মিন্নি মাস্টারমাইন্ড না বলির পাঁঠা?

  • 1
    Share

প্রভাষ আমিন : এ যেন টানটান উত্তেজনার থ্রিলার সিনেমা। যার পরতে পরতে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র, উসকানি, প্রেম, পরকিয়া, নির্মমতার আখ্যান। ভালো থ্রিলারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আসল অপরাধী চেনা যায় না। যাকে কেউ সন্দেহ করে না, তিনিই হয়ে যান মূল আসামি। সিনেমা শেষ হওয়ার পরও দর্শকদের অবিশ্বাস যায় না। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকের মুন্সিয়ানায় দর্শকরা আটকে থাকেন শেষ দৃশ্য পর্যন্ত। তবে সত্য যে সিনেমার চেয়েও রোমাঞ্চকর হতে পারে, তা আমরা সবসময় টের পাই না।

এ যেন নৃশংসতার রিয়েলিটি শো। দিনের আলোয় সবার সামনে কুপিয়ে খুন করা হয় এক যুবককে। রিয়েলিটি শো বলছি, কারণ এটা কোনো সিনেমার শ্যুটিং হলে বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড হয়তো দৃশ্যটি রাখতো না। এতটা নৃশংসতা নেয়া যায় না। কিন্তু জীবন সিনেমার চেয়েও নিষ্ঠুর ও বাস্তব। বিনা সেন্সরে সারা বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে সেই নির্মমতা।

এ যেন বিভ্রান্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যের সূর্য। আমরা সাদা চোখে যা দেখি, সেটাই পুরো সত্য নয়। সত্যের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে আরো সত্য।

এই সবকিছু মিলেই বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড। ঘটনা খুব বেশি পুরানো নয়। মাত্র ১৫ মাস আগে মানে গতবছরের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি দুর্বৃত্তদের হাত থেকে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় দেশজুড়ে খুনিদের প্রতি ঘৃণা আর মিন্নির জন্য প্রবল ভালবাসা তৈরি হয়। স্বামীকে বাঁচাতে এমন যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়া এ যুগে বিরল।

স্বামীর প্রতি ভালবাসা আর সাহস দুটিই মিন্নিকে রাতারাতি সারাদেশে ‘নায়িকা’ বানিয়ে দেয়। ধারালো অস্ত্র হাতে এমন উন্মত্ত দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা, সেটা আসল হোক আর নকল, অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। আর চোখের সামনে এমন একটা খুন হতে দেখাটাও অনেক সাহসের কাজ। দেশজুড়ে এই বীর ও সাহসী নারীর জন্য ধন্য ধন্য পড়ে গেল। আমি বরাবরই মানুষকে বিশ্বাস করি। সেই ভিডিও দেখার পর আমারও মিন্নির জন্য দারুণ সহানুভূতির সৃষ্টি হয়। এমন ভয়ঙ্কর বিপদেও স্বামীকে ছেড়ে না গিয়ে দারুণ এক উদাহরণ তৈরি করেন তিনি।

ঘটনার পরদিন নিহত রিফাত শরীফের বাবা যে হত্যা মামলা করেন, তাতে পুত্রবধূ মিন্নি ছিলেন প্রধান সাক্ষী। দৃশ্যত মামলাটা সরল। সবার সামনে কুপিয়ে মেরেছে। কারা মেরেছে সেটাও সবাই দেখেছে। কিন্তু এটা তো আর দশটা সাধারণ ঘটনার মতো নয়। এ যে সিনেমাটিক। তাই দ্রুতই গল্পে টুইস্ট চলে আসে। প্রধান সাক্ষী মিন্নি হয়ে যায় অন্যতম আসামি। সাক্ষী থেকে ফাঁসির আসামি বনে যাওয়ার পথটাও কম থ্রিলিং নয়।

এটা যে সিনেমাটিক তার আরেক প্রমাণ, এর মূল ভিলেনের নাম নয়ন বন্ড। তার আসল নাম সাব্বির আহমেদ। জেমস বন্ডকে দেখে তিনি নিজের নাম দেন নয়ন বন্ড। এই নয়ন বন্ড বরগুনায় ‘০০৭ বন্ড’ নামে কিশোরদের একটি গ্যাং গড়ে তোলেন। যারা নানা অপকর্ম করে বেরাতো। সেই গ্যাংয়েররই চূড়ান্ত অপরাধ রিফাত হত্যা।

