সঙ্গীতাঙ্গনে আইডল হযে ওঠা হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলের গল্প


  • ডিজিটাল ডেস্ক

হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল একই সাথে বাংলাদেশের একজন গায়ক, টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নির্মাতা। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সাথেও জড়িত তিনি।

তিনি বলেন, আর্থিক ও মনের কথা বিবেচনা করে তিনি তার পেশাকে দুটো ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন।

“গানটা আমি করি হৃদয়ের টানে। শিল্পী জুয়েল হিসেবেই আমি পরিচিত হতে পছন্দ করি। তবে গান করার সময় এটাকে যাতে আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে পড়তে না হয় সেজন্যে আমি আমি দ্বিতীয় আরেকটা পেশাকে বেছে নিয়েছি। সেই পেশাটা হচ্ছে টেলিভিশনের জন্যে অনুষ্ঠান নির্মাণ বা প্রযোজনা করা।”

জুয়েল বলেন তার বাবা মায়ের অনুপ্রেরণাতেই তিনি শিল্পী হয়েছেন।

“আমাদের দেশের বাবা মায়েরা তো সাধারণত চান তার সন্তানরা ডাক্তার কিম্বা ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু আমি খুব ভাগ্যবান। বাবা চাইতেন আমি একজন শিল্পী হই। আমার মাও তাতে সমর্থন দিয়েছেন।”

জুয়েল জানান, তার বাবার কাজিন ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। উনি যখন বাড়িতে যেতেন তখন বাড়ির সবাইকে নিয়ে গান করতেন। বাবা এতে খুব অনুপ্রাণিত হতেন। জুয়েলের বাবা নিজেও কিছু গান করতেন। সেই থেকে তারও শিল্পী হয়ে উঠা শুরু।

প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রতিবেশী একজনের কাছে গান শিখেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রথম মঞ্চে গান করেন সম্ভবত ১৯৭৮ সালে, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়।

“আমার বাবা একজন ব্যাংকার। চাকরির কারণে তাকে সপরিবারে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হতো। আমরা তখন ঝালকাঠিতে থাকি। বিজয় দিবস কিম্বা স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে স্কুলের মঞ্চে আমি প্রথম গান গেয়েছিলাম, আমার যতোটুকু মনে আছে।”

তিনি জানান, তখন তাকে লোকজন যেভাবে প্রশংসা করেছিলো সেটা তাকে একজন শিল্পী হয়ে উঠার জন্যে অনেক অনুপ্রাণিত করেছে।

“তাতে একটা ক্ষতিও হয়েছে। পাবলিক পারফরমেন্সের প্রেম পেয়ে বসলো আমাকে। ফলে আমার আর খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখা হয়ে উঠেনি।”

১৯৮৬ সালে ঢাকায় চলে আসেন আবিদুর রেজা জুয়েল। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি কেন্দ্রিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েন। তখনই বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে তার যোগাযোগ ঘটতে শুরু করে।

জুয়েলের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। তারপর গত ২৫ বছরের মতো সময়ে তার মোট দশটি অ্যালবাম বেরিয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘এক বিকেলে’ অ্যালবামটি।

‘ওটাই আমার সিগনেচার গান বা সিগনেচার অ্যালবাম। এই গান দিয়েই লোকজন চেনে আমাকে,” বলেন তিনি।

তখন তার নাম হয়ে যায় ‘এক বিকেলের জুয়েল।’

এই গানের এতো জনপ্রিয় হয়ে উঠার কারণ সম্পর্কে শিল্পী নিজে বলেন, “নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গানের কথা, স্টাইল ও সুরে ষাটের দশকের প্রভাব ছিলো। তখনও অস্থিরতা শুরু হয়নি। মানুষ তখনও কথা, সুর মেলোডি এসবকে প্রাধান্য দিতো। এক বিকেলে সেরকমই এক বিষণ্ণতার গান। যারা প্রেমে পড়েছেন, প্রেমের কারণে কষ্ট পাচ্ছেন তারা গানটাকে খুব পছন্দ করলো।”

এই গানের সুর করেছেন আইয়ুব বাচ্চু। শিল্পী জুয়েল জানান, আইয়ুব বাচ্চুর গান তিনি খুব পছন্দ করেন। কলেজে পড়ার সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কখনও যদি তিনি অ্যালবাম বের করার সুযোগ পান তাহলে সেটা তিনি আইয়ুব বাচ্চুর সাথেই করবেন।

জুয়েলের মোট ১০টি অ্যালবামের মধ্যে সাতটিরই সুর করেছেন আইয়ুব বাচ্চু।

“তিনি খুব সুন্দরভাবে আমার জন্যে নতুন একটা রাস্তা বের করলেন। সমকালীন গানকে ধরার জন্যে আধুনিক, ব্যান্ড, লোকসঙ্গীত এসবের মাঝখানে উনি আমার জন্যে একটা বিষণ্ণতার রাস্তা বের করলেন আমার জন্যে। এধরনের স্যাড ব্যালাড বলতে পারেন। যে কারণে আমাকে সব বয়সের লোকেরাই গ্রহণ করে নিলো।”

শিল্পী জুয়েল স্পষ্টভাবেই স্বীকার করে নিয়েছেন তার গানের ওপর আইয়ুব বাচ্চুর বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে।

“যখন একজন মানুষ আমার জন্যে দেড়শো দুশো গান তৈরি করে, শিখিয়ে দেন কিভাবে গানটা গাইতে হবে, নির্দেশ দিতে থাকেন গানটা এভাবে করো ওভাবে করো তার প্রভাব তো পড়তেই হবে।”

১৯৮৪ সালের দিকে তার এক কাজিন জাপান থেকে বাংলাদেশে আসার সময় একটি ভিডিও ক্যামেরা ক্যামকর্ডার সাথে নিয়ে আসেন। সেটি দিয়ে তারা প্রচুর মজা করতেন।

তিনি বলেন, কোন কিছু রেকর্ড করার পর সাথে সাথেই প্লে হওয়ার ঘটনায় তিনি খুব অবাক হয়েছিলেন। তখন তারা পরীক্ষামূলক-ভাবে নানা কিছু রেকর্ড করতে শুরু করেন।

একটি গানের অনুষ্ঠান রেকর্ড করে সেটি পাড়ার ডিশের দোকানে গিয়ে সেটি চালাতে বললেন। তখন সবাই ওই ভিডিওটি দেখলো। তখন তারা এই কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েন।

জুয়েল বলেন, “বলতে দ্বিধা নেই বিয়ের অনুষ্ঠানের ভিডিও-ও আমি করেছি।”

তারপর তিনি দ্বিতীয় পেশা হিসেবে টেলিভিশনে এই অনুষ্ঠান প্রযোজনাকে বেছে নেন।

তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে বিবিসির হার্ড টকের আদলে করা ‘সরাসরি’ নামের একটি অনুষ্ঠান। এটি একুশে টেলিভিশনে প্রচারিত হতো। কিশোর কিশোরীদের নিয়ে একটা টকশো। নাম বলতে চাই। সারা দেশে ঘুরে ঘুরে এই অনুষ্ঠানটি করা হতো।

তারপর ছিলো মিউজিক ক্যাফে। সেটা বাংলাদেশে দর্শকদের সামনে সরাসরি রেকর্ড করা গানের প্রথম অনুষ্ঠান।

  • [বিবিসি বাংলার মিজানুর রহমান খান লন্ডন স্টুডিওতে তার এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন।]

বরিশালট্রিবিউন.কম’র (www.barisaltribune.com) প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।