লোপাট হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার বালু


জামালপুরে কোটি কোটি টাকার বালু লোপাট হচ্ছে। সরকারের রাজস্ব খাতকে ফাঁকি দিয়ে বালু মহাল থেকে কোটি কোটি টাকার বালু লোপাট হলেও আইনি জটিলতায় নির্বিকার রয়েছে প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিরা। এ বালু লোপাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একাধিক সিন্ডিকেট।

জড়িত ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, পৌর কাউন্সিলর, ছোট-বড় নেতা, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি পেশার ক্ষমতা ধর ব্যক্তি। লোপাটের টাকা মাছের ভাগার মতো স্তরভেদে চলে যাচ্ছে তাদের পকেটে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জামালপুর ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই, সুবর্ণখালী, জিঞ্জিরাম ও বংশী নদীর প্রায় পাঁচ শতাধিক পয়েন্টে চলছে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা কার্যক্রম। বালু লুটেরাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা খাল, বিলসহ বিভিন্ন শাখা নদীও। এরমধ্যে শুধু ব্রহ্মপুত্র নদে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা থেকে সদর উপজেলার পিয়ারপুর পর্যন্ত শতাধিক পয়েন্টে ড্রেজার মেশিনসহ নানা কায়দায় তোলা হচ্ছে অবৈধ বালু।

বালু তোলার তালিকা থেকে বাদ পড়েনি জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলাও। এ উপজেলার ঝিনাই নদী, সুবর্ণখালী ও যমুনা থেকে বালু তোলা চলছে। আওনা ইউপির জগন্নাথগঞ্জ পুরাতন ঘাট থেকে শুরু হয়ে পিংনা ইউপির শেষ সীমানা বাসুরিয়া পর্যন্ত চলছে এ লুটপাটের রাজত্ব। এ দুটি ইউপিতে যমুনা নদী বেষ্টিত হবার কারণে বালু তোলা চলছে খোলামেলাভাবে।

ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় বালু তোলার অভিযোগ পুরোনো। প্রশাসন বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে ড্রেজার মেশিন পুড়িয়ে দিলেও থেমে নেই বালু তোলা। যমুনা থেকে অতিরিক্ত বালু তোলার ফলে গুঠাইল, হরিণধরা, কুলকান্দি, উলিয়া বাজার হার্ড পয়েন্টের যমুনার তীর বাঁধ বিভিন্ন স্থানে ধসে যায়। একই অবস্থা জেলার মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও বকশীগঞ্জে।

জামালপুর শহর থেকে পিয়ারপুর পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাথালিয়ার ব্রহ্মপুত্র বাঁধ থেকে শুরু করে সদর উপজেলার নরুন্দি পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ঘাটে বালু তোলা হচ্ছে র্দীঘদিন ধরে। পাথলিয়া, নাওভাঙা, কম্পপুর, ছনকান্দার মাদরাসা ঘাট, চান্দে গেদার ঘাট, শরিফপুরে ট্যানারি ঘাট, নান্দিনার গোদার ঘাট, খড়খড়িয়া ঘাট, গোলাবাড়ি ঘাট, পালবাড়ি ঘাট, আলগীর চর ঘাট এবং নরুন্দি ও পিয়ারপুরের বেশ কয়েকটি ঘাটে বালু তোলা হচ্ছে। চালুর অপেক্ষায় রয়েছে ছনকান্দার মিল্টনের ঘাট, জামালের ঘাট, বাজুর ঘাট ও মুক্কার ঘাট।
জামালপুর-শেরপুর ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের ৫০০ মিটারের মধ্যেই বালু তোলা হচ্ছে। এতে ব্রহ্মপুত্র ব্রিজটি হুমকির মুখে পড়লেও প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করছেন।

জামালপুরের এসব বালুর খনি থেকে ট্রাক, ভটভটি, মাহেন্দ্র ও ট্রাক্টর যোগে বালু যাচ্ছে জেলার সর্বত্রসহ আশপাশের জেলায়। জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুইপাশে বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে সারি সারি অবৈধ বালুর ঢিবি। প্রকাশ্যে এসব ঢিবি থেকে বালু বিক্রি হচ্ছে।

জেলাজুড়ে এ মহোৎসব চললেও বালু লুট বন্ধে বর্তমানে তেমন কোনো প্রশাসনিক তৎপরতা নেই। কালে-ভাদ্রে জেলা প্রশাসনের অভিযান চললেও তা সুফল মিলছে না। প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে লুটেরাদের সখ্যতা থাকায় অবৈধ ড্রেজার ধ্বংস অভিযানের খবর আগেই চাউর হয়ে যায়।

