বরিশাল বিকেএসপিতে উপেক্ষিত ক্রিকেট

  • 8
    Shares

বরিশাল : জাতীয় ক্রিকেট দলের আলোচিত অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। খুলনায় থেকে সুযোগ করে নিয়েছেন টাইগার টিমে। অথচ তার জন্মস্থান বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামের তালুকদার বাড়ি। তেমনি আরেক ডানহাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার কামরুল ইসলাম রাব্বির বাড়িও বরিশালের পটুয়াখালী জেলায়। ২০০৮ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করছেন বরিশালের।

বরিশালের সন্তান শাহরিয়ার নাফিস উচ্চতার শিখরে পৌঁছেও বরিশালের ক্রিকেটকে তিনি নিজের বলে মনে করেন। দেশের আলোচিত এসব ক্রিকেটার স্থানীয়ভাবে চর্চা চালিয়ে নিজের যোগ্যতায় অবস্থান করে নিয়েছেন জাতীয় দলে। তারা কেউই বরিশাল বিকেএসপির শিক্ষার্থী নন।

তাহলে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ক্রিকেটে কতটুকু উপকারে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রীড়ামোদিদের মাঝে। অনেকেই বলছেন, ‘ইচ্ছে করেই উপেক্ষিত’ রাখা হয়েছে বরিশাল বিভাগকে। যদিও বিকেএসপি বরিশাল থেকে জানানো হয়েছে, নামে আঞ্চলিক হলেও এই প্রতিষ্ঠান বরিশাল বিভাগকে প্রাধান্য নয়, মুখ্যত তারা ক্রীড়াঙ্গনকে প্রাধান্য দিচ্ছে। সে কারণে একটি সার্কেল নিয়মে এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা। তবে বরিশাল বিকেএসপিতে ক্রিকেটের মতো আন্তর্জাতিক চাহিদাসম্পন্ন ক্রীড়া প্রশিক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়নি কেন, এর কোনো জবাব নেই তাদের কাছে।

জানা গেছে, বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য ২০০৮ সালে গড়িয়ার পাড় এলাকায় ১৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ২০১২ সালে ভর্তি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো চাহিদাসম্পন্ন ক্রীড়া প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অধিকাংশ ইনডোর গেম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেই দায়িত্ব শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ। বিপরীতে অন্যান্য জেলা শহরে প্রতিষ্ঠিত বিকেএসপিতেও এর থেকে বেশি ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে সেসব স্থান থেকে বের হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়।

বিকেএসপি বরিশাল কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশে ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট ২৩টি ক্রীড়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ইভেন্টগুলো হচ্ছে ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, শ্যুটিং, আর্চারি, জুডো, উশু, তায়কোয়ান্দো, অ্যাথলেটিকস, বাস্কেটবল, সাঁতার, জিমন্যাস্টিকস, বক্সিং, টেনিস, ভলিবল, কারাতে, টেবিল টেনিস, গলফ, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, ভারোত্তোলন, হ্যান্ডবল ও স্কোয়াশ।

এসব ইভেন্ট একমাত্র ঢাকার সাভারের জিরানি অবস্থিত কেন্দ্রীয় বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দেশের চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, দিনাজপুর ও বরিশাল বিকেএসপিতে নির্ধারিত কিছু ক্রীড়া প্রশিক্ষণের বিভাগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা ও দিনাজপুর বিকেএসপিতে সবচেয়ে বেশি ক্রীড়া প্রশিক্ষণের বিভাগ রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্রিকেট ও ফুটবল বিভাগও রয়েছে। ফলে চাহিদাসম্পন্ন এই ক্রীড়াঙ্গন থেকে বিগত এক দশকের হিসাবে সবচেয়ে বেশি খেলোয়াড় বেরিয়েছে খুলনা ও দিনাজপুর থেকে। বিপরীতে বরিশাল বিকেএসপিতে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানের কোনো খেলোয়াড় পাওয়া যায়নি। ইনডোর গেমে কেবল জাতীয় টিমে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেই দৌড় শেষ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

