বিপ্লবের ধারাভাষ্যকার কবি ‘পাবলো নেরুদা’র জন্মদিন আজ


পরাবাস্তব বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদা। কলোম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মারকেজ এর মতে নেরুদা কুড়ি শতকের যে কোনো ভাষার অন্যতম কবি। পাবলো নেরুদার আসল নাম নেফটালি রিকার্ডো রেইয়েস বাসোয়ালটো। তাহলে ‘পাবলো নেরুদা’? পাবলো নেরুদা ছদ্মনাম। জা নেরুদা ছিলেন একজন চেক কবি। নেরুদা শব্দটা নিয়েছেন ওখান থেকেই। আর পাবলো? সম্ভবত ফরাসি কবি পল ভার্লেইন থেকে নেওয়া।


কিন্তু, ছদ্মনাম কেন? প্রথমত ছদ্মনাম নেওয়া অনেকটা সেকালের প্রথা। আর দ্বিতীয় কারণ; বাবার চোখ এড়ানো। নেরুদার বাবা ছিলেন কট্টর নীতিবাগীশ— চাইতেন ছেলে কবিতা-টবিতা না লিখে বাস্তবসম্মত কিছু একটা করুক। নেরুদার বাবা চাকরি করতেন রেলওয়েতে। মা ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা।

তাঁর জন্মের কিছু দিন পরেই অবশ্য মা মারা যান। কয়েক বছর পর ছোট্ট নেরুদা বাবার সঙ্গে টিমুকো শহরে চলে আসেন। নেরুদার বাবা বাস্তববাদী বলেই আবার বিয়ে করেন। নেরুদার শৈশব, কৈশোর ও তরুণ বয়েস কেটেছিল টিমুকো শহরেই। অতি অল্প বয়েসেই লেখালেখি শুরু। মাত্র তেরো বছর বয়েসেই লেখা ছাপানো। ষোল বছর বয়েসে পুরোদস্তুর লিখিয়ে।

টিমুকো শহরেই কবি গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল-এর সঙ্গে পরিচয়। মিস্ত্রাল মেয়েদের স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। মিস্ত্রাল পছন্দ করতেন নেরুদাকে। কবিতা লেখার জন্য যোগাতেন উৎসাহ। বলতেন— ‘বাবার কথা বাদ দাও, তুমি লিখে যাও।’ ১৯২১ সাল।

চিলির রাজধানী সানতিয়াগো শহরে চলে গেলেন তরুণ নেরুদা। ভর্তি হল চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ে— ফরাসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। ইচ্ছে, শিক্ষক হওয়া; অথচ সে সময় কবিতায় পেয়ে বসেছে তাঁকে। ১৯২৩ সালে বেরুল প্রথম কাব্যগ্রন্থ— ‘গোধূলির বই।’ পরের বছর প্রকাশিত হল ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি বেপরোয়া গান।’

কবির বয়স কম, কাজেই বইটি তুমুল হইচই ফেলে দিল। সমালোচক মহলে দারুন প্রশংসিত হল বইটি আর নানা ভাষায় অনূদিতও হল। ১৯২৭ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত নেরুদা চিলি সরকারের রাস্ট্রদূত নিযুক্ত হলেন তৎকালীন বার্মা, শ্রীলঙ্কা, জাভা, সিঙ্গাপুর, আর্জেন্টিনা ও স্পেনে। যতই সরকারি কাজ থাক না কেন, কবিতা লেখাও চলছিল।

স্পেনে থাকাকালীন সেখানকার বিদগ্ধ কবি লোরকাকে চিনতেন নেরুদা। স্পেনিশ জাতীয়তাবাদীরা লোরকাকে খুন করে বসে! সেইসব প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন চলছিল। নেরুদাও সে সংগ্রামে শরিক হয়েছিলেন। প্রথমে স্পেনে পরে ফ্রান্সে। ফ্রান্সে পরাবাস্তবাদ ততদিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

১৯৩৭ সালে নেরুদা দেশে ফিরে এলেন। চিলির রাজনীতি ও সামাজিক ইস্যূতে পড়লেন জড়িয়ে। ১৯৩৯ সালে আবার প্যারিস এলেন। নিযুক্ত হলেন কনসাল ফর দ্যা স্পেনিশ ইমিগ্রেশন। এর কিছুকাল পরে মেক্সিকোর কনসাল জেনারেল নিযুক্ত হন। সে সময়ই লিখলেন তাঁর বিখ্যাত ‘ক্যান্টো জেনেলের দ্য চিলি।’

এটি মূলত দক্ষিণ আমেরিকার মহাদেশ নিয়ে একটি মহাকাব্য। বিষয়: প্রকৃতি, জনগন, ইতিহাস ও নিয়তি। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয় মেক্সিকোয়। বইটি দশটি ভাষায় অনুদিত হয়। ১৯৪৩ সালে নেরুদা চিলিতে ফিরে এলেন। ১৯৪৫ সালে সিনেটর নির্বাচিত হলেন। চিলির কমিউনিস্ট পার্টিতেও যোগ দিলেন। ১৯৪৭ সাল। চিলির খনি শ্রমিকরা চিলির কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিভিন্ন দাবীদাওয়ায় বনধ ডেকেছে।

চিলি প্রেসিডেন্ট তখন গোনজালেস ভিডেলা— ভারি রক্ষণশীল লোক। তিনি চিলির কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করার উদ্যেগ নেন। নেরুদা তীব্র প্রতিবাদ করলেন। নেরুদাকে গ্রেফতার করার জন্য ওয়ারেন্ট ইস্যূ করার নির্দেশ দিলেন। চিলির বন্দরনগরী ভালপারাইসো; সেখানেই এক বন্ধুর বাড়ির বেসমেন্টে কবি লুকিয়ে থাকলেন কয়েক মাস।

চিলির পূবে আর্জেন্টিনার সীমান্ত। সীমান্তে সুউচ্চ পাহাড় ও মাইহুই হ্রদের গভীর নীল জল। কবি সে পথে লুকিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। এবার আবার গেলেন ইউরোপ, প্রথমবারের মতো সোভিয়েত ইউনিয়ন ও দ্বিতীয়বারের মতো মেক্সিকো। কবিতা লেখাও চলছিল। ১৯৫২ সালে চিলি ফিরে এলেন কবি। কেননা, ঐ বছরই কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

সালভাদর আলেন্দে ছিলেন চিলির বিশিষ্ট সমাজতন্ত্রী নেতা; তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ট হলেন নেরুদা। ১৯৭০ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেন সালভাদর আলেন্দে। তাঁরই বিশেষ অনুরোধে ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত ফ্রান্সে চিলির রাষ্ট্রদূত হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন নেরুদা। ১৯৭৩ সালে চিলির স্বৈরাচারী জেনালের পিনোশে সমাজতন্ত্রী আলেন্দেকে হত্যা ও উৎখাত করে। নেরুদা সে সময় চিলির এক হাসপাতালে, ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন।

কবি হার মানলেন। সমগ্র বিশ্ব শোকে নিমজ্জিত হয়। স্বৈরাচারী পিনোশে কবির শেষকৃত্যের অনুমতি দেননি। খলনায়কটি সান্ধ্যআইন জারী করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ কারফিউ উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে এসে কবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেয়। সেটিই ছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে চিলির জনতার প্রথম বিক্ষোভ।


বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।