যকৃত ও একটি বুলেট 🔘 মাহমুদ অর্ক্য

  • 1
    Share

মাহমুদ অর্ক্য : কাঁচের জানালায় শিশির জমে আছে। এই শীত ঋতুতে দুর্বারা যেমন শিশির মাথায় নিয়ে ঠায় দাড়িয়ে থাকে রোদ পোহানোর লোভে, ঠিক এরকমই প্রতিটি সকাল কাটে রোদেলার। রোদেলা খুবই একা। কি শীত কি গ্রীষ্ণ, সব ঋতুতেই উষ্ণতার অভাবে রুক্ষ ঠোট আর শীতার্ত হৃদয় নিয়ে ধুকে মরার তীব্র প্রবনতা দেখা যায় ওর মধ্যে। ঘরভর্তি মানুষগুলোকে যেন ওর মানুষই মনে হয় না।

এরকম পাঁচটি শীত একা কেটেছে। একা কাটবে জীবনের বাকী শীতগুলোও এমনটা ভেবেই কাঁপন বাড়ে হৃদয়ের। দখিন জানালায় বসন্তের কোকিল কুহুকুহু ডাকে না, ঝিরঝিরে বৃষ্টিতেও জাগেনা ভিজে জমে যাওয়ার আগ্রহ। সে এক হৃদয় বিদারক গল্প। একটি বুলেট কতগুলো হৃদয়কে নিমিষেই ঝাঝরা করে দেয়ার গল্প। ভাবতে ভাবতে দেয়ালে আঁকা ছবিটার দিকে চোখ গেল রোদেলার। কয়েকটা ছবির মধ্যে এ ছবিটাই কেন যেন নজর কাড়ে সবার। রোদেলা চেয়ে আছে দখিন জানালায়। রোজ রাতে ঠিক এমনিভাবেই তাকিয়ে থাকতো। রাত ১২টার দিকে একটা গাড়ি এসে থামতো, গুনে গুনে তিনবার হর্ন বেজে উঠতো। শেষ যেদিন হর্ন বেজেছে সেদিন ছিল রোদেলার ছোট মেয়ে ত্রুইয়ের জন্মদিন। জন্মদিনেও ত্রুইযের বাবার বাসায় ফিরতে দেরি। কি আর করার। জনগণ যাকে খেদমতের দায়িত্ব দেয় তার কাছ থেকে সবাই বেশি বেশিই পেতে চায়। কি রাত কি দিন, ডাক শোনা মাত্রই মিঠাপুরের এই লোকটা বেরিয়ে পড়বেই। শুধু মিঠাপুর নয়, তার কথা মনে রেখেছে সাতমাইলের চাঁদবরুও। একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর হয়েও তিনি কুড়িয়েছেন সমাজের প্রতিটি মানুষের ভালবাসা। চৈতার মোড়ে বসে থাকা পাগলীটাও জানে তার মত লোক দরকার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে, ঘরে ঘরে, দেশে দেশে।

সন্ধ্যা থেকেই বাসায় চলছে জন্মদিনের আয়োজন। স্বজনরা আসছে যাচ্ছে, ঘুরে ফিরে জানতে চাইছে- আরমান কই, কখন ফিরবে? বাচ্চারা হৈ-হুল্লোড়ে মেতে আছে, ত্রুইয়ের কেমন যেন লাগছে। সামনে নির্বাচন। রোদেলা এই সময়ে একটু বেশিই চিন্তায় থাকে। গত নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে এ ঘরে যা ঘটেছিল তা ভুলে যাওয়ার মত অত নড়বড়ে স্মৃতি কারো নেই। ত্রুইকে একদল দুষ্কৃতিকারী অপহরন করেছিল। দুইদিন আটকে রেখেছিল। একটা মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবী করেছিল। শেষমেষ সে সব পূরন করে জীবিত ফিরে পাওয়া গেছে ত্রুইকে। ত্রুইয়ের এখন ১০ বছর বয়স। গত পাঁচ বছরের প্রতিটি দিনই ত্রুইয়ের কেটেছে আতংকে। আজও ঠিক একইরকমের একটা অদৃশ্য যন্ত্রনা গ্রাস করে আছে। মাসখানেক ধরে বেশকিছু অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে আরমানকে ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে আসন্ন নির্বাচনে সে অংশ না নেয়। এমনকি মাদকের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ারও হুমকি দেয়া হচ্ছে। অথচ এসবের উর্ধ্বে এই লোকটা, তা জানে এই এলাকার সমস্ত জীবন্ত স্বত্ত্বা। লোকেদের কাছাকাছি থেকে তাদের নি:স্বার্থে সেবা দিয়ে যাওয়াকে একটি মহল দুর্যোগ মনে করে।

