মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতি এমন উল্লসিত সমর্থন কেন?

  • 33
    Shares

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : বরগুনায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে মানুষ হত্যাকারী নয়ন বন্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। এটুকু খবর। কিন্তু খবরের চেয়ে বেশি খবর হলো, ফেসবুকে এই বন্দুকযুদ্ধের প্রতি ব্যাপক সমর্থন লক্ষ করা গেলো। সাধারণ ফেসবুকাররা তো আছেই, দেখা গেলো এমনসব ব্যক্তি বিচারের বাইরে অপরাধীর এভাবে মৃত্যুকে উল্লাসের সঙ্গে সমর্থন করছেন, যাদের মধ্যে মানবাধিকার কর্মী আছেন, সরকারি চাকরিজীবী আছেন, শিক্ষক আছেন, আইনজীবী আছেন।

বিচারের বাইরে বিচারের প্রতি এমন জনসমর্থন দেশে বিচারিক প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। মানুষ ধরেই নিয়েছে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় বড় অপরাধীদের শাস্তি হয় না। বরগুনায় কলেজছাত্র রিফাতকে হত্যা করা কয়েছে কুপিয়ে, শত শত মানুষের সামনে। তার স্ত্রীর একার প্রতিরোধ খুনিদের নিবৃত্ত করতে পারেনি। ভয়ঙ্কর, নৃশংস, লোমহর্ষক এই ঘটনা সারা দেশকে নাড়া দেয়। বিচারের দাবি ওঠে এবং দেখেছি আমার চেনাজানা শিক্ষিত সম্প্রদায় অনেকেই ফেসবুকে আসামিদের ক্রসফায়ার করার দাবি করে স্ট্যাটাস দিচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হওয়ায় তারা এখন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন।

নয়নের একটা গ্যাং ছিল, বাহিনী ছিল। তারা প্রকাশ্যে সহিংসতা করতো, মাদক বাণিজ্য করতো। প্রশ্ন হলো কোনও না কোনও বড় ক্ষমতাধর তাদের পেছনে না থাকলে আজকের যুগে এত সাহস কারও পক্ষে দেখানো কি সম্ভব ছিল? নয়ন মরে যাওয়ায় বা সরে যাওয়ায় সেই ক্ষমতাধররা এখন অনেকটা স্বস্তিতে থাকবেন বলেই ধারণা করছি।

‘বন্দুকযুদ্ধ’ তথা ‘ক্রসফায়ারে’ খুনি বা সন্ত্রাসীকে বিচার করার দাবি তোলার অর্থ হলো অন্যায়কে শায়েস্তা করতে প্রতি-অন্যায় করা। খুব অবাক করা ব্যাপার হলো এই চমৎকার উপায় আবার প্রবল জনসমর্থনও পাচ্ছে। মানুষ ‘রবিনহুড’ বা ‘দস্যু বনহুর’ ডাকাতকে বড় ভালোবাসে, এবং মনে করে, অন্যায়কারী হতে অন্যায়ভাবে সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝে কোনও অন্যায় নেই। চোখের বদলা চোখ, খুনের বদলা খুন করার আকাঙ্ক্ষা এরকম অসংখ্য ব্যক্তির থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটিকে কি নীতি হিসেবে গ্রহণ করা যায়? বিশেষ করে রাষ্ট্রের ভাবনা ভিন্ন হতে হয়, কারণ রাষ্ট্রকে ক্ষুদ্র ব্যক্তি-ধারণার ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে হয়। রাষ্ট্র যদি অন্যায় পদ্ধতি গ্রহণ করে, তাহলে সে অপরাধীর তুলনায় উন্নত হলো না। এরকম হলে বলতে হবে রাষ্ট্র অপরাধীদের সমান অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

