১২ মাসের ভাসমান হাট, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়


আসাদুজ্জামান আসাদ, স্বরুপকাঠি  : প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখার জন্য ভ্রমন পিপাসু মানুষ প্রতিনিয়িত ছুটে চলছে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। যাদের কাছে টাকা বা শারীরিক কস্ট কখনই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। শুধু একটাই ক্ষুদা আর তা হলো প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে নিজের মন প্রান‌কে এর সৌন্দর্যে ভিজিয়ে নেয়া। যারা দেশের মধ্যেই খুঁজে পেতে চান ব্যাংককের ভাসমান বাজারের ছোঁয়া, চারিদিকে শুধু অবারিত সবুজের বিছানো চাদর ও প্রকৃতির নির্মল আনন্দ, তারা চোখ বুজে ঘুরে আসুন বৃহত্তর বরিশালের স্বরুপকাঠির উপজেলার ১০ ইউনিয়নের ৩১ টি ভাসমান বাজারে।

নদী বেষ্টিত স্বরুপকাঠির ১০ টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভায় রয়েছে ৩ টি বন্দরসহ ৩১ টি বাজার। সুটিয়াকাঠি ইউনিয়নে ৩টি, সোহাগদল ইউনিয়নে ৩টি, বলদিয়া ইউনিয়নে ৬টি, দৈহারী ইউনিয়নে ৩টি, গুয়ারেখা ইউনিয়নে ৪টি, সারেংকাঠি ইউনিয়নে ১টি,আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নে ৩টি, জলাবাড়ি ইউপিতে ৩টি, সমুদয়কাঠি ইউপিতে ৪টি ও স্বরুপকাঠি পৌরসভায় ১ টি বাজার রয়েছে। বেশির ভাগ বাজারই কোনো না কোনো ছোট বড় খালের পাশে অবস্থিত। আর এসব নদী বা খালের মধ্য থেকে নৌকা বা ছোট লে ভ্রমণের সময় মনের মধ্যে গেয়ে উঠবে একি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী।

সূর্য ওঠা থেকে শুরু করে রবি অস্ত পর্যন্ত চলে এসব হাটে বেচাকেনা। কোনটা মধ্যরাত পর্যন্ত আবার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় কোনটা। আপনি এখানে দেখতে পাবেন পেয়ারার ভাসমান বাজার ছাড়াও ধান,চাল, সবজি চারা, ফুলের চারা, ফলের চারা, বিভিন্ন ধরনের বনজি গাছের চারা, ধানের চারা, সবজি চারা, মৌসুমি ফলের চারার ভাসমান বাজারসহ দেশের বৃহত্তম ভাসমান গোল কাঠের বাজার। আর এর সাথে বাড়তি আনন্দ হিসেবে থাকছে শুধুমাত্র নারীদের জন্য নৌাকায় ভাসমান সবজির বাজার। প্রতিটি বাজার সংলগ্ন থাকা খাল বা নদীতেই চলে পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচার কাজ।আসুন জেনে নেই স্বরুপকাঠির ভাসমান বাজারগুলো সম্পর্কে।

ভাসমান কাঠের বাজারঃ
সমগ্র দেশের গন্ডি পেড়িয়ে বিদেশেও স্বরুপকাঠির পরিচিতি তার গোল কাঠ বা সৃজনকৃত কাঠের জন্য।এখানে দেশের সর্ববৃহৎ ভাসমান কাঠের বাজার ইন্দুরহাট ও মিয়ারহাটের মাঝখান থেকে বয়ে চলা শিতলা খালে শতবছর ধরে সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার বসে।তবে স্বরুপকাঠি সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে আকলম মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত খালের দুইপাড়েও এ ব্যবসা গড়ে উঠেছে। সুটিয়াকাঠি ও বলদিয়া ইউপিকে আলাদা করা খালের দুই প্রান্তে ডুবি বাজার পর্যন্ত এবং সোহাগদলের হাজির পুল খালের দুই প্রান্তে এ হাট বছরের প্রতিদিনই বসে।