এর দায় অবশ্য স্থানীয় মানুষের প্রতি চাপিয়েছেন আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বরিশালের উপপরিচালক শাহাদত হোসেন। তিনি বলেন, কর্মসূত্রে আমি ঢাকা, খুলনা ও দিনাজপুরে কাজ করেছি। ওই সব স্থানে মানুষের মাঝে খেলাধুলার আগ্রহ বেশ লক্ষণীয়। কিন্তু বরিশালে সেই আগ্রহ নেই। এর কারণ কি আমি জানি না। তবে মানুষ হতে হলে অবশ্যই খেলাধুলায় মনোযোগী হতে হবে। অভিভাবকদের উচিত তার সন্তানদের খেলাধুলায় উৎসাহী করে তোলা।

আমার ছেলে ক্রিকেট ভক্ত। ছোটবেলা থেকেই ও সব সময় ক্রিকেটে মজে থাকেন। সে জন্য স্কুলে ও স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলতে নিয়ে আসি। ইচ্ছা ছিল বরিশাল বিকেএসপিতে ভর্তি করাব। কিন্তু সেখানে ক্রিকেট বিভাগ না থাকায় আর ভর্তি করানো হচ্ছে না।
ইন্দিরা পাল, অভিভাবক

শাহাদাত হোসেন বলেন, বরিশাল বিকেএসপি শুধু বরিশালবাসীর জন্য নয়। এটি প্রশিক্ষণের একটি স্থান। বিকেএসপিতে চান্স পেলে এখানে না হোক ঢাকায় খেলার সুযোগ পাবে। ফলে অঞ্চলভিত্তিক কেন ক্রিকেট প্রশিক্ষণের বিভাগ এখানে রাখা হয়নি, সেটি বিবেচ্য নয়। বরং স্থানীয় মানুষ, ক্রীড়া ক্লাবকে বেশি বেশি এগিয়ে আসতে হবে টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে।

বরিশাল বিকেএসপিতে উশু, কারাতে, তায়কোয়ান্দ ও ফুটবল প্রশিক্ষণের অনুমতি রয়েছে। এর মধ্যে ফুটবল ছাড়া বাকি ইভেন্টগুলো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অলিম্পিকের জন্য ভারোত্তোলন ক্যাটাগরির গেম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের ২৩ জন শিক্ষার্থী জাতীয়ভাবে ক্রীড়া প্রতিযোড়িতায় অংশগ্রহণ করেছেন। তবে ফুটবলে কেউ চান্স পেয়েছেন কি না, তা জানা নেই বলে জানান এই কর্মকর্তা।

বরিশাল বিকেএসপিতে ১০০ জন শিক্ষার্থীর আবাসিক ও প্রশিক্ষণের সুবিধা রয়েছে। যদিও করোনার মধ্যে ২০২০ সালে বিকেএসপিতে চান্স পাওয়া বরিশাল বিভাগের ২০ জন এখনো যোগ দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে শাহাদত হোসেন বলেন, ভর্তি সেশনে ২০ জন বরিশাল বিভাগের, বাকি ২০ জন এখানে ভর্তি হয় দেশের অন্যান্য স্থান থেকে। তারা যোগ দিতে পারলে এই শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীসংখ্যা দাঁড়াবে ১০৫ জন। কারণ আগে আরও ৬৫ জন ভর্তি রয়েছে।

শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়ার আগে বিকেএসপি মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে কোনো প্রচার-প্রচারণা চালায় কি না, জানতে চাইলে শাহাদাত হোসেন বলেন, এমন কোনো সুযোগ নেই। অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে তার সন্তানদের নিয়ে। যদিও এই কর্মকর্তা মনে করেন, বরিশালে ক্রীকেট প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া উচিত। তাহলে আরো কিছু আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, বড় দুটি ফুটবলের খেলার মাঠ রয়েছে। ক্রিকেট প্র্যাকটিসের জন্য আরেকটি মাঠ পুরোপুরি পর্যুদস্ত। শুধু শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা ও ফুটবল প্র্যাকটিসের জন্য মাঠগুলো ব্যবহৃত হয়। ফলে মাঠের পাশে সবজি চাষ করে নিজদের চাহিদা মেটান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে বাস্কেটবলের মাঠও।

কথা হয় শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত আউটার স্টেডিয়ামে ক্রিকেট চর্চা করা শুভ্র দাসের সঙ্গে। তিনি পাঁচ বছর আগে বরিশাল বিকেএসপিতে চেষ্টা করেছিলেন ভর্তি হওয়ার জন্য। পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার নলী ভীম চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বাবার হাত ধরে এসেছিলেন বরিশাল বিকেএসপিতে। কিন্তু তখন জানলেন, ক্রিকেট খেলার সুযোগ নেই। এখন শুভ্র নিজেই দল গঠন করে চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন বরিশালে লেখাপড়ার সুযোগে।

শুভ্র বলেন, বরিশাল বিকেএসপিতে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলে আমার মতো হাজার হাজার ক্রিকেট পাগলকে আশাহত হতে হতো না। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিজেদের ক্রিকেট খেলার সঙ্গে যুক্ত রেখেছেন। কারণ স্থানীয়ভাবে যতগুলো ফুটবল বা কাবাডি খেলা হয়, তার দ্বিগুণের বেশি টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয় ক্রিকেটের। ফলে ক্রিকেট বিভাগ বিকেএসপিতে চালু না করা মানে সচেতনভাবে বরিশালবাসীকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

আরেক তরুণ ক্রিকেটার মারুফ বলেন, বরিশালে ক্রিকেটের অফুরন্ত সম্ভাবনা থাকলেও ক্রিকেট বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে তামাশা করা।

ইন্দিরা পাল নামের একজন অভিভাবক জানান, আমার ছেলে ক্রিকেট ভক্ত। ছোটবেলা থেকেই ও সব সময় ক্রিকেটে মজে থাকেন। সে জন্য স্কুলে ও স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলতে নিয়ে আসি। ইচ্ছা ছিল বরিশাল বিকেএসপিতে ভর্তি করাব। কিন্তু সেখানে ক্রিকেট বিভাগ না থাকায় আর ভর্তি করানো হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমি বরিশালে থাকব আর আমার ছোট সন্তান দিনাজপুর-চট্টগ্রাম থাকবে, তা হয় না। এই অভিভাবক দাবি করেন, বরিশাল বিকেএসপিতে ক্রিকেট চালু করা সময়ের দাবি।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের জন্য অনুমতি পেয়েছিল বরিশালের বিকেএসপি। কিন্তু তৎকালীন কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ও অনিয়মের কারণে ২০১৯ সালে অনুমতি বাতিল করে কেন্দ্রীয় বিকেএসপি। ফলে আশার আলো উদিত হলেও তা আবার মুখ থুবড়ে পড়ে। ছিল বাস্কেটবল খেলার অনুমতি। কিন্তু সেটি বন্ধ হয়ে গেছে আরও আগে। বিকেএসপি বরিশাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, মাঠের অনুপযোগিতার কারণে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের অনুমতি বাতিল করা হয়েছিল। ক্রিকেটে সারা বছর প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু শুকনো মৌসুমে চর্চা চালানো সম্ভব হলেও বর্ষা মৌসুমে মাঠে ক্রিকেট চর্চা করার মতো সুযোগ থাকে না।

যদিও উপপরিচালক শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, চেষ্টা করা হচ্ছে বরিশালে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের অনুমতির জন্য। আশা করি দ্রুতই সেই অনুমতি মিলবে।


  • 8
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]