রিফাতের ঘটনার আগে আমরা বিশ্বজিতের ঘটনা দেখেছি। হাজারো মানুষের চোখের সামনে রামদা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করার সেই দৃশ্য ভুলবার নয়। বরগুনার ঘটনার পর আবার দেখলাম চট্টগ্রামে যুবলীগের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে একজনকে সাপ পেটানোর মতো করে পিটিয়ে চলেছে একদল যুবক। এসব দেখে মানুষ আসলে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, অপরাধ এবং শাস্তির ভারসাম্যটি ঠিক কেমন হবে। একের পর এক মর্মান্তিক অপরাধের ভারে জর্জরিত বাংলাদেশের সমাজ আজ সমাধান খুঁজছে। সমাজকে সভ্য হতে হলে অপরাধের যৌক্তিক বিচার হতে হবে। বিচার পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সেটি নিশ্চিত করতেই হবে, আর কোনও গত্যন্তর নেই।

বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগে আইনি হেফাজতেই যখন অস্বাভাবিকভাবে অপরাধী মারা যায়, তখন যদি এরকম একটা রব উঠে ‘বেশ হয়েছে’, তাহলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা বলে আর কিছু থাকে না। অভিযুক্তেরও যে অধিকার আছে, আমরা সেটা ভুলেছি। এটা নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়। অপরাধ যতই নৃশংস হোক, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার পেছনে যতই মহৎ আদর্শ বা যৌক্তিক দাবিদাওয়া থাকুক, তাতে করে অপরাধীর অধিকার চলে যায় না। অনেকে আমাকে ভুল বুঝবেন কিনা জানি না। আসলে অপরাধের বিরুদ্ধে বলা আর অপরাধীর অধিকারের পক্ষে বলা, এ দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। নৃশংসতম অপরাধের ক্ষেত্রেও অভিযুক্তের মানবাধিকার আছে, বিচারের আগেই পুলিশি তৎপরতায় মৃত্যু কোনও অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। সত্যি বলতে এগুলো আমরা জানি। তাহলে এই শোরগোল কেন? বিচারের পরে অভিযুক্তের কঠোরতম সাজা হতোই এবং সেটাই কাম্য। তার আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার প্রতি এমন উল্লসিত সমর্থন কেন? বিলম্বে বিচার যেমন আকাঙ্ক্ষিত নয়, চটজলদি বিচারও কিন্তু বিচার নয়।

বিচার-টিচার খুবই ঝামেলার, তাই দ্রুত অভিযুক্তকে শেষ করে ফেলাই শ্রেয়—এই তাড়না এখন আমাদের। নিঃসন্দেহে আমাদের প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় ঢিলেমি আছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যায় আমরা দেখলাম তদন্ত হতে বছর পেরিয়ে যায়, অপরাধীদের আদৌ চার্জশিট দেওয়া হবে কিনা কেউ জানে না, শুনানি শেষ হতে দশক গুনতে হয়, আর অন্তিম ফললাভ হতে কত যুগ অপেক্ষা করতে হবে, কে জানে। এই ধীর গতি অনেক সময় প্রভাবশালী অপরাধীকে আড়াল করার কারণেও ঘটে। তারপরও ঝটপট বিচার করে ফেলার প্রতি এমন প্রবল সমর্থন সমাজে বড় অন্যায়ের জন্ম দেয়।

এভাবেই চটজলদি বিচারের আশায় একদল মানুষ চোর সন্দেহে কিশোর রাজন ও রাকিবকে মেরে ফেলে। পথেঘাটে প্রতিনিয়ত দেখি এমন চটজলদি বিচারের আশায় কত মানুষ গণপিটুনিতে অংশ নিচ্ছে। সমস্যার গভীরে নজর দেওয়ার বদলে চটজলদি বিচার মানেই হলো হিংসার জবাবে প্রতিহিংসার আনয়ন। আমরা হয়তো ভাবতে পারছি না, এক অন্তহীন চক্রে পুরো ন্যায়বিচার ব্যাপারটিই ক্রমশ উহ্য হয়ে যেতে বসেছে এই দেশে। আমরা ন্যায়বিচার চাই, সেটা চাইতে গিয়ে ‘অ-ন্যায়’ বিচারকে সমর্থন দিচ্ছি না তো?

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা


  • 33
    Shares

বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।