বউ বাজারঃ
প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার বলদিয়া ইউনিয়নের পঞ্চ‌বে‌কি বাজার সংলগ্ন খাল, সোহাগদলের এন ডাব্লিউ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পূর্বপাশে সুপারিতলা ও সুটিয়াকাঠি ইউনিয়নের কালিবাড়ি গোপ এবং বালিহারী ডকইয়ার্ড সংলগ্ন খালে বসে বউ বাজার।এখানে বিভিন্য বাড়ির বউঝিরা, হাতচালিত নৌকায় ভাসমান বিক্রেতাদের কাছ থেকে মাছ, চাল সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদী ক্রয় করে থাকেন।

ভাসমান পেয়ারার হাটঃ
বাংলার আপেল খ্যাত স্বরুপকাঠির পেয়ারা উৎপাদন হয় আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নে।পেয়ারা উৎপাদনকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ বাজার বাংলা বছরের আষাড় মাসের ২য় সপ্তাহ থেকে আশ্বিন মাসের ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে। ছোট ছোট হাতচালিত নৌকা কানায় কানায় ভরা পেয়ারা দেখে মনে হবে এই বুঝি নৌকাটা ডুবে গেল।কিন্ত দক্ষ পেয়ারা চাষী দক্ষহাতেই ডুবো ডুবো নৌকা চালিয়ে হাটে আসেন।চারদিকে অবারিত সবুজের মাঝে ছোট ছোট শাখা খাল আপনাকে সুন্দর বনের সুন্দর্যের ছোয়া দিবে এটা নিশ্চিত। হলুদ রংয়ের পাকা ও সবুজ রংয়ের কাচা পেয়ারা দেখে আপনার লোভ সংবরন করতে কস্ট হবে। সপ্তাহে সোমও শুক্রবার এখানে হাটের দিন হলেও পেয়ারার মৌসুমে প্রতিদিনই হাট বসে এ অঞ্চলে। দেশ বিদেশ থেকে আগত হাজার হাজার পর্যটকে মুখরিত থাকে সময়টা এ ইউপিতে।

ধানের চারার হাটঃ  যে চাল খেয়ে আমরা বেচে থাকি। সেই চালের ধান গাছ দেখতে সকলেরই মন চায়। নয়নকারা সবুজ ধানের চারা ছোট ছোট নৌকা বা ট্রলারে করে বিক্রি করতে নিয়ে আসেন চাষী। বছরের শ্রাবন মাসের ২য় সপ্তাহ থেকে আশ্বিন মাসের ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত এ হাট বসে। সারেংকাঠি ইউনিয়নের করফা বাজার সোম ও বৃহস্পতিবার, জলাবাড়ি ইউনিয়নে জলাবাড়ি বাজার রবি ও বুধবার, একি ইউনিয়নের ইদলকাঠি বাজারে সোম ও শুক্রবার, সমুদয়কাঠি ইউনিয়নের শশিদ বাজারে শনিবার ও সাগরকান্দা বাজারে মঙ্গলবারে এ হাট বসে।

চালের ভাসমান বাজারঃ  বছরের প্রতি সপ্তাহেই চালের ভাসমান বাজার সুটিয়াকাঠি ইউনিয়নের মিয়ারহাট, স্বরুপকাঠির লঞ্চঘাট সংলগ্ন সন্ধা নদীতে সোম ও বৃহস্পতিবার বসে।

সুপারির ভাসমান হাটঃ আশ্বিন থেকে মাঘ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সুপারির হাট জলাবাড়ি ইউনিয়নের ইদলকাঠি বাজারে সোম ও শুক্রবার, একি ইউনিয়নের জলাবাড়ি বাজারে রোববার ও বুধবার, সমুদয়কাঠি ইউনিয়নের শশিদ বাজারে শনিবার ও সাগর কান্দা বাজারে মঙ্গলবার বসে।

নৌকার হাটঃ নদী ও ছোট ছোট খাল পরিবেস্টিত স্বরুপকাঠি উপজেলার চলাচলের অন্যতম বাহন স্থানীয় কারিগড়দের তৈরী দেশিয় কাঠের হাত চালিত নৌকা। বছরের বৈশাখ মাস থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের আটঘর বাজারে সোম ও শুক্রবার, বলদিয়া ইউনিয়নে চামী একতা বাজারে শনি ও মঙ্গলবার, মিয়ারহাট বন্দরে সোম ও বৃহস্পতিবার এ হাট বসে।