বলছিলাম টুইস্টের কথা। ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে পুলিশ নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করে। তারপর থেকেই আস্তে আস্তে ঘুরতে থাকে হাওয়া। মিন্নির পক্ষে প্রবল সহানুভূতির কারণে অনেক প্রশ্ন চাপা থাকে। তবে এমন বেপরোয়া কোপাকুপির মধ্যেও মিন্নির গায়ে একটি আঁচড়ও লাগল না, এটা নিয়ে ফিসফাস চলছিল।

ঘটনার ১৯ দিন পর নিহত রিফাত শীফের বাবা এবং মামলার বাদী হালিম শরীফ, যিনি মামলায় তার পুত্রবধূকে সাক্ষী করেছিলেন, তিনিই পুত্রবধূ মিন্নি এই হত্যায় জড়িত বলে অভিযোগ করেন এবং তাকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন করেন। তার তিনদিন পর মিন্নিকে পুলিশ লাইনে ডেকে নিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও উচ্চ আদালত গণমাধ্যমের সাথে কথা না বলা এবং বাবার বাড়িতে থাকার শর্তে তাকে জামিন দেন। সেই থেকে তিনি জামিনেই ছিলেন। ফাঁসির দণ্ড ঘোষণার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

বলছিলাম টুইস্টের কথা। কিন্তু সিনেমাতেও এত টুইস্ট হয় না। যিনি স্বামীর জীবন রক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রেও অবিচল; যাকে মনে হচ্ছিল এ যুগের সীতা। তিনিই হঠাৎ হয়ে গেলেন ট্রয়ের হেলেন! যার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক জীবন। আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল অনেক অজানা কথা। নয়ন বন্ডের সাথে আগে মিন্নির গোপনে বিয়ে হয়েছিল। গোপন বিয়ে গোপন রেখেই তিনি বিয়ে করেন রিফাত শরীফকে। গোপন বিয়ের মতো নয়ন বন্ডের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্কও চলছিল। তার মানে মিন্নি একই সঙ্গে দুই স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখছিলেন। আর এই দ্বন্দ্বেই মিন্নির প্রথম স্বামী নয়ন বন্ড, দ্বিতীয় স্বামী রিফাত শরীফকে হত্যা করে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, মিন্নিই রিফাত হত্যার মাস্টারমাইন্ড। তিনিই কৌশলে রিফাতকে কলেজের সামনে ডেকে নিয়ে হায়েনাদের ফাঁদে তুলে দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের আর দশটা ঘটনার মতো এই ঘটনায়ও মিডিয়া ট্রায়াল হয়েছে। তদন্ত-বিচার শুরুর আগেই গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার পক্ষে-বিপক্ষে নানা ব্যাখ্যা, নানা বিশ্লেষণ চলেছে। প্রথম দিকে সহানুভূতির একতরফা স্রোত মিন্নি পেলেও, পরে তা ভাগ হয়ে যায়। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। কিন্তু আদালত তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর গণমাধ্যমের তর্ক দিয়ে চলে না। আদালত চলে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। একাধিক আসামি মিন্নিকেই রিফাত হত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দাবি করেছে। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, নয়ন বন্ডের সাথে মিন্নির নিয়মিত যোগাযোগের ঘটনায় আদালত সন্দেহাতীতভাবে মনে করছেন, মিন্নির পরিকল্পনায় এবং তার কারণেই এ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। ঘটনার আগের একমাসে মিন্নির মামলার মূল আসামি নয়ন বন্ডের সঙ্গে ৪৪ বার এবং নয়ন বন্ড মিন্নির সঙ্গে ১৬ বার ফোনে কথা বলেছেন। এ ছাড়া অসংখ্য এসএমএস চালাচালি মিন্নির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেছে।

