যা বলতেই হবে ও না বলা অধ্যায়

  • 21
    Shares

জার্মান কথাসাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সমগ্র বিশ্বে তিনি বিখ্যাত ঔপন্যাসিক হিসাবে, বিশেষ করে দ্য ট্রিন ড্রাম (১৯৫৯) উপন্যাসটি তাঁকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া খ্যাতি। কথাসাহিত্যিকের পাশাপাশি তিনি ছিলেন কবি, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর ও বুদ্ধিজীবী। গ্রাসের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৬ অক্টোবর। মৃত্যুবরণ করেন ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল। তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন ১৯৯৯ সালে। তাঁর গদ্যসাহিত্যের মূল আকর্ষণ হলো যাদুবাস্তবতা, যা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর দ্য টিন ড্রাম উপন্যাসে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হলো: দ্য ট্রিন ড্রাম (১৯৫৯), ক্যাট এন্ড মাউস (১৯৬১), ডগ ইয়ারস (১৯৬৩), ক্র্যাবওয়াক (২০০২) প্রভৃতি। মূলত কথাসাহিত্যের জন্য সারাবিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও মৃত্যুর মাত্র তিন বছর আগে রচিত তাঁর একটি কবিতা তাঁকে বিশ্বব্যাপী করে তোলে সর্বাধিক আলোচিত ও সমালোচিত।

সেই কবিতাটির নাম ‘যা বলতেই হবে’।

‘যা বলতেই হবে’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে দ্য সাবদয়েচে জেইটাঙ, লা রিপাবলিকা ও এল পেইস পত্রিকায়। এটি একটি গদ্য কবিতা। কবিতার মূল জার্মান শিরোনাম ‘ওয়াজ গেসাগ্ট ওয়ারডেন মাস’। ইংরেজিতে অনূদিত হয় ‘ওয়াট মাস্ট বি সেইড’ শিরোনামে। জার্মানী কর্তৃক ২০১২ সালের ৪ জুন তারিখে ইসরাইল একটি ষষ্ঠ ডলফিন শ্রেণির সাবমেরিন উপহার পাওয়ার প্রতিবাদে গ্রাস এ কবিতাটি রচনা করেন। গ্রাসের আশংকা ছিলো, এ ধরনের সাবমেরিন ইসরাইলকে ইরানের বির“দ্ধে নিউক্লিয়ার যুদ্ধ চালাতে প্রলুব্ধ করবে। কবিতাটির মূল বিষয়: ইরান-ইসরাইল সম্পর্ক। কবিতার মোট চরণসংখ্যা ৬৬। চরণগুলোকে ভাগ করা হয়েছে ৯টি অন্ত্যমিলশূন্য স্তবকে। ৫ এপ্রিল ২০১২ তারিখে এটি দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে। এর প্রথম ইংরেজি অনুবাদক ব্রেওন মিচেল। বাংলা ভাষায় এ কবিতার প্রথম দুটি অনুবাদ একই সাথে প্রকাশিত হয় দুটি ভিন্ন পত্রিকার শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকীতে, সম্ভবত ২০১২ সালের ৬ এপ্রিল তারিখে: একটি নয়াদিগন্তে, অন্যটি প্রথম আলোয়। একটি আমার অনুবাদ, অন্যটি কবি সাজ্জাদ শরিফের। আমি অনুবাদ করি ‘যা বলতেই হবে’ শিরোনামে; সম্ভবত, সাজ্জাদ শরিফের অনুবাদের শিরোনাম ছিলো ‘যে কথা বলতেই হবে’। কবি তিতাশ চৌধুরী টেলিফোনে আমার অনুমতি গ্রহণপূর্বক আমার অনুবাদটি তাঁর সাহিত্যপত্রিকা অলক্ত-এ পুনঃপ্রকাশ করেন। পরবর্তীতে এটি আবার প্রকাশিত হয় মাসিক সাহিত্য ম্যাগাজিন অন্য দিগন্তেও। পাঠকদের উদ্দেশ্যে গুন্টার গ্রাসের বিখ্যাত এ কবিতাটির বঙ্গানুবাদ নিচে তুলে দেয়া হলো:

