুদের নিবৃত করতেন।

ডা. মনীষা বলেন, শিশুদের যা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছিল তাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা ছিল। তাদের ভুল ইতিহাস শেখানো হচ্ছিল। আমি সংগ্রামটা সেখান থেকে শুরু করি। চিন্তা করি কুসংস্কারটি কীভাবে কাটানো যায়। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম যেখানে শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা দেওয়া হচ্ছে সেখানে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। বিষয়টি আমার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে পরামর্শ করলে তারাও এগিয়ে আসেন। মূলত বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট এত বছর ধরে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতা শুরু করি রসুলপুরে। প্রথমে ৭-৮টি শহীদ মিনার নির্মিত হত। পর্যায়ক্রমে তা বাড়তে লাগলো। ২০১৭-১৮ সালে রসুলপুরে অর্ধশতাধিক শহীদ মিনার নির্মাণ করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় শিশুরা।

ডা. মনীষা বলেন, বর্তমানে রসুলপুরের উত্তর পাশে একটি সেতু নির্মিত হয়েছে। ফলে অনেকেই এখানে দালান তুলতে শুরু করেছেন। সে কারণে সংখ্যায় একটু কমেছে শহীদ মিনার নির্মাণ। তবে সন্তুষ্টির জায়গা হলো, শিশুরা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালের ইতিহাস জানতে পারছে। আমাদের ভাষা সংগ্রামের বীজ বপন হচ্ছে ওদের মনে।

এ বছর শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতার পাশাপাশি চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, গান, নৃত্য ও অংক দৌড়ের প্রতিযোগিতাও চলছে। ব্যবস্থা করা হয়েছে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের। সন্ধ্যায় শিশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। মোট কথা ২১ ফেব্রুয়ারি ঘিরে ভাষা উৎসব চলেছে রসুলপুরে।

এই আয়োজনকে সাধুবাদ জানিয়ে বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি নজমুল হোসেন আকাশ বলেন, ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার আয়োজন। আমি এই আয়োজনের সফলতা কামনা করি। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষার পথপরিক্রমা জানতে পারছে, শিখতে পারছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, রসুলপুরের আয়োজন একটি মডেল। এভাবে শিশুদের মাঝে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রথিত করা উচিত। বাংলা ভাষা টিকিয়ে রাখতে ভাষা নিয়ে ভিন্নধর্মী এসব আয়োজন না হলে মানুষ আগ্রহ হারাবে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে আমার ভাষা।


  • 20
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]