বিএনপির দ্বিতীয় পরাজয় হলো হরতালে


আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই রাজনৈতিক দল হিসেবেও ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে উৎসাহী করতে পারেনি। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের কথা বললেও এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু কিছু ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও দিনশেষে দেখা গেছে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশিরা কে কি বলল তারচেয়ে মুখ্য হবে নির্বাচিতরা নাগরিকদের কল্যাণে কি কি কাজ করলেন তার হিসাব রাখা।

১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনরায়ে পরাজিত হয়েছেন বিএনপিদলীয় দুজন মেয়র প্রার্থী। কিন্তু পরাজয় মেনে না নিয়ে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকায় হরতাল আহ্বান করেও দেশবাসীর কাছে দ্বিতীয়বার আবারো পরাজিত হলো বাংলাদেশের একদা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপি। গণতন্ত্রের উন্নততর পথে অগ্রযাত্রায় বিএনপির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা এই হরতাল গণরায়ের প্রতিও দলটির এক প্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন বলে আমরা মনে করি। বিপরীত দিকে বিএনপির ডাকা হরতাল প্রতিহত করার কঠোর ঘোষণাও দেখা গেছে সরকারি দল আওয়ামী লীগের সহসম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফের পক্ষ থেকে। অপরদিকে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও নগরের গণপরিবহন স্বাভাবিক রাখার ঘোষণা এসেছে নির্বাচন ও ফলাফলকে কেন্দ্র করে। যেহেতু হরতালের আগে এ নিবন্ধটি লেখা তবু ধারণা করছি সম্ভাব্য হরতাল শেষে গণমাধ্যমে এরূপ সংবাদই পরিবেশিত হবে যে, আগের মতোই এবারো বিএনপির ডাকা হরতালে কোথাও কোথাও সামান্য জনভোগান্তি সৃষ্টি করলেও সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষ বরং হরতালের বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। ফলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরপর দুদিনই বিএনপির ‘ব্যাক টু ব্যাক’ দুটি পরাজয় নিশ্চিত হয়েছে। নির্বাচনী কৌশল কিংবা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কৌশলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি আওয়ামী লীগের কাছে সামগ্রিকভাবে পরাজিত হয়েছে। আর হরতাল আহ্বানের মাধ্যমে গণচাহিদার কাছেও পরাজিত হয়েছে বিএনপি। নগরের মানুষ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের মেয়র হিসেবে উভয় সিটি করপোরেশনের নাগরিকরা বেছে নিয়েছে- নির্বাচিত করেছে।

বহু প্রতীক্ষিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষে সাধারণের ভোটে যারা বিজয়ী হয়েছেন তাদের সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। জনগণের গণতান্ত্রিক রায়ে নির্বাচিত হয়েছেন দুজন মেয়র এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনসহ ১৯৭ জন কাউন্সিলর। মেয়ররা প্রশাসনিক কাঠামো অনুসারে ‘মেয়র’। কিন্তু আমরা অনেক সময় জনরায়ে নির্বাচিত এই পদ-পদবিকে প্রতীকায়িতভাবে ‘নগরপিতা’ বলে ‘নগরের অভিভাবক’ বলে অভিহিত করে থাকি। যদিও নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে অন্য অনেক প্রতিশ্রুতির মতো এরূপ প্রতিশ্রুতি নিয়েও হাজির হয়েছিলেন যে, তারা ‘নগরপিতা’ নন বরং নির্বাচিত হলে তারা নগর ও নাগরিকদের ‘সেবক’ হিসেবে কাজ করতে চান। ঢাকাবাসী তাদের ভোটে পছন্দের দুজন মেয়র নির্বাচিত করেছে। এখন নবনির্বাচিত দুজন মেয়র তাদের পূর্বোক্ত প্রতিশ্রুতি রাখবেন- নগরবাসী সেই প্রত্যাশায় আগামী বছরগুলো যাপন করবে। কিন্তু আমরা চাই গতানুগতিক চিন্তা-চেতনার বাইরে এসে সৃষ্টিশীল ও সাহসী ভাবনার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকের মৌলিক চাহিদাগুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নবনির্বাচিত মেয়ররা পূরণ করবেন। নাগরিকদের প্রত্যশার প্রহর তারা দীর্ঘায়িত করবেন না। সাধারণের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ে টেকসই কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বিশ্বের যে কোনো নগরের চেয়ে ঢাকাবাসীই বেশি বঞ্চিত।