কেনই বা নীরব থেকেছি এতকাল, করেছি কেবলি ইতস্তত
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার বিষয়ে, যে খেলা প্রকাশ্যে খেলেই চলেছে সব
বিশ্বময়, যে খেলার শেষে আমাদের যারা টিকে থাকবে সভ্যতার
শুধু পাদটীকা হয়ে?
এটা তো প্রথম আঘাতের অভিযুক্ত অধিকার, যা ধ্বংস করে দেবে
পুরোপুরি ইরানি জাতিকে, যাকে পরাভূত করতে চায় একটি উচ্চকণ্ঠ,
তার সাথে এসে মিলিত হয়েছে তার সাঙ্গপাঙ্গরা, কারণ তার ক্ষমতার
চৌহদ্দির মধ্যে তারই বিরুদ্ধে বানানো হয়ে যেতে পারে একটি অ্যাটোম বোমা।
তার পরও আমি কেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি সেই দেশের নাম নিতে, যে ইতোমধ্যে
বানিয়ে ফেলেছে পারমাণবিক বোমা যদিও তা আড়াল করে রাখা হয়েছে
পৃথিবীর নজর থেকে তার সেই ক্রমবর্ধমান শক্তির ওপর কারো হস্তক্ষেপ নেই,
যাচাই-বাছাই করার কোনো ব্যাপারও নেই,
নেই পৃথিবীর মোড়লদের তদন্ত করে দেখার মাথাব্যথাও।
এইসব বিষয়ের প্রতি সাধারণ নীরবতা, যার সামনে আমার নিজেরই নীরবতা
নুয়ায়ে দিয়েছে তার শির, আমার কাছে মনে হয়েছে একটি সমস্যা উদ্রেককারী
চাাপিয়ে দেয়া মিথ্যে, যা টেনে নিয়ে চলেছে বিশ্বকে একটি শাস্তির দিকে,
ইহুদিবিরোধী মতবাদ তাতে ফুঁসে উঠতে পারে সহজেই।
কিন্তু আমার নিজের দেশই, যাকে তার অতীতের অপরাধকর্মের জন্য
প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে বারবার, সেই কিনা যখন আরেকটি সাবমেরিন
সরবরাহ করে বসে ইসরাইলে (যেটা কিনা স্রেফ ব্যবসায়িক লেনদেন
ছাড়া কিছু নয়, যদিও বলা হয়েছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণস্বরূপ দেয়া হচ্ছে
ইসরাইলকে), এমন একটি রাষ্ট্রকে, যার অঢেল ক্ষমতা রয়েছে আণবিক
যুদ্ধ চালানোর এমন এক জনপদে যেখানে একটিও অ্যাটোম বোমা আছে
বলে প্রমাণিত হয়নি আজও, তাদের ভীতবিহ্বল অস্তিত্বই প্রমাণ করে
দেয় তা, তখন আমাকে বলতেই হবে আমি যা বলতে চাই আজ।
কিন্তু কেন আমি নীরব হয়ে আছি আজও?
তার কারণ, আমার মূল উৎস, যা মলিন হয়ে হয়ে গেছে
এমন এক রঙে, যা কিছুতেই মুছে ফেলা যাবে না;
তার অর্থ হলো, আমি কখনো প্রত্যাশা করিনি ইসরাইল,
যার সাথে আমি সংশ্লিষ্ট থেকেছি সারা জীবন, তার বিরুদ্ধে
এমন একটি সত্য প্রকাশিত হয়ে যাক।

তা হলে কেন এখন, যখন আমি বৃদ্ধ, আমাকে বলতে হচ্ছে :
ইসরাইলের পারমাণবিক শক্তি বিপন্ন করে তুলেছে
ভঙ্গুর বিশ্বশান্তিকে?
কারণ আমাকে এ বলতেই হবে
কারণ আগামীকাল আমার জন্য ফিরে নাও আসতে পারে
কারণ একজন জার্মান হিসেবে আমি খুবই ভারাক্রান্ত
যখন একটি অপরাধের জন্য সরঞ্জাম সরবরাহ করছি আমরা
যার দ্বারা সমস্যার সমাধান হবে না কিছুই, বরং বাড়বে।
আমি আমার নীরবতা ভেঙে বের হয়ে এসেছি
কারণ পাশ্চাত্যের ভ-ামি আমাকে অসুস্থ করে ফেলেছে
এবং আমি আশা করি আমার মতো আরো অনেকেই বের হয়ে আসবেন
নীরবতা ভেঙে
এবং আশা করি আমরা যারা প্রকাশ্য বিপদের মুখোমুখি, তারা দাবি জানাবেন
না, কোনো শক্তি প্রয়োগ নয়
দাবি জানাবেন যে, ইরান ও ইসরাইল উভয়ই
আন্তর্জাতিক শক্তিকে অনুমতি দিক উভয় দেশের আণবিক শক্তি ও
সামর্থ্য বিষয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করার।
বাহিরের কোনো ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতাই
ইসরাইল কি প্যালেস্টাইনের জন্য
কিংবা তাদের জন্য যারা শত্রুতার মধ্যে বাস করে তাদের চারপাশে
এমনকি আমাদের কারো জন্য শান্তি বয়ে আনবে না, আমি নিশ্চিত।

ব্রেওন মিচেলের ইংরেজি-অনুবাদ থেকে অনূদিত হওয়ায় বুঝার উপায় নেই মূল কবিতা থেকে কত দূর সরে এসেছি আমরা। কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই দাবানলের মতো এর আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। এটি প্রকাশ পাওয়ার চারদিনের মাথায় ইসরাইলের মন্ত্রী এলি এশাহী গুন্টার গ্রাসের বিরুদ্ধে ইসরাইলে প্রবেশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু মানবতার কবি ও কথাশিল্পী গুন্টার গ্রাসের কিছুই আসে যায়নি তাতে, কারণ ইসরাইলের এক সময়কার গুণগ্রাহী হলেও এবং ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালে তিনি ইসরাইল ভ্রমণ করে এলেও, যথার্থভাবেই গ্রাস বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন ইউরোপের ভন্ডামি থেকে।

আলোচনা : সায়ীদ আবুবকর
(মূল শিরোনাম : গুন্টার গ্রাসের একটি কবিতার কথা)


  • 21
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]