ইঞ্জিনচালিত নৌকার পিছনে হুক লাগিয়ে নদীপথে মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে যায় বালু তোলার ড্রেজারগুলো। সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বালু লুটের কারণে ব্রহ্মপুত্রের তলদেশ থেকে মাটি সরে গিয়ে নদের দুইপাড়ে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাসহ হুমকির মুখে পড়েছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও ব্রহ্মপুত্র সেতু।

ছনকান্দার আনিসুর রহমান, হাজী এন্টারপ্রাইজ, আব্দুল হামিদ, মোস্তাক আলম, নাজিম উদ্দিন ও ইসলামপুরের মাসুদ চৌধুরীকে বালু মহালের লাইসেন্স দেয় জেলা প্রশাসন। এরমধ্যে ঘাট ইজারা পেয়েছে ইসলামপুরের মাসুদ চৌধুরী। বাকি পাঁচ লাইসেন্সধারীসহ অন্যরা ঘাট ইজারা না পেলেও সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে র্দীঘদিন ধরে অবৈধ বালু তুলে বিক্রি করে যাচ্ছে।

শহরের ফেরিঘাট এলাকায় প্রকাশ্যে টোলঘর বসিয়ে স্লিপ দিয়ে বালুবাহী গাড়ি থেকে আদায় করছে বালু বিটের টাকা। বালু তোলার পর সেটি যখন ব্যবসায়ীরা কিনছেন তখন গাড়ি প্রতি ৩০০ টাকা খাজনা আদায় করছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। মাস শেষে এ টাকা ভাগ হয়ে যায় বিভিন্ন স্তরভেদে।

টোলঘরে গিয়ে দেখা হয় বালু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাবিবুর রহমান হবির সঙ্গে। তখন তিনি খাজনা আদায়ে ব্যস্ত। তিনি বলেন, লাইসেন্স পেয়েছি, আইনি জটিলতায় জেলা প্রশাসন ঘাট ইজারা দিচ্ছে না। অথচ প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়নের টাকা গুণতে হচ্ছে আমাদের।

ঘাট ইজারা পাননি অথচ বালু তুলছেন ও খাজনা আদায় করছেন কিভাবে? তাকে এই কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, ঘাট ইজারা পাইনি সত্য, ডিসি অফিসের (কথিত) এলআর ফান্ডে টাকা দিয়ে বালু মহাল পরিচালনা করছি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (পবা) জয়েন্ট সেক্রেটারি শরিফ জামিল বলেন, জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র নদী রক্ষা আন্দোলনের এক সেমিনারে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী পরিদর্শন করে দেখেছি, দখল ও বালু তোলার মহাযজ্ঞ। দখলদার ও বালু লুটেরাদের অপতৎপরতায় ব্রহ্মপুত্রের জামালপুর অংশ বিপন্ন হতে চলছে।

তিনি আরো বলেন, নদী দখল, বালু তোলাসহ নদী ধ্বংসের নানা কর্মকাণ্ডে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। যেসব কর্মকাণ্ড চলছে তা শনাক্ত করে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বসতভিটা, ফসলি জমিসহ নদীকেন্দ্রিক বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে।

বৈধভাবে বালু তোলার জন্য ২০০২ সালে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা নেন ১৬ জন ইজারাদার। ২০০৫ সালে মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্তে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে বালু মহাল ইজারা নেয়ার জন্য ইজারাদারদের নির্দেশ দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে খনিজ মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা প্রাপ্তরা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। হাইকোর্ট খনিজ মন্ত্রণালয়ের ইজারাদারদের আবেদন আমলে নিয়ে খনিজ মন্ত্রণালয় থেকে নেয়া ইজারার শর্তানুযায়ী সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। এভাবেই সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দিয়ে বালু মহালগুলো থেকে বালু তুলে আসছিলেন ইজারাদাররা।

২০০৮ সালে বালু মহালগুলো দখলে নিয়ে অবৈধভাবে ফের বালু তুলতে থাকে আরেকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। বিপাকে পড়েন বালু মহালের বৈধ ইজারাদারা। তারা মহাল থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করার জন্য ডিসির কাছে আবেদন করেন। জেলা প্রশাসন অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে ব্যর্থ হলে বালু মহালের বৈধ ইজারাদাররা ২০০৮ সালের নভেম্বর থেকে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দেয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে জেলায় বালু তোলা থেকে সরকার প্রতি বছর প্রায় অর্ধ কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়।

রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বালু মহাল চালুর বিষয়ে জামালপুরের নবাগত ডিসি এনামুল হক বলেন, রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ বালু তুলে ব্যবসার কোনো সুযোগ নেই। আগে কি হয়েছে বলতে পারব না, অবৈধ বালু মহালগুলো চিহ্নিত করে বালু তোলা বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]