বিএনপি শাসনামলের নির্যাতন আজও ভুলতে পারেনি লালমোহনবাসী


‘বিএনপি আসলে আমাদের ভয় লাগে। একবার যা নির্যাতন করছে! আমি সারারাত এক ধান ক্ষেতে ছিলাম। তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ছিল। শীতে কেবল কাঁপি, মনে হচ্ছিল মরেই যাব। সেই কথা মনে পড়লে এখনও ভয় লাগে। আমরা কোনো রকমে খাইটা-পিটা খাই। ভারতে যাব, এমন অর্থ-সম্পদ নাই। এখন তো নির্বাচন আইছে! যদি বিএনপি আসে, তারা যদি ডাংকাবাজি না করে, কোনো সমস্যা নাই। আর যদি ডাংকাবাজি করে, তাহলে আবার আমাগো দৌড়-ঝাঁপ শুরু হবে, এতে কোনো সন্দেহ নাই।’

মলিন মুখে কথাগুলো বলছিলেন ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরদিন ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার অন্নদাপ্রসাদ গ্রামে বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবের শিকার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের রিংকু দাস। কথাগুলো বলতে বলতেই তার চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ছিল আতঙ্কের ছায়া।

কেবল রিংকু দাস নয়, ওই গ্রামের বাসিন্দা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় সবাইই সেদিন শিকার হয়েছিলেন ওই তাণ্ডবের। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বাস করা একই গ্রামের লোকজন কিভাবে এমন ঘৃণ্য রাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠে পাশবিক নির্যাতন চালায়, সে হিসাব আজও মেলাতে পারেননি অনেকেই।

লালমোহনের অন্নদাপ্রসাদ গ্রামে সরজমিন ঘুরে নির্যাতিত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনের পরদিন রাত ১০টায় লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিংস এলাকার অন্নদাপ্রসাদসহ কয়েকটি গ্রামে তাণ্ডব চালিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের শত শত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঘর-বাড়িতে হামলা চালায় তারা। পরিবারের সদস্যদের সামনে নারী, শিশু, এমনকি ও গর্ভবতী নারীদেরও ধর্ষণ করা হয়। কেবল হিন্দু নয়, মুসলমান নারীদেরও নির্যাতন করেছিল সন্ত্রাসীরা।

আওয়ামী লীগ করার অপরাধে নির্বাচনের দুই দিন পর ইলিশা গ্রামের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আ. মালেক মিয়ার চোখ তুলে নিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। পুড়িয়ে দিয়েছিল তাদের তিনটি বসত ঘর। অনেককেই কয়েক পুরুষের ভিটা-বাড়ি বিক্রি করে ভারতে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। যারা যেতে পারেননি, তারা আশঙ্কা করছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবার হয়তো তাদের একই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে।

অন্নদাপ্রসাদ গ্রামের রিংকু দাস আর গৌরাঙ্গের অন্যের জমিতে কামলা খেটে জীবন চলে। এই দম্পতির বড় কন্যা রিতার বয়স তখন ৯ বছর। মাকে না পেয়ে ৯ বছরের রিতাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেছিল সন্ত্রাসীরা। একই সময়ে ভেন্ডার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল শতাধিক হিন্দু নারী ও পুরুষ। নির্যাতনের স্মৃতি এখনও তাদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। তারা বলছেন, এবারের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাদের ছাড়তে হবে দেশ।

নির্যাতিত রিতার মা গৌরাঙ্গ দাস বলেন, সন্ত্রাসীরা স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ির সামনে মা ও বোনকে নির্যাতন করেছে। ছেলে-মেয়েদের মাঠের মধ্যে ছুঁইড়া ফেলে দিছে। আমারে না পাইয়া আমার ৯ বছরের রিতা মনিকে ওরা নিয়া গেছে। মাইয়ার তো খোঁজ নাই! মাইয়াকে অজ্ঞান অবস্থায় পরদিন কুড়াইয়া পাইছি মাঠের মধ্যে।

ভেন্ডার বাড়ির এক নারী বলেন, আমাদের বাড়ির আশপাশে কোনো রাস্তা ছিল না। বাড়ি ভিতরে দেখিয়া অনেক মানুষ আশ্রয় নিছিল। হঠাৎ করে বাড়িতে হামলা করে। আমরা বাড়ির পাশের ধান ক্ষেতের জলের মধ্যে পলাইয়া ছিলাম। কোথায় ছেলে-মেয়ে, হুঁশ ছিল না। আমার ৯ বছরের মেয়েটারে যা অত্যাচার করেছে! ওই কথা মনে পড়লে এখানে থাকার মন করে না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে অনেক গিরস্থ (গৃহস্থ) ছিল। সবাই ভারতে চলে গেছে। এখন আমরা দুই ঘর আছি। ভবিষ্যতে কী করে থাকমু, কইতে পারি না। বিএনপি আসলে ভালো হয়, না খারাপ হয়— ঠাকুরই ভালো জানে।’ এখনও ওইসব সন্ত্রাসীরা এলাকায় ঘুরে বেড়ায় বলে জানালেন তিনি।

ইলিশা গ্রামের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আ. মালেক মিয়া বলেন, আমি আওয়ামী লীগ করতাম। সেই অপরাধে মেজর হাফিজের নির্দেশে ১৫/২০ জন সন্ত্রাসী বাহিনী গরুর খুডা দিয়া আমার দোনোডা চোখ উঠাইয়া দিছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন অবশ্য বিএনপির জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, এখন আর আগের দিন নেই। বর্তমানে লালমোহন ও তজুমদ্দিনে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রজনীতিতে বিশ্বাসী। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর মেজর হাফিজ তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে। এসব করার আর সুযোগ বা অবস্থা এখন নেই।

শাওন বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগের বিশাল জনগোষ্ঠী সেই বিএনপি সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করার সক্ষমতা রাখে। তাছাড়া, আমাদের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া আছে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিরাপদে বাড়ি যেতে পারেন, তারা সেই ব্যবস্থা নেবে। তাই আশা রাখি, ভোটাররা এবার নির্বিঘ্নে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন বিএনপির হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম। এর মধ্যে ১৯৯১ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছিলেন, পরের দুই বার জয় পান ধানের শীষ প্রতীকে। পরে ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জসিম উদ্দিন ও ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন জয় পান।

এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরীসহ প্রার্থী রয়েছেন চার জন। এর মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিএনপির হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এছাড়া, লাঙ্গল প্রতীকে নুরুন নবী (সুমন) ও হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মোসলেহ উদ্দীনও নির্বাচন করছেন এই আসন থেকে।

  • সূত্র: সারাবাংলা

বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।