নগরবাসীর সব বঞ্চনার অবসানে নবনির্বাচিত মেয়ররা যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। অনেকেই বলে থাকেন নগর হিসেবে ঢাকা যেন এক স্থবিতার নাম, এক স্তব্ধ শহরের নাম। মাঝে মাঝে নানামুখী অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই ঢাকাই আবার ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কের নাম হিসেবেও মূর্তমান হয়ে ওঠে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত- এই ছয়টি ঋতুতে রাজধানী ঢাকার সংকটও ঋতুবৈচিত্র্যের মতোই ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। একদিকে বছরব্যাপী যানজটের স্থবিরতায় স্তব্ধ হয় ঢাকা, বর্ষায় জলজটে নাকাল হয়ে পড়ে ঢাকা। আর সাম্প্রতিককালে ডেঙ্গুর প্রকোপে এই ঢাকা হয়ে উঠেছিল এক দীর্ঘকালীন ও ভয়ঙ্কর আতঙ্কিত নগরীর নাম। শহরজুড়ে ডেঙ্গু- সর্বত্র ডেঙ্গু। তখন নগরী ছেড়ে মানুষ ছুটে গেছে গ্রামে। সে সময় নগর-ছাড়াদের মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র দেশে। বাংলাদেশের কোনো জেলা ডেঙ্গুর সংক্রমণ থেকে মুক্ত ছিল না। ঢাকা থেকেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল মহামারীর আকারে দেখা দেয়া ডেঙ্গু। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতায়ও বিশ্বের আধুনিক যে কোনো শহরের তুলনায় ঢাকার অবস্থান অনেক নিচে। কোনো দেশের কোনো নগরীর সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঢাকার তুলনাই করা চলে না। ঢাকার স্তব্ধতা ও স্থবিরতা দূর করতে হবে নবনির্বাচিত মেয়রদেরই। নবনির্বাচিত মেয়র ও তাদের সহকর্মী কাউন্সিলরদের কাছে নগরবাসীর এমনই প্রত্যাশা যে, তারা খুব দ্রুতই দূর করতে সক্ষম হবেন রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতাও। আবার উন্নয়ন প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত না করে বরং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে জনভোগান্তি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেবেন তারা। ঢাকা ও ঢাকাবাসীর জন্য নতুন উপদ্রব হিসেবে সৃষ্ট বায়ুদূষণের কবল থেকেও নগরবাসীকে নবনির্বাচিতরা তাদের আন্তরিকতার মাধ্যমে পরিত্রাণ করবেন। সর্বোপরি, একটি পরিবেশবান্ধব আধুনিক ঢাকা আমাদের উত্তর প্রজন্মকে দিয়ে যেতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তারা আমাদের ক্ষমা করবে না।

আমরা জানি, মুহূর্তের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু পরিকল্পিত, বৈচিত্র্যপূর্ণ, সৃষ্টিশীল ও সমন্বিত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নানা দিক দিয়ে ঢাকার বর্তমান স্থবিরতা থেকে, স্তব্ধতা থেকে এবং সর্বোপরি অনাকাক্সিক্ষতভাবে উদ্ভূত হওয়া যে কোনো আতঙ্কিত পরিবেশ থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্ত রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে নবনির্বাচিত মেয়রদ্বয় ও তাদের সঙ্গে বিজয়ী হওয়া কাউন্সিলরদের। জনভোগান্তি থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে পারাই একদিকে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সার্থকতা এবং অপরদিকে এই সার্থকতার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে গণতন্ত্রের সাফল্য। সব দুর্যোগ ও আতঙ্ক থেকে নগরবাসীর মুক্তি না ঘটলে নির্বাচনের এই বিজয় যেমন ক্রমশ স্নান এবং আনন্দহীন হয়ে পড়বে তেমনি গণতন্ত্রও লজ্জায় মুখ লোকানোর চেষ্টায় মারিয়া হয়ে উঠবে! আপনাদের বিজয়ের আনন্দ অম্লান থাকুক, অটুট থাকুক গণতন্ত্রের সাফল্যধারা।