আজ একটু জলদি করেই ঘরে ফিরলো আরমান। রাত ১১ টা। ত্রুই এখনও জেগে আছে। ঘরভর্তি স্বজন। কেউ কেউ এ বাড়ির ফ্লোরে ঘুমানোটাকেও উপহার মনে করে রীতিমত। আরমান ত্রুইকে কোলে তুলে নিয়ে কয়েকঘা চুমু বসিয়ে দিয়ে বলে- বাবা এখনও ঘুমাওনি তুমি? এতরাত জেগে আছো? ত্রুই বলে ওঠে, ‘তোমাকে নিয়ে আমার খুব ভয় হয় বাবা! ওদিক থেকে আরমানের মা খোড়াতে খোড়াতে এগিয়ে এসে বলে, ‘তোর বাবার অবস্থা খুব একটা ভালো না, হার্টের অসুখটা বেড়েই চলছে। এখানকার ডাক্তাররা তো কিছুই পারছে না, কালপড়শুর মধ্যে ঢাকায় নিতে না পারলে নিশ্চিন্ত হতে পারছি না’।

বাসার এদিক ওদিক খোঁজার পরেও রোদেলাকে খুঁজে পাচ্ছে না আরমান। দখিনের বেলকনিতে দাড়িয়ে আছে সে। পিছন দিক থেকে জড়িয়ে হালকা আলোয় দীপ্তিমান ঘনকালো চুলগুলো ঘাড় থেকে সরিয়ে মুখের কাছে মুখটা নিতেই অবাক হলো আরমান। যে চোখ দিয়ে এই মাঝরাতে শুধুই প্রেম ঝরতো, যে ঠোট রোজ সাজতো হারিয়ে যাবার ছলে, সে চোখ দিয়ে অবিরাম জল ঝরছে আর ঠোট কাঁপছে ক্রন্দনের স্পন্দনে। রোদেলাকে বুকে নিতে একটুও দেরি করলো না আরমান। রোদেলার বুকের কাঁপন বেড়ে গেল কয়েকগুন। আরমানের বুকের ভেতরে পুরো রোদেলাটা যেন আস্ত একটা যকৃত। পুরোটাই কাঁপছে। চোখের জলে ভিজে গেছে রোদেলার পছন্দ করা আরমানের শরীরে জড়ানো সে খয়েরি শার্টটা। আরমান আরো কাছে নিতে চায় রোদেলাকে, মনে হয় তার যকৃতটা বাইরে বেরিয়ে আসছে! রোদেলা ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলে ওঠে, ‘তুমি এবার ইলেকশন কইরো না, তোমার কিছু হলে আমি কিন্তু বাঁচবো না’। আরমান বলে, ‘ওদেরকে ভয় করে বাসায় বসে থাকলে মিঠাপুর যে তিতাপুর হয়ে যাবে!’। রোদেলা বলে, ‘তোমার ঘর যে তিতাপুর আগে থেকেই হয়ে আছে সেটা একটুও ভাবো?’। আরমান বলে, এসব ছাড়ো, দেখো আমার কিছুই হবেনা, বরং ওরাই মানুষ হবে একদিন। মিঠাপুরের সকল ভালোমানুষের ভালোবাসাও তোমার ভালবাসার মত পবিত্র, আর তুমিতো জানো, ‘আমি পবিত্রপ্রিয়’।

