‘হাফপাস সাংবাদিক’ বনাম গণমাধ্যম দিবসের উপহাস

  • 405
    Shares

সৈয়দ মেহেদী হাসান : আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। বছর ঘুরে দিবসটি আসে। আমরাও পুলকিত হই। কিন্তু এবারের মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে দুটি সংবাদ নিয়ে শুরু হলো। একটি পজেটিভ। আরেকটি নেগেটিভ। সুতরাং এ্যানেসথেসিয়া পুশ করলে শরীর যেমন অবশ থাকে; এবারের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসটিও তেমনি ভাবলেশহীন। আজকের দিবসের পজেটিভ খবরটি হলো, ৫৩ দিন নিখোঁজ থাকার পর ফটো সাংবাদিক কাজলকে বেনাপোলে পাওয়া গেল।

সাগর-রুনি হত্যার ঘটনার কূল কিনারা যে দেশে হয়না, সেদেশে কাজলের ফিরে আসা অনেক বড় সুখবর। আমরাও খুশি। কিন্তু তিনি এতদিন কোথায় ছিলেন? কিভাবে গেলেন? কেন গেলেন? সেই রহস্যের জট না খুলতেই জানা গেলো নেগেটিভ খবরটিও; কাজল অনুপ্রবেশের দায়ে গ্রেফতার। কাজল বাংলাদেশের সাংবাদিক। ঢাকা থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। সেই বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টাকালে নাকি তিনি আটক হয়েছেন।

কারও অনুমতি ছাড়াই লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছিল বাংলাদেশে। তাদের বিরুদ্ধে অনুপ্রেবেশ মামলা হয়নি কিন্ত। তাদের জন্য আমরা মানবিক। অথচ দেশের সাংবাদিকের জন্য মানবিকতার পারদ গলে না। ভারত-বাংলাদেশে অবৈধ পথে হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন সময় আসা যাওয়া করে, তাদের বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণের নজির খুব একটা নেই। তবে নিখোঁজ সাংবাদিক কাজলকে নিজ দেশে ঢুকতে গিয়ে অনুপ্রেবেশ মামলায় আটক হতে হলো। দুর্যোগকালীন সময়েও এমন গল্প শুনতে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রস্তুত না থাকলেও; দেখছি।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার স্বরুপ কি?

আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোটার্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স বা আরএসএফ চলতি বছরের এপ্রিলের শেষার্ধে প্রকাশিত রিপোর্টে বলছে, বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ১৫১তম স্থানে। এই সূচকে আগের বছর ছিল ১৫০তম স্থানে। তারও আগে ২০১৮ সালে ছিল ১৪৬তম স্থানে। অর্থাৎ প্রত্যেক বছর গণমাধ্যম স্বাধীনতা হারাচ্ছে। অথচ সরকার কিন্তু বলছে গণমাধ্যম স্বাধীন। গণমাধ্যম মুক্ত। হ্যাঁ আমরাও দেখছি, গণমাধ্যম মুক্ত। যদিও তা সংখ্যার বিচারে। এমন ঢালাওভাবে গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়িয়ে ‘সবপন্ডিতের দেশে’ পরিণত করা হয়েছে এ শিল্পকে। আগে সাংবাদিক দেখলে মানুষ সম্মান করতো। এখন প্রকারান্তরে মানুষ অট্টহাসি দেয়। মানুষ বুঝে গেছে, দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে প্রসূত মানহীন সংবাদ মাধ্যমে শুধু আবর্জনা উৎপাদিত হচ্ছে। প্রকৃত সাংবাদিক হাতে গোনা কয়েকজন।

গ্রাম্য ভাষায়, ‘ধানের চেয়ে চিটা বেশি।’ আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ভাষায়, ‘শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি। ধর্মের চেয়ে টুপি বেশি।’ যে উদাহরণই দেই না কেন; গণমাধ্যমের এমন অধঃগতির নেপথ্যে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের দীর্ঘ পরিকল্পনার বিষক্রিয়া দায়ী।