অনেকেই এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নানারূপ কল্পিত শঙ্কার যে ডামাঢোল বাজিয়েছিল নির্বাচনের দিনে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া আমরা তার কোনোরূপ লক্ষণ দেখিনি। শঙ্কা যে কোনো বিষয় নিয়েই থাকতে পারে। তবে সচেতনতার মাধ্যমে সব প্রকার প্রকার শঙ্কা ও আশঙ্কা এড়িয়ে চলা সম্ভব। এবার সেটি অন্তত প্রমাণিত হয়েছে। এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেই প্রস্তুতি ছিল বলে সার্বিক পরিস্থিতিদৃষ্টে বলা যায়। সব পক্ষ থেকেই সেই সহযোগিতা ছিল। আবার এমনো বলা যেতে পারে যে, নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার বিষয়ে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী এবং ভোটারদের মধ্যেও যে এক প্রকার সহনশীলতা প্রদর্শন জরুরি তা এবার নির্বাচন-পূর্বকালে দেখা গেছে। আমরা মনে করি ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নির্বাচনে বিজয়-অভিলাষী দুই বা ততধিক প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীর দুটি পক্ষ এবং ভোটার এই ত্রিবিধ পক্ষগুলোর মধ্যেও আপাতদৃষ্টে সহনশীলতা লক্ষ করা গেছে। এজন্য ভোটারসহ প্রার্থীরাও ধন্যবাদ ও সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। তবে, ভোট কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতির স্বল্পতা আমাদের অনেকটাই হতাশ ও বিস্মিত করেছে।

নাগরিকরা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ থেকে কেন নিজেদের এরূপ বিচ্ছিন্ন রাখলেন, গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখলেন তা গভীর এক চিন্তার বিষয়। সাম্প্রতিককালে জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনেই আমরা লক্ষ করছি ভোটার উপস্থিতির স্বল্পতা। সাধারণের মধ্যে ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার এই প্রবণতা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। কিন্তু গণতন্ত্রচর্চায় সরাসরি ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সুখকর বিকল্প খুব কমই আছে। অনেকে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনীহাকে ইভিএম-এ ভোট গ্রহণের পদ্ধতিকে দোষারূপ করছে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা আসলে ইভিএম সংক্রান্ত উন্নাসিকতা নাকি অন্যত্র তার অনুসন্ধানও জরুরি। তবে প্রাথমিকভাবে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল শুরু থেকেই ইভিএম-এ অনস্থা, নির্বাচন কমিশনে অনস্থা এবং সরকারের প্রতি অনস্থা এতটাই প্রকটভাবে প্রচারের চেষ্টা করেছে যে, সাধারণভাবে জনগণ বিশেষ করে নাগরিকদের মনে এরূপ ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, এত আস্থাহীনতার মধ্যে নাই বা গেলাম!

আবার বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পর সব কিছুর প্রতি তাদের ঢালাও অনাস্থার প্রচার ভোট কেন্দ্রে ভোটার না আসায় প্রভাব ফেলেছে। সব কিছুতেই যদি তাদের ‘অনাস্থা’ থাকে তাহলে ভোটাররা কোনো কারণে ভোট কেন্দ্রে যাবে? আর কোনো অলৌকিক কারণেই বা বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল তাও সাধারণের কাছে অস্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। যাহোক, মোদ্দাকথা হলো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই রাজনৈতিক দল হিসেবেও ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে উৎসাহী করতে পারেনি। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের কথা বললেও এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু কিছু ত্রুটি থাকা সত্তে¡ও দিনশেষে দেখা গেছে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। আমরা যে সব সময় বিদেশিদের দিকে তাকিয়ে তাদের মন্তব্য শোনার আগ্রহ নিয়ে বসে থাকি তারও যৎকিঞ্চিৎ উত্তর ব্রিটিশ হাই কমিশনার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতসহ বেশ কিছু পর্যবেক্ষক সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছেন। তবু আমরা এ কথায়ই শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখতে চাই যে, বিদেশিরা কে কি বলল তারচেয়ে মুখ্য হবে নির্বাচিতরা নাগরিকদের কল্যাণে কি কি কাজ করলেন তার হিসাব রাখা। হরতালের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আগামী বছরগুলো উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার নিয়ে ঢাকার মানুষ বাঁচতে চায়।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]