সাম্প্রদায়িকতা এবং এরশাদ!


জাকির হোসেন : বাংলাদেশের মানুষের অসম্প্রদায়িক চেতনা ধর্মীয় উন্মাদনা এবং সম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে বিষাক্ত হয়েছে দুই সামরিক শাসকের মাধ্যমে। এদের একজন জেনারেল জিয়া এবং অপরজন জেনারেল এরশাদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ধারার পরিচালিত করেন জেনারেল জিয়া। তিনি স্বাধীনতা বিরোধীদের তার মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়ার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পৃষ্টপোষকতা দেন। একই সঙ্গে তিনি একাত্তরের রাজাকার, আলবদর এবং আল শামসদের এই দেশে প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। আর সংবিধানের যুক্ত করেন ‘বিসমিল্লাহির রহমানের রাহিম’।

জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানি ধারার রাজনীতিকে তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে নেন এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার মাধ্যমে সাম্প্রতায়িকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। ধর্ম নিয়ে এদেশের মানুষের সঙ্গে এরশাদ যে ভণ্ডামি ও প্রহসন করেছেন তা এদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ন্যাক্কারজনক অধ্যায়।

একদিকে তিনি অসংখ্য প্রেমিকা নিয়ে রাত্রি যাপন করতেন। আর অন্যদিকে মধ্য দুপুরে কোনো মসজিদে নামাজ পড়তে দিয়ে বলতেন- আজ রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেছেন এই মসজিদে তিনি নামাজ পড়বেন। জেনারেল এরশাদের এই ভন্ডামি খুব বেশি দিন এদেশের মানুষের কাছে চাপা থাকেনি। কেননা যে মসজিতে এরশাদ নামাজ পড়বেন বলে আগের রাতে স্বপ্নে দেখতেন, সেই মসজিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সাতদিন আগে থেকেই তৎপর থাকতেন। এতে ওই এলাকার মানুষ সহজেই বুঝতে পারতো এরশাদ কিছুদিনের মধ্যেই এই মসজিদে নামাজ পড়ার স্বপ্ন দেখবেন। ফলে এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ একে অপরের সঙ্গে রসিকতা শুরু করে দিতেন।

ধর্মের নামে জেনারেল এরশাদ ভাষা শহিদদের রক্তের সঙ্গেও বেইমানি করতে এতটুকু অস্বস্তিবোধ করেননি। ১৯৮৫ সালের ১৪ জানুয়ারি এরশাদ এক সভায় তিনি শহীদ মিনারে আলপনা আঁকার কটূক্তি করেন ও ইসলামী রাষ্ট্র করার সংকল্প ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া বেদাত। এর আগে তিনি ১৯৮৪ সালে রবিবারের পরিবর্তে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার চালু করেন। ১৯৮৪ সালের ১ এপ্রিল থেকে পরিবর্তিত সময়সূচিতে সরকারি কাজ শুরু হয়। আর ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং ধর্মীয় অনুভূতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে কাছে টানতে তিনি ১৯৮৮ সালের ৭ জুন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেন।

সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে প্রথম মামলা “আনোয়ার হোসেইন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ” হয় ১৯৮৯ সালে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে। অষ্টম সংশোধনী ও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন আইনজীবী ও পেশাজীবীরা, তাঁদের সঙ্গে তখন ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আন্দোলনের একপর্যায়ে মামলা হয়। সংবিধান সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা প্রথম মামলায় পক্ষে যে মুখগুলো ছিলেন তারা হলেন ড. কামাল হোসেন, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, আমীর-উল ইসলাম, আশরারুল হোসেইন ও মাহমুদুল ইসলাম, অন্যদিকে সরকারপক্ষে ছিলেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এম নুরুল্লাহ এবং সহযোগীরা (আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, এ এফ হাসান আরিফ প্রমুখ)।

অন্যদিকে জেনারেল এরশাদের পুরো শাসনামল জুড়েই নিষিদ্ধ ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। রেডিও টিভিতে একটি দিনের দিনের জন্যও বাজানো হয়নি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদের পতন হলে ৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি-জামাতচক্র। এ সময়ও রেডিও টিভিতে নিষিদ্ধ ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে দীর্ঘ একুশ বছর এবছর ১৩ জুন রাতে সম্প্রচার করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। সূত্র: দৈনিক জাগরণ


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]