ভাসমান সবজির হাটঃ
প্রতিদিন সকালে প্রায় প্রতিটি বাজারেই বসে মৌসুমি সবজির ভাসমান এ হাট।তবে মিয়ারহাট বন্দরে প্রতিদিন রবি উদয়ের ক্ষন থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত ছোট ছোট ট্রলার বা নৌকায় বিভিন্ন প্রকারের সবজির সমাহারে মুখরিত হয় ক্রেতা বিক্রেতা।

ভাসমান সবজি চারার হাটঃ যে সকল জমী বছরের ৯ মাস পানির নিচে থাকে। এই জমিতে নিজস্ব পদ্ধতিতে ভাসমান সবজি চারা উৎপাদন করে জিবিকা নির্বাহ করে কয়েক হাজার পরিবার।স্বরুপকাঠির উৎপাদিত এ চারা সপ্তাহের প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারী ব্যবসায়ীরা এসে নৌকা বা ট্রলার যোগে নিয়ে যায় খুচরা বিক্রির জন্য। বিশেষ করে বৈশাখ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত বিভিন্য খালে এ হাট বসে।

ভাসমান আমড়ার হাটঃ বলদিয়া ইউনিয়নের ১৪রশি (উড়িবুনিয়া) বাজারে বাংলা বছরের আষাড় মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত সপ্তাহে রবি ও বুধবার বসে। ভাদ্র মাস থেকে অগ্রাহায়ন মাসে পাকা আমড়ার হাট সপ্তাহে প্রতি সোম ও শুক্রবার আটঘর কুড়িয়ানার আদমকাঠিতে বসে।

নারিকেলের ছোবরা ও পাপষের হাটঃ মিয়ারহাট বন্দরে বছরের ৫২ সপ্তাহের প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার এ হাট বসে।

মানুষের হাট বা শ্রমিকের হাটঃ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করার জন্য শ্রমিকের শ্রম বিক্রি করা হয় এ হাট থেকে। বিশেষ করে জমি চাষ বা জমির ধান কাটা, সবজির জমি তৈরী করা বা সবজি তোলার জন্য এখান থেকে মাস, সপ্তাহ বা দিন চুক্তিতে শ্রমিক কিনে নেয়া হয়। জলাবাড়ি ইউপির মাদ্রা বাজারে রবি ও বুধবার এ হাট বসে। এছারা জলাবাড়ি বাজারে বছরের আষাড় মাস থেকে আশ্বিনের মাঝামাঝি সর্ববৃহত মানুষের হাট বসে। এছারাও স্বরুপকাঠিকে দ্বিখন্ডিত করা সন্ধা নদীর পশ্চিম পাড়ে দাড়িয়ে দেখতে পাবেন সবুজের বুক চিরে নদীর বুকে সূর্যের জেগে ওঠা।আবার নদী পাড় হয়ে পূর্ব পাড়ে বসে স্বরুপকাঠির ঐতিহ্যবাহী র চা খেতে খেতে দেখতে পাবেন নদীর বুকে সবুজের মিশেলে সূর্যের বিদায় হাসি।

খরচঃ খরচ একেবারেই হাতের নাগালে।ঢাকা থেকে লঞ্চ বা বাস যেভাবেই আসুন ২ রাত ও ১ দিনের মাত্র তিন হাজার টাকা খরচে পেতে পারেন অবারিত সবুজের স্নিগ্ধতায় ভরা প্রতিটি বাজারে ব্যতিক্রমী ভাসমান বাজার। সেই সাথে গ্রহন করতে পারেন বিভিন্য ধরনের দেশিয় মাছ ও সবজির স্বাধ।


[প্রিয় পাঠক, আপনিও (www.barisaltribune.com) বরিশালট্রিবিউনের অংশ হয়ে উঠুন। আপনার এলাকার যে কোন  সংবাদ, লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-barisaltribune@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]