বস্তুত সংবাদমাধ্যম আর গণমাধ্যমকর্মী/সাংবাদিকদের হাতে নেই। বেহাত হয়ে গেছে। এই সাইনবোর্ড ব্যবহার করতে দলে দলে ভিড় করছেন মুটে-মজুর-কুলি-চোর-গুন্ডা-বাটপার-দালাল-হোটেল বয়-ভবঘুরে-অকর্মা-বখে যাওয়া উপায়হীন অনেকেই। ফলে ২০২০-এর গণমাধ্যমকর্মীরা পূঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার মাউথঅর্গান। রুপ নিচ্ছেন ধনাঢ্য ব্যক্তির তোষামোদকারীতে। গণমাধ্যমকর্মীরা চিনতে ভুলে যাচ্ছেন কোনটি সাদা আর কোনটি কালো। শুধু নিজেরা চিনতে ভুলে গিয়েই ক্ষান্ত হননি; সামষ্টিক জনগোষ্ঠিতে সেই ভুল শিক্ষা দিচ্ছেন।

সরকার হাজার হাজার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান অবমুক্ত করেছেন। আরও কয়েক হাজার অনুমতি ছাড়াই চলছে। কিন্তু হাজার হাজার সংবাদ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে যে লাখ লাখ কর্মী কাজ করছেন তাদের বেতন-ভাতার নিশ্চয়তা নেই। এমনকি সাংবাদকিরা খেয়ে আছে নাকি না খেয়ে আছে তারও খবর নেওয়ার ফুসরত নেই।

সর্বশেষ উদাহরণই ধরুন, করোনা যুদ্ধ। পুলিশ, ডাক্তার, নার্স ইত্যাদি সম্মুখ যোদ্ধাদের জন্য প্রণোদনা, বীমা সবই চালু করা হচ্ছে। অথচ করোনাযুদ্ধে জয়ী হতে যদি তিনটি সংস্থা দরকার হয় তার মধ্যে একটি সংবাদ মাধ্যম। সংবাদ মাধ্যম সার্বিক দিক থেকে এই যুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। সাংবাদিকরা প্রাণ দিয়ে দেশ-সরকারের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার গণমাধ্যমের ব্যাপারে চুপচাপ। একটি কথাও কিন্তু বলছে না কেউ।

এমনই সবসময় সরকার গণমাধ্যমকে উপেক্ষা করে এসেছে। শুধু যে বর্তমান সরকার তা কিন্তু নয়। অতীতে সকল সরকারই সংবাদমাধ্যম প্রশ্নে একই চরিত্রে স্থির ছিল। ফলে আলাদা করে কাউকে বলার কিছু নেই।

এ কারনে সাংবাদিকতা এখন অভিভাবকহীন। অভিভাবকহীন হয়ে পড়ায় পঙ্গপালের মত ছড়িয়ে সাংবাদিকতার নাম ভাঙ্গিয়ে সত্যটাকে চেটেপুটে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। নিজে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অস্বচ্ছ, মিথ্যা, ঠকবাজীতার সাথে।
আবার কিছু মানুষ ঢুকছে যারা গণমাধ্যমের স্বার্থে নয়; বিশেষ কাউকে সন্তুষ্ট করতে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, সাংবাদিকদের হাত থেকে সাংবাদিকতা কেড়ে নিয়ে যারা খবরদারি করেন তারা এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাদের অন্য পেশা রয়েছে। হোক সে ডায়াগনস্টিক ব্যবসায়ী, মাদক ব্যবসায়ী, জমির দালাল ইত্যাদি ইত্যাদি।

সাংবাদিকতার যতগুলো বই পড়েছি, সারমর্মে এটুকু বুঝেছি দুই ধরণের সাংবাদিকতা দৃশ্যমান। সু-সাংবাদিকতা আর অপসাংবাদিকতা। এটি বাংলায়। ইংরেজীতে ইয়োলো জার্নালিজম বলে একটি শব্দ চয়ন করে রাখা হয়েছে। বিপরীতে আর কোন শব্দ নেই। কারন ইয়োলা জার্নালিজম মানে অপসাংবাদিকতাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিপরীতে ভালো সাংবাদিকতার কোন মানদ- রাখা হয়নি। ভালোর কোন শেষ নেই।

