ভাইস চ্যান্সেলরে প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তিযোগ

  • 258
    Shares

অনুপ চক্রবর্তী : কয়েক মাস আগেই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক হওয়া ভাইস চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে মাসব্যাপী আন্দোলন করেন সেখানের শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও সেখানকার ভাইস চ্যান্সেলরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের ফেসবুকে একজন শিক্ষার্থীকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে শাসানোর কল রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে; বহিষ্কার করা হয় শিক্ষার্থীকে।

 

এটাকে কেন্দ্র করে এখন বশেমুরবিপ্রবিতে চলছে ভিসির অপসারনের জন্য দুর্বার আন্দোলন। এসব আন্দোলনে বোঝা যায় ভিসি নিয়ে আলোচনার এদেশে স্থায়ী সমাপ্তির আপাতত কোনো সম্ভাবনাই নাই। সারাদেশে চলমান ধর্ষণ, দলীয় ব্যাজ লাগিয়ে সকল ধরনের অপকর্ম করেও পার পেয়ে যাওয়া, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় লাগামহীন দুর্নীতির বিভিন্ন খবর বিরতিহীনভাবে টক অব দ্যা কান্ট্রি থাকে। এগুলোর পাশ কাটিয়ে মাঝে মাঝে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্য মূল আলোচনায় জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। এটা ছাড়া ইতিবাচক তেমন কোন কিছুই দেখা যায় না যা নিয়ে গোটা দেশ আলোচনা করতে পারে।

তবে অবাক কান্ড হলেও এটাই সত্য যে, এতো এতো সব নেতিবাচক খবরের ভিড়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা করে আলাদাভাবে নিজেদের টক অফ দ্যা কান্ট্রিতে পরিণত করতে এদেশে ভিসি মহোদয়রা ওস্তাদ। এতে যেটা হয় তা হচ্ছে ভিসি’র নাম কেউ বলেন না; ভিসি’র সাথে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকে সংযুক্ত করে আলোচনা হয়ে থাকে যার কু-প্রভাবে হীনমন্যতায় ভোগেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষকগণ এবং অধ্যয়নরত সকল শিক্ষার্থী।

 

ভিসি- আসলে কেমন পদ তা চেনানোর জন্য বিশেষ কোনো প্রয়াসের দরকার হয় না। দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো বিভাগের, ভিসি উপস্থিত আছেন এমন জমায়েতে গেলে দেখা যাবে ভিসিকে উপস্থাপনের আগে নামের আগে একশ’ একটা বিশেষণ যোগ করে তারপরে মহামান্য’র নাম নেওয়া হয়। আর এসব বিশেষণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে যেটা বলা হয় সেটা হচ্ছে “আমাদের অভিভাবক”। অর্থাৎ একজন ভিসি হচ্ছেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সব ধরনের অস্থায়ী পদে চাকরীরতদেরও একমাত্র অভিভাব।

 

এই অভিভাবকত্বের ভার বহন করা যে একদমই সহজ নয় তা হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নেতিবাচকভাবে আলোচনায় আশাকেই সহজলভ্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ওয়েবসাইটে গিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের পাতাটি খুললেই দেখা যায় তাদের ঝুলিতে রয়েছে নানান জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অর্জন যেসব নিয়ে শিক্ষার্থী মাত্রই গর্ব অনুভব করে থাকবেন তাদের ভিসি মহোদয়কে নিয়ে। কিন্তু এদেশের ভিসিদের বিগত এবং চলমান নানান অনিয়ম এবং স্বেচ্ছাচারিতার খবর নতুন করে আবার প্রমাণ করে, বিদ্বান সব সময় সজ্জন হন না বরং ভিসিদের বেলায় অধিকাংশ সময়ই তারা দুর্জন হন। তবে এই দুর্জন রূপের সব দিক সবার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।

 

কারণ এদেশে ভিসি মাত্রই একদল বিশেষ শিক্ষক দ্বারা সদা গার্ড অফ অনার প্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব, যাদের দেওয়াল ভেদ করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা ভিসিদের কর্ণগোচর হওয়া মোটামুটি অসম্ভব একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল। তবে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ব্যানার পরিহিতরা এদেশে সকল সরকারের আমলেই ছিলেন অসাধারণ শিক্ষার্থী যাদের সাথে মধ্যরাত বা মধ্য দুপুর কিংবা গোপনে অনেক সময় অনেক ভিসি শত ব্যস্ততার মধ্যেও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে লিপ্ত হয়েছেন বলে আমরা দেখেছি। এই অসাধারণদের মার-প্যাঁচে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের স্বীকৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, নির্যাতিত হন অহরহ।

 

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়া এমন কোনো পাহাড় কাধে তোলার মতন কঠিন কাজ নয়। সততা, কর্তব্য ও দায়িত্ববোধ এবং নিজের নৈতিক মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হলেই তিনি হয়ে উঠতে পারেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী’র শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, তাদের গর্বের জায়গা। কিন্তু কেন জানি কোনো এক অদৃশ্য অপশক্তির প্রভাবে এদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা এরকম ভিসি পান না। তাদের দেখতে হয় ভিসি’র অফিসে চা-নাস্তা খরচের লক্ষ লক্ষ টাকার ভাউচার, তাদের ক্লাস বন্ধ করে রাস্তায় দাঁড়াতে হয় কোটি টাকার গোবর বানিজ্যের বিরোধিতা করতে, তাদের আমরণ অনশন শুরু করতে হয় ভিসি কর্তৃক বাপ তুলে অপমানসূচক কথার বিচারের জন্য। অথচ এসব করতে এরা কেউই মেধাতালিকায় জায়গা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন নাই। এরা সবাই জ্ঞান অর্জন করতে এসেছেন, দেশকে কিছু দেবার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে এসেছেন।

 

আমরা আসলেই এমন ভিসি চাই না যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সময় না দিয়ে অন্য কাজকে বেশি প্রাধান্য দেন; যিনি নিজের জ্ঞান-গরিমার অহমে, পদের ভরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পিশে মারেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলো ঠিকঠাক চলছে কি না সে খবরটুকু নেবারও সময় যার হাতে নাই; যিনি বাপ তুলে অপমানজনক কথা বলতে মোটেও দ্বিধা করেন না। ভিসি মহোদয়ের কাছে আমরা কখনোই অনেক কিছু চাই না!

 

আমরা শুধু এমন একজন ভিসি চাই যার নামের পূর্বের বিশেষণগুলো বিভাগের শিক্ষকদের লিখে দেওয়া লাগবে না; আমরা নিজেরাই মন থেকে শ্রদ্ধাভরে তাকে বিশেষিত করতে পারব। সকল চাহিদার বা সমস্যার যে রাতারাতি সমাধান হয় না এটা আমরা বেশ ভালো করেই জানি। আমরা তো শুধু চাই ভিসি আমাদের মিথ্যে আশ্বাস না দিয়ে সত্য বলুক। আমরা তো শুধুই এমন একজন ভিসি চাই যিনি প্রকল্পের টাকা ভাগাভাগি না করে মাঝে মাঝে আমাদের ক্লাসরুমে এসে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করুক আমরা কেমন আছি! আমরা আসলে তেমন একজন ভিসি চাই যিনি আমাদের স্বপ্ন দেখাবেন; যাকে আদর্শ ধরে আমরা নিজেদের তৈরী করব দেশ গড়ার এক একজন কারিগর হিসেবে।

লেখকঃ অনুপ চক্রবর্তী
শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]


  • 258
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]