সচরাচর সংঘটিত একটি অমানবিক ও নিষ্ঠুর অপরাধ;বিবেচ্য বিষয়,বিদ্যমান শাস্তি এবং বাস্তবতা


সাম্প্রতিক কালে মাঝেমধ্যেই একটি বর্বর,নিষ্ঠুর এবং অমানবিক অপরাধ সংঘটিত হবার খবর পাওয়া যায় এবং সেটি হলো কোন পুরুষের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা।অসভ্য যুগের যতগুলো অপরাধ বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম।এধরনের অপরাধের ফলে ভিকটিম পুরুষের শুধু পুরুষত্বই নষ্ট হয় না পাশাপাশি সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরন করে এক মানসিক হতাশা ও যন্ত্রনা নিয়ে বাঁচতে হয়।তাছাড়া এজাতীয় ঘটনায় ভিকটিম অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরনের জন্য মারাও যেতে পারে।

যেকোন অপরাধই যখন সংঘটিত হয় তখন তা শুধু ভিকটিমকে ক্ষতিগ্রস্থ করে না পূরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্থ করে।তাই যেকোন অপরাধের মাত্রা বেড়ে গেলে তা কমানোর জন্য বা তা যেন পূনরায় সংঘটিত না হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে নানাবিষয় বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করতে হয়।যে সকল বিষয় বিবেচনায় নিতে হয় তারমধ্যে অন্যতম হলো যে অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে তা সংঘটিত হবার পিছনে কারন কি তা খুজে বের করে বিশ্লেষন করা,অপরাধটির জন্য বিদ্যমান আইনে নির্ধারিত শাস্তির পরিমান যথেষ্ট কি না তা পর্যালোচনা করা,অপরাধটি সংঘটিত হওয়ায় এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া জানা,অপরাধটি সংঘটিত করার সাথে জড়িত অপরাধীর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষন,অপরাধটি সংঘটিত করায় ভিকটিমের ক্ষতির পরিমান বিশ্লেষন করা ইত্যাদি।

আমরা উক্ত আলোচনায় পুরুষের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা অপরাধটি কোন ধরনের অপরাধ এবং বর্তমান বাস্তবতায় শাস্তির পরিমান যথেষ্ট কি না তা নিয়ে আলোচনা করব।বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান দন্ডবিধি-১৮৬০ এর ১৬ নং অধ্যায়ে মানবদেহ সংক্রান্ত অপরাধ বিষয়ে উল্লেখ করা আছে।উক্ত অধ্যায়ে পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা নামে সুনিদির্ষ্ট কোন অপরাধ আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা নেই।তবে উক্ত অধ্যায়ের ৩২০ ধারায় গুরুতর আঘাতের সংজ্ঞা দেয়া আছে যার মধ্যে পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা অপরাধটি অন্তভুর্ক্ত করা যায়।৩২০ ধারায় উল্লেখিত গুরুতর আঘাতের সংজ্ঞা বিশ্লেষন করলে পাওয়া যে,আট শ্রেনীর আঘাতকে গুরুতর আঘাত হিসেবে গন্য হবে।

উক্ত আট শ্রেনীর আঘাত হলো-১)পুরুষত্বহীন করা,২)স্থায়ীভাবে দুই চোখের যেকোনটিতে দৃষ্টিশক্তি রহিতকরন,৩)স্থায়ীভাবে দুই কানের যেকোনটিতে শ্রবনশক্তি রহিতকরন,৪) যেকোন অঙ্গ বা গ্রন্থির অনিষ্ঠ সাধন,৫)যেকোন অঙ্গ বা গ্রন্থির কর্মশক্তিসমূহের বিনাশ বা স্থায়ী ক্ষতি সাধন,৬) মস্তক বা মুখমন্ডলের স্থায়ী বিকৃতি,৭)হাড় বা দন্ত ভঙ্গ বা গ্রন্থিচ্যুতিকরন,৮)যে আঘাত জীবন বিপন্ন করে বা আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিশদিন মেয়াদের জন্য তীব্র দৈহিল যন্ত্রনা দান করে বা তাকে তার সাধারন পেশা অনুসরন করতে অসমর্থ করে।উক্ত আট শ্রেনীর আঘাতের মধ্যে ১,৪ ও ৫নং শ্রেনীর আঘাতের সবগুলো বা যেকোন একশ্রেনীর আঘাত পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে বিধায় দন্ডবিধির ৩২০ ধারার সংজ্ঞা অনুযায়ী পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার অপরাধ একটি মারাত্মক আঘাতের অপরাধ।

উক্ত মারাত্মক আঘাতের শাস্তি ৩২৫ ও ৩২৬ ধারায় দেয়া আছে।৩২৫ ধারা প্রযোজ্য হবে যদি মারাত্মক আঘাতের জন্য কোন অস্ত্র ব্যবহার না করা হয় বা সাধারন(ভোতা) অস্ত্র ব্যবহার করা হয়,উক্ত ধারা অনুযায়ী অপরাধীর শাস্তি ৭ বৎসর কারাদন্ড এবং জরিমানা হতে পারে।অন্যদিকে ৩২৬ ধারা প্রযোজ্য হবে যদি মারাত্মক আঘাত সংঘটনের জন্য মারাত্মক বা বিপদজনক অস্ত্র বা মাধ্যম ব্যবহার করা হয়।উক্ত ধারা অনুযায়ী অপরাধীর শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা যেকোন বর্ননার কারাদন্ড যা দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং জরিমানা হতে পারে।

উক্ত বিশ্লেষন থেকে এটি স্পষ্ট যে মারাত্মক অস্ত্র বা মাধ্যম ব্যবহার করে পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা (মারাত্মক আঘাত) এর অপরাধ করা হলে তার শাস্তি হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা যেকোন বর্ননার কারাদন্ড যা দশবছর পর্যন্ত হতে পারে এবং জরিমানা।কিন্তু বর্তমানে বিদ্যমান শাস্তি বলবৎ থাকার পরেও এই অপরাধটি সংঘটিত হওয়ার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এবং এটি একটি নিষ্ঠুরতম অমানবিক অপরাধ যা একজন পুরুষকে জীবিত অবস্থায় মৃতের মত করে বাঁচিয়ে রেখে অসহনীয় মানসিক হতাশা ও যন্ত্রনা দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় এবং সমাজে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ে বিধায় এই অপরাধটিকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে অপরাধীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলে এজাতীয় অপরাধ কমবে এবং ভিকটিম ন্যায় বিচার পাবে বলে আমি মনে করি।

লেখকঃ এডভোকেট মোঃ কাওসার হোসাইন
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবি,আইনগ্রন্থপ্রনেতা ও কলামিস্ট


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]