সকালের নাস্তা প্রস্তুত। জৈন্তাপুরে একটা জনসভা আছে আজ। সেখানে যাওয়ার জন্য একপ্রকার তাড়াহুড়ো করেই বেরুলো আরমান। কতদূর গিয়ে আবার ফিরে এলো, মানিব্যাগটা ভুলে রেখে গেছে সে। রোদেলা বাসা থেকে বেরিয়ে ওটা এগিয়ে দিতে দিতে বললো, আজ তাড়াতাড়ি ফিরো, দুপুরে ভালকিছু খেও।

কাউন্সিলর অফিসে যখন ফিরলো তখন সন্ধ্যা ৬ টা। সন্ধ্যা থেকেই বেশ সরগরম এলাকা। র‌্যাবের টহল। তাছাড়া জণসভায় দুগ্রুপের সংঘর্ষে জনাতিনেকের গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকার দৃশ্যগুলো বারবার মনে পড়ছে আরমানের। রাত ৯ টা । ইতোমধ্যে সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেছে। অফিস সহকারী রতনকে পাঠালো চা আনতে। মনে মনে ভাবলো, আজ দশটার আগেই বাসায় ফিরবে সে। বৈশাখ মাস। হুটহাট করেই ছাড়ে দমকা বাতাস। রতনটা এখনও ফিরছে না। টিভিটাও চলছে না, নো সিগনাল ভেসে আছে। একটা দমকা হাওয়া ক’মুঠো ধুলোবালি ছেড়ে দিয়ে গেল আরমানের চোখেমুখে। দূর্যোগ শুরু হয়েছে, রাত নেমেছে- সবকিছু উড়িয়ে নেয়ার ভয়ানক সেই রাত। প্রচন্ড বেগে বাতাস বইছে, রতনটা এখনও ফিরছে না। হঠাৎ ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল। খুব ভয় করছে। ওদিক থেকে ত্রুইয়ের ফোন, ‘বাবা কই তুমি, কখন ফিরবে?’। এইযে আমি…। ওপাশ থেকে কথা ভেসে আসছে, বাবা, বাবা। এপাশে কোন আওয়াজ নেই। মাটিতে লুটিয়ে থাকা একটা নিথর দেহ কি জবাব দেবে? ক্রসফায়ারের আগে ক’জন দুর্বৃত্তের কিছু কথা ওপাশ থেকে শুনলো রোদেলা। ততক্ষনে রতন ফিরে এলো, মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে। অফিসে ঢুকেই পায়ে লাগলো একটা পবিত্রপ্রিয় পবিত্র মানুষের নিথর দেহ। ডান পায়ে বা’পায়ে আরমানের শান্ত শরীরে রতন আরো কয়েকটি লাথি মারলো আর বললো, ‘আমরা কথায় না কাজে বিশ্বাসী, হা হা হা’।

বাড়ির সামনে দুটো খাটিয়া। দুটো মৃতলাশ, কয়েকটি জীবিত। লাশ দুটোর একটি ময়নাতদন্ত শেষে কিছুক্ষন আগে ফিরেছে, হার্টের রোগীর হার্টটা এসব শুনে আর আস্ত থাকতে পারলো না। লাশগুলো কবরস্থ হলো, কবরস্থ হলো পবিত্রতা, আদর্শ ও মানবতা।

ত্রুইটা আজকাল কেমন যেন হয়ে গেছে, খায়না, হাসেনা, কারো সাথে কথাও বলে না। দেয়ালে ওর আব্বুর একটা বড়সড় ছবি একেছে। পাশে লেখা, ‘মানুষ এত খারাপ? যে আমার বাবাকেই আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলো!’।


  • 1
    Share

বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।