বরিশাল বিভাগে বিনা বিচারে আটক ১১ বন্দির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায়


সারাদেশে ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৫ শতাধিক বন্দি রয়েছে। যাদের বিচার ছাড়াই থাকতে হচ্ছে বছরের পর বছর। আদালতের চূড়ান্ত রায়ে তাদের সাজা হবে কি হবে না, এমন আশা-নিরাশার দোলাচলের মধ্যে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বিচার ছাড়াই বন্দিজীবন পার করতে হচ্ছে তাদের। এদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। এক যুগের বেশি সময় পেরোলেও তাদের বিচার কাজ এগোয়নি। এদের সকলের কারাগারে থাকার বয়স প্রায় ৫ থেকে ১২ বছরেরও বেশি সময়। বিনা বিচারে ৫৪২ জন বন্দি কারাগারে থাকায় সংশ্লিষ্ট বন্দিরা রয়েছেন হতাশার দোলাচলে।যাদের মধ্যে ১১জন রয়েছেন বরিশাল বিভাগের জেলা ভিত্তিক কারাগারগুলোতে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে পটুয়াখালী জেলায় ৩ জন, ভোলায় ৩ জন, বরগুনায় ২ জন এবং বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে একজন করে বিনা বিচারে আটক বন্দী রয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারাগার সূত্র জানায়, সম্প্রতি দেশের মোট ৬৮টি কারাগারের মধ্যে ৫৬টি কারাগারে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ৫৪২ জন বন্দি রয়েছেন। মাদক, খুন, দ্রুত বিচার আইন ও সন্ত্রাস দমন আইনসহ বিভিন্ন আইনে নানা অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বন্দিদের মধ্যে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটজন, গাজীপুরের কাশিমপুরের চারটি কারাগারে ১৩৫ জন, নারায়ণগঞ্জে ৩৭ জন, ময়মনসিংহ কারাগারে ৩০ জন, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৫ জন, কিশোরগঞ্জে নয়জন, নীলফামারী কারাগারে সাতজন, নরসিংদী ও দিনাজপুর জেলা কারাগারের প্রত্যেকটিতে ৬ জন, ফরিদপুর, পাবনা, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে ৫ জন, লালমনিরহাট কারাগারে ৪ জন, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে ৩ জন, মাদারীপুর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ কারাগারে দুইজন করে এবং রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, রংপুর ও নাটোর কারাগারে একজন করে আসামি বিনা বিচারে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি রয়েছে।

এছাড়া চট্টগ্রামে ৯১ জন, কক্সবাজারে ২৮ জন, সিলেটে ১৯ জন, কুমিল্লায় ১৪ জন, খুলনায় ১৩ জন, মৌলভীবাজার ও চুয়াডাঙ্গায় ১১ জন, খাগড়াছড়ি ও ঝিনাইদহে ১০ জন, সাতক্ষীরায় ৯ জন, নোয়াখালীতে ৭ জন, চাঁদপুরে ৫ জন, ফেনী, কারাগারে ৩ জন, সুনামগঞ্জ ও যশোরে ৪ জন, ব্রাহ্মহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, হবিগঞ্জ, কারাগারে একজন বিনা বিচারে বন্দি রয়েছেন।

সংশ্নিষ্ট মামলায় দীর্ঘদিন বন্দি থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, কারাগারের কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাক্ষীর অভাবে তাদের বিচার শুরু হচ্ছে না। আবার কারও অভিযোগে বিচার শুরু হলেও সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। পুরনো এসব মামলার প্রয়োজনীয় অনেক নথি খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে আসামির হাজিরার তারিখই নির্ধারণ হয় না। চার্জশিটে অনেক আসামির নাম বা ঠিকানা ভুল রয়েছে।অনেক সাক্ষীর নামের সঙ্গে ঠিকানার মিল নেই। অনেক আসামির স্বজন বা বাদীপক্ষও মামলায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এসব কারণে বছরের পর বছর কারাগারে আটক এই বন্দিরা।

উচ্চ আদালতের একাধিক আইনজীবী জানান, বিচারহীন অবস্থায় অনেক বিদেশি বন্দিও কারাগারে আটক রয়েছেন। অনেক অভিযুক্ত জঙ্গি রয়েছেন। খোঁজ নিয়ে তাদের ঠিকানা ভুয়া পাওয়া যায়। সাক্ষীদের ঠিকানারও অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এজন্য বিচার কাজ শুরু সম্ভব হয় না। এসব আসামির লোকজন না পাওয়ায় তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার কার্যক্রমে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সকলের একটা অনীহা দেখা যায়।

এবিষয় নিয়ে একাধিক মানবাধিকার সংস্থার কর্মকর্তারা বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেছেন। জাতীয় আইন সহায়তা ও মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) কর্মকর্তা ও আইনজীবী খোন্দকার আবদুল মান্নান বলেন,অনেক বছর ধরে বিচারহীন অবস্থায় বন্দি আসামিদের মুক্তির জন্য আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে এ সংস্থাটি। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ বন্দির মামলার নথি পাওয়া যায় না। সাক্ষী পাওয়া যায় না। অনেক সময় তাদের হাজিরা তারিখও দেয়া হয় না। এসব কারণে মামলার বিচার শুরু হয় না।

ঢাকার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী জাহিদুর রহমান বলেন, এসব বন্দির অনেকে হয়তো ১০ বছর বা আরও বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। তাদের কারও হয়তো সর্বোচ্চ সাজা হবে। আবার এমনও হতে পারে, চূড়ান্ত বিচারে কারও সাজা আরও কম হতে পারে।

অপরদিকে বিনা বিচারে তাদের দীর্ঘদিন বন্দি থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক জানান, বিনা বিচারে একজন মানুষ বন্দি থাকতে পারেন না। এতে মানবাধিকার যেমন লঙ্ঘিত হয়, তেমনি বিচারপ্রার্থী ও আসামিপক্ষ উভয়েই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এবিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আসামিদের বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য সরকার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি এ ব্যাপারে সহায়তার জন্য আইন মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুত ব্যবস্থার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, এসব মামলা কেন দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না, তার কারণও অনুসন্ধান করা হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা এককভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। আইনি প্রক্রিয়ায় সহজ করতে আইন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।

কারা অধিদপ্তরের ডিআইজি প্রিজন্স (ঢাকা বিভাগ ) টিপু সুলতান বলেন, সাধারণত কারাগারের জায়গার তুলনায় বন্দির সংখ্যা বেশি। আবার বিচার ছাড়াই পাঁচ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাগারে আটক এমন বন্দি রয়েছে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি। দীর্ঘদিনেও এসব বন্দির বিচার নিষ্পত্তি না হওয়ায় তাদের নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষও বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছে।

 

 

বিটি/ডিজাগরণ/ডেস্ক


বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।