তবে বরগুনা আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট নন অনেকেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, মিন্নিকে বলছেন বলির পাঁঠা। আদালতের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সবসময়ই আছে। কারণ এই রায় কার্যকর করার আগে হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ, রিভিউ, রাষ্ট্রপতির মার্জনা- অনেক ধাপ আছে। রায় বদলেও যেতে পারে। আবার বাংলাদেশে পুলিশের তদন্ত, আদালতের বিচার প্রক্রিয়া বা রায় প্রভাবিত হয় না; এমনও নয়। নানান ক্ষমতার দাপটে অনেক দোষী পাড় পেয়ে যায়, বলির পাঁঠা হয় অনেক নিরীহ মানুষ। এক্ষেত্রে সেটা হয়েছে কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এই ঘটনার সাথে রাজনীতির সম্পৃক্ততা সামান্যই। স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুমন দেবনাথের পৃষ্ঠপোষকতায় সাব্বির আহমেদ নয়ন ‘নয়ন বন্ড’ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, এটুকু পরে জানা গেছে। তবে সেই পৃষ্ঠপোষকতাও নয়ন বন্ডকে বাঁচাতে পারেনি। বদলাতে পারেনি মিন্নি ছাড়াও আরও পাঁচ আসামির ফাঁসির রায়ও। তাই এখানে কাকে বাঁচাতে বা কোনো দলকে বাঁচাতে মিন্নিকে বলির পাঁঠা বানানো হলো, তা নিশ্চিত নয়। বরং দুয়ে দুয়ে চার মেলালে মিন্নির সম্পৃক্ততাই প্রমাণিত হয়।

কে সম্পৃক্ত, কে নয়, সেটা নিম্ন আদালত বা উচ্চ আদালত ঠিক করবেন। তবে এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও মাত্র ১৫ মাসে আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। একজন মাত্র আসামি পলাতক। বাকি সবাইকে আটক করেছে পুলিশ। আবারও প্রমাণিত হলো, চাইলে পুলিশ সবকিছুই করতে পারে। তবে এ মামলার একমাত্র কলঙ্ক নয়ন বন্ডের ক্রসফায়ার। এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে পূর্ণ হতে দিল না। তারপরও পুলিশ, বাদী, সাক্ষী, আইনজীবী, বিচারকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন।

অনেকে নিছক নারী বলে মিন্নির পক্ষে বলছেন। তাদের যুক্তি, নারী বলেই মিন্নি ন্যায়বিচার পাননি। বাংলাদেশে নারীরা নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত- সব ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে নারী অপরাধ করতে পারবেন না, তেমন তো নয়। বরং পরকিয়ার কারণে স্বামী বা সন্তান হন্তারক নারীর উদাহরণ তো কম নয়। নারীর শক্তি অনেক। কিন্তু সেই শক্তিটা যদি নেতিবাচক হয়, তবে নারী হতে পারে ভয়ঙ্কর। বলাই তো হয়, ল্যান্ড, লেডি আর লিডারশিপের কারণেই পৃথিবীতে অনেক যুদ্ধ, অনেক ধ্বংস, তিক্ততা হয়েছে। আমি ঢালাওভাবে নারীদের দায়ী করছি না। কিন্তু পুরুষের মধ্যে যেমন অপরাধপ্রবণতা আছে, নারীর মধ্যেও আছে। অপরাধীকে বিবেচনা করতে হবে অপরাধী হিসেবেই, লিঙ্গ দিয়ে নয়।

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি নির্দোষ প্রমাণিত হলে আমি সবচেয়ে খুশি হতাম। কারণ ঘটনার পর আমিও মিন্নির প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে অনেক লিখেছি। মিন্নি দোষী না নির্দোষ সেটা নিয়ে কারও কারও সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু মিন্নির কারণেই রিফাতকে প্রাণ দিতে হয়েছে, নয়ন বন্ড মরেছে, আরো পাঁচজনকে ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে কারাগারে থাকতে হচ্ছে। আরও ১৪ কিশোরের বিচার চলছে কিশোর আদালতে। এক মিন্নির প্রেমের কারণে তছনছ হয়ে গেল কতগুলো পরিবার।

শুরুতেই বলছিলাম থ্রিলারের কথা। সিনেমায় তবু শেষ দৃশ্যে সত্যিটা জানা যায়, অপরাধীকে চেনা যায়। কিন্তু রিফাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের পরও অপরাধী নিয়ে অনেকের সংশয় রয়ে গেছে। তার মানে বাস্তবের গল্প সিনেমার গল্পকেও কখনও কখনও হার মানায়। শেষ পর্যন্ত যদি প্রমাণিত হয় মিন্নিই মাস্টারমাইন্ড। তাহলে মানতেই হবে, সে শুধু অপরাধীই নয়, অসাধারণ চিত্রনাট্যকার এবং নিখুঁত অভিনেত্রীও।

প্রভাষ আমিন: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

 

সূত্র: নিউজ বাংলা


  • 1
    Share

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]