আর বাংলাদেশে নতুন করে শিখছি আভিধানিক সাংবাদিকতার বাইরে দুই ধরনের সাংবাদিকতার প্রচলন। প্রথম পক্ষ দেশের স্বার্থে সাংবাদিকতায় আসে। এটাকে আমি জাতীয় সাংবাদিকতা বলবো। সাধারণত আমরা অনুমান করি ঢাকায় বসে যারা গণমাধ্যমে মাতব্বরি করেন তারা জাতীয় সাংবাদিক। বস্তত তা নয়। মফস্বলে থেকেও জাতীয়/আর্ন্তজাতিক সাংবাদিক হতে পারেন। এক্ষেত্রে চিন্তার প্রসার নির্ধারণ করেন কে কোন মানের সাংবাদিক।

আর দ্বিতীয় পক্ষের সাংবাদিক হচ্ছেন ব্যক্তি স্বার্থে। এই পক্ষকে আরেকটি নাম দেওয়া যায় ‘ইতর শ্রেণী’। এরা সাংবাদিকতায় আসেন শুধু নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য। দেশ বা সামগ্রিক কল্যান এদের কাছে কোন চিন্তা থাকে না। ফলে দেখা যায়, ইতর শ্রেণীর এই সাংবাদিকরা জাতীয় সাংবাদিকদের কাজ করার পথ রুদ্ধ করে দেন। তখন মিথ্যা ও ইতর শ্রেণীর সাংবাদিকদের সাথে লড়াই করে সাংবাদিকতা করতে হয় প্রকৃত সাংবাদিকদের। ওদিকে ইতর শ্রেণীর ভিতরে আরেক প্রজাতি রয়েছেন যারা সাংবাদিকতা করেন দলের সার্পোট পেতে। এই শ্রেণীর মানুষ সবচেয়ে বেশি। তারা বড়শিওয়ালার মতন। রাজনৈতিক দলের বগলে চড়ে বেড়ান। আর বিপদে পড়লে পরিচয় দেন, আমি সাংবাদিক।

সাংবাদিকতার আদি ইতিহাস বলছে, নিপেড়িতর পক্ষে, অন্যায়ের বিপক্ষে বিবেকের আদালত হচ্ছে গণমাধ্যম। কিন্তু ২০২০ সালে বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় অন্যায় আর ন্যায় বলতে ইদানিং বিশেষ তফাৎ করা হচ্ছে না।
হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে এখনো সাংবাদিকতার ষোলআনা শঠতামি গ্রাস করতে পারেনি। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এখনো সততার সাথে সাংবাদিকতা করেন। তারা নিবেদিত চিত্তে কাজ করছেন।

কিন্তু গোলযোগটা হাফপাস সাংবাদিকদের নিয়ে। আর উপরের পর্যবেক্ষণও সেই হাফপাস সাংবাদিকতা নিয়েই। এমন সাংবাদিকতার উদ্ভব কখনোই হতো না যদি, সাংবাদিকদের খাদ্যের নিরাপত্তা থাকতো, বাস স্থানের নিরাপত্তা থাকতো, বাকস্বাধীনতা খর্ব না হতো। সর্বোপরি জীবনের নিরাপত্তা থাকতো। যখন চিন্তা করতে হতো না, মানববন্ধনের ছবি তুলে বা এনজিওর আলোচনা সভা শেষে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে দিনের বাজার করে ঘরে ফিরতে হবে বা চেয়ারম্যান-মেম্বারের চাল চুরির তথ্য ফাঁস করলে পান্ডাদের পিটুনির শিকার হতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, এইসব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস সাংবাদিকদের জীবনের উপাধেয় কিছু নয়। বরংছ উপহাসের বিষয়। মুক্ত গণমাধ্যম দিবস সেইদিন আমাদের কাছে অর্থপূর্ণ হবে যেদিন সাম্রাজ্যবাদীতার স্লাে পয়জনিং বন্ধ হবে। জুটবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও বেচে থাকার নিরাপত্তা।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক


  • 405
    Shares

[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]