শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত—সব দিয়ে লিখে গেছেন বাংলাদেশের নাম


বরিশাল: দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে যে কয়জন মানুষের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ তাদের মধ্যে শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত অন্যতম প্রধান। মূলত আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ হিসিবে তিনি আপামর জনতার কাছে আজও সম্মানের পাত্র। তবে এদেশের কৃষকদের মুক্তির লক্ষ্যে তার কৃষক আন্দোলনে নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি করে।

এই মহান মানুষটি বাংলা ১৩২৭ সনের ২৭ চৈত্র (১৯২১ খ্রি.) বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার সেরাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভোলা হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল’ ডিগ্রি লাভ করেন।

গণতন্ত্রী দলের সাধারণ সম্পাদকের (১৯৫৬-৫৭) দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য ছিলেন (১৯৬৪)।

১৯৬৯ সালে সেরনিয়াবাত আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বরিশাল থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপা।

শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র যোদ্ধা। মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনায় অনন্য ভূমিকা তার।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তিনি ভূমি প্রশাসন, ভূমি সংস্কার এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সম্পদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। আবদুর রব সেরনিয়াবাত ১৯৭৩ সালে বরিশাল থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।

বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করে গেছেন আবদুর রব সেরনিয়াবাত। স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় বাংলাদেশকে ধ্বংস করার জন্য রচিত ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডে তিনিও পরিবারের আটজনসহ শহীদ হন।

বঙ্গবন্ধুর খুনি সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, আজিজ পাশা ও নুরুল হুদার নেতৃত্বে বাসার ভেতরে ঢুকে অস্ত্রের মুখে বাসার সব সদস্যকে ড্রয়িংরুমে জড়ো করে এবং আবদুর রব সেরনিয়াবাতসহ আট জনকে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ২১ অক্টোবর আবুল হাসানাতের স্ত্রী সাহান আরা বেগম বাদী হয়ে রমনা থানায় এই মামলা করেন। মামলায় মেজর শাহরিয়ার, মেজর আজিজ পাশা, ক্যাপ্টেন মাজেদ, ক্যাপ্টেন নূরুল হুদা হিরুকে আসামি করা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই ১৫ সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ১৯৯৯ সালের ৪ অক্টোবর অভিযোগ গঠন করেন। আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আসামি তাহের উদ্দিন ঠাকুর মামলাটির স্থগিতাদেশ চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করেন। উচ্চ আদালত তিন মাসের জন্য মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর এ স্থগিতাদেশ দফায় দফায় বাড়তে থাকে। ২০০৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকারের প্রতি দেওয়া রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

তার মিন্টো রোডের বাসভবন বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরের অংশ।

তার নামে বরিশালের একটি স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয়েছে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত স্টেডিয়াম।এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের নামকরণ হয়েছে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাব। একটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনা করা হয় ২০১০ সালে। এছাড়াও, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি নামে নামকরণ করা হয়েছে। বরিশাল ল কলেজের নাম পরিবর্তন করে আজীবন সংগ্রামী এই মানুষটির নামে করা হয়েছে।

এই মহান মানুষটির অবদান বরিশালবাসী কখনো ভুলবে না।##


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]