২৬শে মার্চ, ২০১৯ ইং, মঙ্গলবার

ক্যাম্পাসে চড়ুইভাতি

আপডেট: জানুয়ারি ২৭, ২০১৯

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি। চলুন না স্মৃতির ডায়েরিটা ঘেঁটে একটু পেছনে ফিরে যাই। সেই চিরচেনা গ্রাম, উচ্ছ্বল শৈশব আর দুরন্ত কৈশোরে। বন্ধুদের সঙ্গে ঝড়ের সময় আম কুড়ানোর প্রতিযোগিতা, পুকুরের ঘোলা জলে ননস্টপ গোসল করে চোখ লাল করে ফেলা, গোল্লাছুট, কাঁনামাছি, বউচি, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা ডাংগুলি। কতই না মজার ছিল সে দিনগুলো। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও সেই স্বর্ণালি স্মৃতিগুলো কিন্তু আজও মলিন হয়ে যায়নি। বরং মনে পড়লেই একটা প্রশান্তির মৃদু হাওয়া দোলা দিয়ে যায় মনে। সকালের নরম রোদের মতো এক চিলতে মৃদু হাসি খেলে যায় ঠোঁটের কোনায়।

শীতকালের শৈশব, কৈশোরের ফেলে আসা হাজারো মধুর স্মৃতির মধ্যে অন্যতম একটা স্থান দখল করে আছে পাড়ার বন্ধুরা মিলে ‘চড়ুইভাতি’ খেলা। স্থানভেদে যার আরেক নাম ‘জোলাভাতি’। এই চড়ুইভাতিতে চাঁদা হিসেবে সবাইকে যার যার বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে হতো পরিমাণমতো চাল ডাল। কারও কারও উপর দায়িত্ব থাকত তেল আর মসলাপাতি যোগাড়ের। আবার কয়েকজন মিলে বেড়িয়ে পড়ত জ্বালানি সংগ্রহে।

বনে-বাদাড়ে ঘুরে কুড়িয়ে আনা হতো গাছের নিচে পড়ে থাকা শুকনো পাতা আর চিকন ডাল। রান্না-বান্নার পর্বটা হতো সাধারণত খালের ধারে কিংবা খোলা প্রান্তরে বিস্তৃত ডালপালার বিশাল কোনো বটবৃক্ষের তলায়। বন্ধুদের মধ্যে বড় আপু শ্রেণীর যারা থাকতেন, দেখা যেত রান্না করার মতো শৈল্পিক দায়িত্বটা তারা নিজ দায়িত্বেই কাঁধে তুলে নিতেন। বাকিরা মেতে উঠত নানান খেলাধুলায়। রান্না হয়ে গেলে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ত খালের স্বচ্ছ পানিতে। অন্যদিন গোসল করতে দেরি হলেও, সে দিন কে কার আগে কার গোসল শেষ করবে? শুরু হয়ে যেত সেই প্রতিযোগিতা। গোসল শেষে শুকনো কাপড় পড়ে প্লেট হাতে করে বসে যেত সবাই।

বড় আপুরা একে একে ভাত তরকারি বেড়ে দিতেন। তারপর নিজেরা নিতেন। আপুরা যখন খাওয়া শুরুর ইঙ্গিত দিতেন তখন একসঙ্গে শুরু হতো খাওয়া। আহ! সে খাবারের কি স্বাদ। হলফ করে বলতে পারি, এখনও সে স্বাদ আপনার মুখে লেগে আছে। মরার সময় আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় মৃত্যুর আগে আপনি কি খেতে চান, আমি কিন্তু এ খাবারটাই খেতে চাইব! কিন্তু এখন তো অনেক বড় হয়ে গেছি। পড়াশোনা করছি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বমানের একটি ক্যাম্পাসে। চাইলেই তো আর সেই আবেগ অনুভূতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই বলে কি? আর বসে থাকা যায়? কথায় আছে ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব। আর তাই তো আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা মিলে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিলাম ক্যাম্পাসে চড়ুইভাতি করার।

তারপর দিন তারিখ ঠিক করে ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই উপস্থিত হলাম ক্যাম্পাসের ‘সুইজারল্যান্ডে’ (মওলানা ভাসানী ও শহীদ রফিক জব্বার হলের দক্ষিণের সবুজ পাহাড়ী এলাকা)। রান্নার সময় আমাদের মধ্যে কয়েকজনের অজানা প্রতিভা নতুন রূপে উন্মোচিত হলো। রাসেল, মুক্তি, শাহিন আর সানজিদা যে এত চমৎকার রান্না করতে পারে চড়ুইভাতি না হলে সেটা জানাই যেত না। হেনা, শিথীমা, শ্রাবণী আর নুঝহাতকে দেখা গেল সবজি কাটাকুটিতে বেশ পারদর্শী। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নাইমের কর্মব্যস্ততা আর অকপট কথাবার্তা ছিল আমাদের সবার জন্য এক কথায় চরম পর্যায়ের বিনোদন। সেতু আর সিফাতের ছেলেমানুষিও ছিল দেখার মতো। এরকম একটা আনন্দ আয়োজনকে ক্যামেরার ফ্রেমবন্দী করে রাখা হবে না ব্যাপারটা কিন্তু এই অতি আধুনিকতার যুগে একেবারেই বেমানান।

তাই, তো হিশাম আর মাইনুর ক্যামেরার শাটার টেপাটেপিতে অবশেষে সেটাও সম্পূর্ণ হলো। রান্না শেষ হতে হতে দিন শেষে নেমে এলো সন্ধ্যা। সুইজারল্যান্ডের অন্ধকার আর শীতকালীন ঠাণ্ডা পরিবেশের চড়ুইভাতিতে অন্যরকম একটা আবহ তৈরির জন্য অপু আর রিফাত অনেক কাঠখড় আর কেরোসিন পুরিয়ে আয়োজন করল ক্যাম্পফায়ারের। আগুনের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে উচ্চস্বরে সঙ্গীতচর্চা হয়ে গেল বেশ কিছুক্ষণ।

আমাদের সে গানের সুর প্রতিধ্বনিত হলো সুইজারল্যান্ডের আকাশে-বাতাসে। ‘…মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম/ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা…।’

গানের কথাগুলো মনে হয় একটু চেঞ্জ করে নেয়া প্রয়োজন ছিল- এখন কি সুন্দর দিন কাটাচ্ছি আমরা/ এখন কি সুন্দর দিন কাটাচ্ছি! তাই নয় কি?

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
মার্চ ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১